Published : 04 Sep 2025, 01:41 PM
মানুষের জীবনে নানা ধরনের সম্পর্ক থাকে। কেউ আত্মীয়তার বন্ধনে জড়ায়, কেউ বন্ধুত্বে, কেউ প্রেমে, কেউ ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে। এ রকম সম্পর্ককে মানুষ স্বাভাবিক মনে করে এবং গর্ব করতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু আমাদের দেশে এমন এক সম্পর্ক আছে, যা সব ধরনের সম্পর্ককে ছাপিয়ে গেছে। এত শক্তিশালী এবং এত অটুট এই সম্পর্ক যে রক্তের বন্ধনও এর সামনে নিতান্তই তুচ্ছ মনে হয়। এ হলো দুর্নীতির অদৃশ্য মহাজাগতিক বন্ধন। এই বন্ধনে জড়িয়ে গেছে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত, ধনী ও গরিব, নেতা ও কর্মী, শহুরে ও গ্রামীণ সবাই।
এই বন্ধনের সবচেয়ে আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। যিনি এক সময় উচ্চকণ্ঠে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন, তিনিই ক্ষমতার স্বাদ পেলে মুহূর্তেই এই পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্যে পরিণত হন। যে আমলা অফিসে বসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেমিনার আয়োজন করেন, তিনি পরদিন নতুন ফাইল থেকে কমিশনের খাতার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের নীতি-নৈতিকতার পাঠ দেন এবং সুযোগের অভাবে সৎ থেকে যান, সুযোগ মিলতেই তিনিও দুর্নীতির মহা উৎসবের অন্যতম সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন। যে ব্যবসায়ী সকালবেলা সততার দোয়া পড়ে দোকান খোলেন, তিনি বিকেলের মধ্যেই ভেজাল তেলের কার্টন গুদামে ভরে দেন। দুর্নীতির এই মহাজাগতিক পরিবারে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়, যেন এটি মানুষের স্বাভাবিক বিবর্তনের শেষ ধাপ।
রাজনীতির ময়দানে যতই দলাদলি, ভাঙচুর আর চিৎকার হোক না কেন, দুর্নীতির টেবিলে সবাই একই প্লেটে খাবার খায়। রাস্তায় মানুষ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া দেখে ভাবে, ওরা বোধ হয় চরম শত্রু। কিন্তু আসল কাহিনি অন্য। টেন্ডার, কমিশন আর বিদেশি প্রকল্পের অর্থ ভাগাভাগির সময় সবাই মিলে একে অপরকে ভাই ভাই বলে ডাকে। এখানে কোনো দলের ভেদাভেদ নেই। এখানে গণতন্ত্র নতুন সংজ্ঞা পেয়েছে, ভাগাভাগি তন্ত্র। এখানে ভোট নেই, আছে ভাগ। নীতি নেই, আছে কমিশন। মতাদর্শ নেই, আছে টেন্ডার ভাগাভাগি। রাজনীতির আসল মিলনস্থল সংসদ নয়, বরং দুর্নীতির গোপন আঁতুড়ঘর।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে শিক্ষা মানুষকে সৎ করে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, এ দেশে শিক্ষা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্নীতির জগতে কেবল দক্ষতা বাড়ায়। যিনি অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন, তিনি জানেন কীভাবে একটি ভুয়া প্রকল্প প্রস্তাবকে পরিসংখ্যান দিয়ে যুক্তিসম্মত করে তুলতে হয়। যিনি আইনে ডিগ্রি নিয়েছেন, তিনি দুর্নীতির মামলায় ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার ওস্তাদ। আর প্রশাসনে যারা উঁচু পর্যায়ে পৌঁছেছেন, তারা জানেন কোন নথি কখন অদৃশ্য করতে হবে। অন্যদিকে তথাকথিত অশিক্ষিত দুর্নীতিবাজরাও পিছিয়ে নেই। তারা জানে কোথায় কাকে কত দিতে হবে, কাকে খাওয়াতে হবে, আর কোন থানা বা আদালতে কত খরচ করলে মামলা গায়েব হয়ে যাবে, কিংবা চাইলে নির্দোষ মানুষকেও সহজে ফাঁসিয়ে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা পাইয়ে দেওয়া যাবে। ফলে শিক্ষা এখানে কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। বরং বলা যায়, দুর্নীতির বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই সমানভাবে পাস করে, ফেল করার সুযোগ নেই।
অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে অনেক সমীকরণ শেখানো হয়, কিন্তু দুর্নীতির সমীকরণ সবচেয়ে সহজ। যত বেশি দুর্নীতি, তত বেশি ঐক্য। যত বেশি ঘুষ, তত বেশি বন্ধুত্ব। যত বেশি কমিশন, তত বেশি ভ্রাতৃত্ববোধ। এখানে টাকার লেনদেন মানেই আস্থা, কমিশন মানেই বিশ্বস্ততা, আর ঘুষ নেওয়া মানেই আজীবনের আত্মীয়তার সম্পর্ক। কেউ হয়তো আত্মীয়-স্বজনের বিয়েতে যায় না, কিন্তু কমিশনের ভাগাভাগির সময় ফোন ধরতে কখনো ভুল করেন না।
এই অদৃশ্য বন্ধন থেকে জন্ম নিয়েছে সমাজে এক বিশেষ শ্রেণি। তাদের আমরা বলতে পারি দুই নম্বর এলিট। এরা দেশের প্রকৃত ভিআইপি। পুলিশ তাদের স্পর্শ করতে পারে না, আইন তাদের বশ মানাতে পারে না, আদালত তাদের সাজা দিতে পারে না। এদের জন্য হাসপাতালের বিশেষ বেড থাকে, আদালতের বিশেষ জামিন থাকে, বিদেশে যাওয়ার জন্য বিশেষ ভিসা থাকে, আর দেশে থাকলে থাকে বিশেষ প্রটোকল। এরা আসলেই বিশেষ মানুষ, কারণ সততা যাদের ছুঁতে পারে না, তাদের চেয়ে বিশেষ আর কে হতে পারে!
দুর্নীতির এই অদৃশ্য পরিবার বৈজ্ঞানিকদেরও বিভ্রান্ত করতে পারে। মহাবিশ্বে সবকিছু নাকি এক অদৃশ্য শক্তিতে বাঁধা থাকে যেমন মহাকর্ষ বল, নিউক্লিয়ার ফোর্স বা ডার্ক ম্যাটার। কিন্তু আমাদের দেশের দুর্নীতির পরিবারে অদৃশ্য শক্তি হলো কমন ইন্টারেস্ট। সরকার ও বিরোধীদল মঞ্চে একে অপরকে গালি দেয়, কিন্তু রাতে একই টেবিলে বসে প্রকল্পের টাকার ভাগাভাগি করে। দিনের বেলা সংবাদমাধ্যমে একে অপরকে চোর বলে দোষারোপ করে, আর রাতের অন্ধকারে একই সিন্দুকের চাবি ঘোরায়। এ রকম ঐক্য পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো জাতিসংঘও একদিন ভাববে, বিশ্বশান্তির মডেল বানাতে হলে বাংলাদেশি দুর্নীতিবাজদের থেকে শেখা উচিত।
মানুষের মধ্যে নানা ধরনের বন্ধন থাকে, কিন্তু দুর্নীতিবাজদের এই বন্ধন সত্যিই অনন্য ও অতুলনীয়। এটি রক্তের সম্পর্ককেও অতিক্রম করেছে। এখানে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক গড়ে ওঠে কমিশনের হিসাব মিলাতে মিলাতে। এখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই, কারণ কমিশনের টাকায় সবার ঈমান সমান শক্তিশালী। এখানে বর্ণ বা ভাষার ভেদাভেদ নেই, কারণ টাকা সবাইকে একই ভাষায় কথা বলতে শেখায়। এমনকি শিক্ষা, দারিদ্র্য বা ভৌগোলিক পার্থক্যও এখানে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। দুর্নীতির দড়ি এত শক্ত যে ইস্পাতের শিকলও এর সামনে ভঙ্গুর মনে হয়।
অতএব, আমরা যদি নিজেদের সৎ মানুষ ভেবে সান্ত্বনা নিই, তবে ভুল করব। সততার রাজ্যে আমরা পিছিয়ে থাকলেও দুর্নীতির মহাবিশ্বে আমরা বহুদূর অগ্রগামী। এই অগ্রগতি সত্যিই হাস্যকর, আবার ভয়ঙ্করও। হাস্যকর কারণ আমরা এমন ঐক্য গড়েছি, যা বিজ্ঞানও ব্যাখ্যা করতে পারবে না। ভয়ঙ্কর কারণ এই ঐক্য আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তম্ভকে ভেঙে ফেলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার, প্রশাসন—সবখানে এই অদৃশ্য সুতোর জাল বিছানো। মানুষ ভাবে তারা আলাদা, কিন্তু আসলে সবাই একই ফাঁদে আটকে আছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়, এই বন্ধন কি কোনোদিন ছিন্ন হবে, নাকি দুর্নীতির এই মহাজাগতিক পরিবারই হবে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক? ইতিহাস হয়তো একদিন উত্তর দেবে, কিন্তু আজকের বাস্তবতায় স্পষ্ট যে সততা যদি মানুষের জীবনকে শীতলতা দেয়, দুর্নীতি তার বিপরীতে এমন এক জ্বালাময় বন্ধনে মানুষকে জড়িয়ে ফেলে যেখান থেকে মুক্তি পাওয়া সবচেয়ে কঠিন।