Published : 16 Nov 2025, 05:07 PM
‘সীমাঞ্চলে এনডিএ এগিয়ে আছে।’ নভেম্বরের কুয়াশায় ঢেকে থাকা বিহারের সকালটা আগেভাগেই ফলাফলের গন্ধ টের পাচ্ছিল। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স–এনডিএ সীমাঞ্চল মানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া সীমান্তের চার জেলা আরারিয়া, কাটিহার, কিষানগঞ্জ, পুর্ণিয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফলাফলের ধারণাটাকে নিশ্চিত করে দিল।
এই এলাকাকে বিহারের রাজনীতিতে ‘রানির মুকুট’ বলা হয়ে থাকে এবং নির্বাচনে এই রানির মুকুট নিয়ে বরাবরই রহস্য থেকে যায়, এবারও ছিল। এখানে মুসলিম ভোট ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখে। মুসলিম ভোটের ওপর নির্ভরশীল কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত মহাগঠবন্ধন (আরজেডি-কংগ্রেস ও বামপন্থী মহাজোট) ভেবেছিল, এবার হয়তো তারা ঘুরে দাঁড়াবে। বিশেষ করে বিহারে Special and Intensive Revision (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ ও নিবিড় সমীক্ষার প্রতিক্রিয়ায় সংখ্যালঘু মুসলিমরা আরও বেশি করে কংগ্রেস ও আরজেডির দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু ঘটল একেবারে উল্টো। সীমাঞ্চলের ২৪ আসনের মধ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেল মাত্র একটি। বাকিটায় বিজেপির পদ্ম বা তীর।
আসাদ উদ্দিন ওয়েইসির ঘুড়ি আকাশে উঠলেও হ্যারিকেন ধরে রাখতে পারল না আরজেডি-কংগ্রেস। যেন নির্বাচনের আগেই লিখে রাখা ছিল, সীমাঞ্চলের রানির মুকুট এবার কমলালেবুর মতো ভাগ হয়ে যাবে। একদিকে বিজেপির এনডিএ, অন্যদিকে ওয়েইসির মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম)। ২০২০ সালে পাঁচটি আসন জিতে সীমাঞ্চলে প্রথমবারের মতো শক্তিশালী দাপট দেখিয়েছিল হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল মিম। মুসলিম অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, সাংবিধানিক অধিকার—এসব ইস্যুকে কেন্দ্র করে কাজ করার কারণে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এবার তারা আরও বেশি জায়গায় দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে এবং একাধিক আসনে জয়ী হয়েছে। আর মিম একাই বাকিগুলোয় এত ভোট কেটেছে যে, কংগ্রেসের নেতৃত্বে মহাজোটের কপালই সত্যি পুড়েছে।
মুকেশ সাহানিকে উপমুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করার যে ‘সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ কংগ্রেসের নেতৃত্বে মহাজোট করতে চেয়েছিল, তা রীতিমতন ব্যাকফায়ার হয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ মাল্লা-নিষাদ ভোটের লোভে ১৯ শতাংশ মুসলিম সমাজকে অখুশি করেছে এই সিদ্ধান্ত। ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, এটি কত বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল।
ওয়েইসি তার দলের প্রচারে প্রশ্ন তুলেছিলেন কংগ্রেসের মহাজোটের প্রার্থীদের নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন—১৩ শতাংশ তেজস্বী যাদবের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রী, ২ শতাংশ মাল্লাদের প্রতিনিধি উপমুখ্যমন্ত্রী, আর ১৯ শতাংশ মুসলিম শুধুই ভোটব্যাংক? এই প্রশ্ন মানুষ শুনেছে এবং মহাজোটের প্রতি ভরসা হারিয়েছে।
এছাড়াও, এসআইআর ইস্যুতে সীমাঞ্চলে বৃহৎ সংখ্যক মুসলিম ভোটারের নাম বাদ পড়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একদিকে ভোট কমেছে, অন্যদিকে ভোট ভাগ হয়েছে। সংক্ষেপে, মহাজোটের হাতে যেন গোনা বাজি।
কিন্তু সব দোষ সংখ্যালঘু ভোট ভাগের ওপর চাপালে ভুল হবে। তিন তালাক আইন বাতিলের পর মুসলিম মহিলাদের একটি অংশ বিজেপিকে ভরসা করতে শুরু করেছে, সেই সঙ্গে এবার নীতীশ কুমারের ১০ হাজার টাকার পরিকল্পনা সেই ভরসাকে আরও শক্তিশালী করেছে। মহাজোট ভেবেছিল মুসলিম মহিলারা ভোটে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু এবার তারা দেখল বাস্তবতা বদলে গেছে। ভাত, ভিজে কাঠ, আর ১০ হাজার টাকার সরকারি সুবিধা এই তিনের জোটটাই ভোটের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
বিহারের রাজনীতির আঙিনায় আরেকটি গল্পও গড়ে উঠেছিল—প্রশান্ত কিশোর বা পিকের পুরোনো গল্পের নতুন অধ্যায়। একসময় ভারতের অর্ধেক নির্বাচনি প্রচারের পেছনে তাঁর পরিকল্পনা কাজ করত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ১০০ আসনের নিচে রাখার যে পূর্বাভাস দিয়েছিল পিকে তা-ও পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল।
কিন্তু বিহারের মাটিতে তিনি যেন অন্য মানুষ। তিন বছর ধরে জনসুরাজ পার্টিকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন পিকে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে কর্পোরেট মডেলে দল সাজিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে তিনি ভাবছিলেন, বিহার বদলে দেবেন। কিন্তু মাঠের রাজনীতি এবং সমাজমাধ্যমের রাজনীতি এক নয়।
পিকে ঘোষণা করেছিলেন—দুর্নীতিগ্রস্ত কাউকে দলের অন্তর্ভুক্ত করবেন না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিলেন। বলেছিলেন দলের প্রথম সভাপতি দলিত হবে, কিন্তু তা হলো না। অন্য দলের লোক নেবেন না বলেছিলেন, পরে আবার নিয়েছেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যিনি ভারতের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শ দেন, তাঁকে নিজের নির্বাচনে কেন দেখা গেলেন না? যে পিকে পশ্চিমবঙ্গে নন্দীগ্রামে মমতাকে লড়াইয়ের পরামর্শ দেন, তিনি নিজে মাঠে নামেননি। ভোটাররা প্রশ্ন করেছে, কিন্তু জবাব পাননি।
ফল একটাই—জনসুরাজ কার্যত ভেস্তে গেছে। পিকের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বিহারের রাজনীতিকে সোশ্যাল মিডিয়ার লেন্সে দেখা। বিহারে রাজনীতি করতে হলে প্রয়োজন তৃণমূল সংগঠন, জাতপাতের সমীকরণ, বাহুবলি এবং দীর্ঘ সময়। তিন বছরের ‘কর্পোরেট রাজনীতিতে’ এই বাস্তবতা বোঝা সম্ভব হয়নি।
বিপরীতে দেখতে পাই চিরাগ পাসওয়ানকে। বাবার ঐতিহ্য বহন করতে গিয়ে তিনি অজস্র বাধা, ভাঙন এবং প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২০ সালে ১৩০ আসনে লড়েও শূন্য জয় পেয়েছিলেন। তখন সবাই বলেছিল, চিরাগের ক্যারিয়ার শেষ। এছাড়াও এলজেপিতে ভাঙন ধরিয়েছিল তাঁর নিজের চাচাই।
কিন্তু তিনি থামেননি। পাঁচটি লোকসভা আসন পেয়েও সবটিতেই জয় নিশ্চিত করেছেন—স্ট্রাইক রেট ১০০ শতাংশ। তার ওপরে মোদী সরকারের মন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারের বিহার বিধানসভা আসন বণ্টনে এনডিএ থেকে ২৯টি আসন কৌশলে নিয়ে নেওয়া চিরাগের বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর ফলে তাঁর দল এবার ২২টি আসনে এগিয়ে ছিল। ভবিষ্যতের বিহার রাজনীতিতে চিরাগ পাসওয়ান প্রধান চ্যালেঞ্জ হবেন—এটি আর কোনো গোপন বিষয় নয়।
অন্যদিকে রাজনীতির পুরনো বটগাছ? নীতীশ কুমার? তাঁকে নিয়ে কত কথাই না হয়েছিল। ‘নীতীশ ফিনিশ’ বিহারের গলি থেকে দিল্লির টিভি স্টুডিও, সর্বত্র এই কথাই চলছিল। বয়স, অসংলগ্ন মন্তব্য, জোট বদল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁকে নিয়ে বেশ রসিকতার জন্ম দিয়েছিল। তেজস্বী বলেছিলেন ‘নীতীশবাবুকে চালাচ্ছে বিজেপির উচ্চবর্ণ নেতারা।’ কেউ বলছিলেন ভোটের পর ভেঙে যাবে তাঁর দল। কিন্তু নীতীশ কখনো রাজনীতিতে কথায় জেতেননি, জিতেছেন কাজে।
সেই নীতীশ আবারও প্রমাণ করলেন, ‘টাইগার আভি জিন্দা হ্যায়।’ এবার তাঁর জেতার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো মহিলা ভোট, জাতপাতের সমীকরণ এবং নিজের ‘সুশাসনবাবু’ ভাবমূর্তি। ২০০০ সাল থেকেই তিনি মহিলা ভোট ব্যাংক তৈরি করেছেন। আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা, সাইকেল প্রকল্প, জীবিকা দিদি, স্বনির্ভর দল তৈরি করা, সুরাবন্দি আর সর্বোপরি এবারের ১০ হাজার টাকা অনুদান। বিহারের মহিলারা ভেবেছেন নীতীশ মানে নিরাপত্তা, নীতীশ মানে স্বস্তি। প্রথমত, এবার পুরুষ ভোটের চেয়ে বেশি মহিলা ভোট পড়েছে। দ্বিতীয়ত জাতপাত।
চিরাগের আগমন বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএকে দিয়েছে দলিত, মহাদলিত, ওবিসি, ইবিসি এবং স্ববর্ণদের যৌথ শক্তি। মহাজোটের পক্ষে এই সমীকরণ ভাঙা ছিল অসম্ভব।
আর নীতীশ কুমারের ব্যক্তিগত ক্যারিশমাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিজের শেষ ভোটকে আবেগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, বিজেপির কাছে মাথা নোয়াতে অস্বীকৃতি, নীরবে প্রচার করা এবং কোনও বিতর্কে না জড়ানো—এসব পদক্ষেপ ভোটারের কাছে তাঁকে ফের বিশ্বস্ত করে তুলেছে। এমনকি একটি ভয়ও কাজ করেছে—যদি বিজেপি বেশি আসন পায়, হয়তো নিজের মুখ্যমন্ত্রী বসাবে। তাই নীতীশের কোর ভোটাররা এবার সম্পূর্ণ একজোট।
বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে—এখানে নেতাদের যতবার মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে, তারা ততবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে। লালু প্রসাদ-নীতীশ—এই দুজনেই বহুবার হেরে গিয়েও ফিরে এসেছেন বিজয়ীর মুকুট পরে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রশ্ন একটাই বিহারে বিজেপি-জেডিইউর এই ভূমিধস জয়ের রহস্য কি? সংক্ষেপে উত্তর—সীমাঞ্চলে মহাজোটের ভরাডুবি, ওয়েইসির ভোট কাটাকাটি, মুসলিম মহিলাদের পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা, নীতীশের নিপুণ ও পরিকল্পিত মাস্টারস্ট্রোক, চিরাগের উত্থান, পিকের পতন, জাতপাতের নতুন সমীকরণ আর এনডিএ-র অভূতপূর্ব সংগঠনিক ক্ষমতা।
কিন্তু গল্পের গভীরে গেলে দেখা যায় বিহার শুধু রাজনীতি নয়, বিহার আবেগ। বিহার ভুলে না, বিহার মনে রাখে। আর এই স্মৃতিতেই লুকিয়ে থাকে রাজনীতির নিষ্ঠুর গণিত। সীমাঞ্চলের গলি থেকে পাটনার রাজপথ, আর সোশ্যা মিডিয়ার তর্ক থেকে চায়ের দোকানের আড্ডা। সব মিলিয়ে একটাই সুর ওঠে আসে বিহারের ভোট কেউ ঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। এখানে গল্প বদলায় শেষ রাতে। এখানে হেরে যাওয়া নেতাও পরদিন ফিনিক্স পাখি। তাই হয়তো জেডিইউ দপ্তরের সামনে দেখা গেছে সেই পোস্টার—‘পঁচিশ সে তিরিশ, ফির সে নীতীশ।’ আর তার নিচে ছোট করে লেখা ‘টাইগার আভি জিন্দা হ্যায়।’