Published : 12 Feb 2026, 11:48 PM
বাংলাদেশের নির্বাচনি ভোটের মাঠ যতটা না প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, তারও বেশি সামাজিক শক্তির প্রকাশ, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, আর নাগরিক মনস্তত্ত্বের পরীক্ষা। সদ্য সম্পন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই অর্থে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ধরা দিয়েছে। কারণ, এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। এরইমধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঐতিহ্যিক বিন্যাসে ফাটল ধরলেও, রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে যে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর সংগঠন এবং ক্ষমতাকে শূন্য-সম খেলা হিসেবে দেখার প্রবণতা খুব একটা বদলায়নি। ব্যালটের লড়াই ছাড়িয়ে এ নির্বাচন আস্থার সংকট, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনস্তত্ত্ব এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে বহাল সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করেছে।
ভোটের আগের রাতকে অনেকে অভিহিত করেছেন ‘লাইলাতুল গুজব’ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নগদ টাকা উদ্ধারের ভিডিও, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা, এজেন্টের সই করা ফাঁকা ফলাফল শিটের ছবি, স্থানে স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের খবর দেশজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, আটক, মারধর ও মামলা হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও বড় প্রশ্ন ছিল এইসব অর্থের উৎস ও উদ্দেশ্য। আটককৃত অর্থগুলো কি নির্বাচনি ব্যয়ের বৈধ সীমার ভেতরকার তহবিল, নাকি ভোটারদের নির্বাচনি মতামতকে প্রভাবিত করার প্রয়াস? একইসঙ্গে একাধিক জেলায় নগদ অর্থের লেনদেনের অভিযোগ উঠায়, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না থেকে গোটা নির্বাচনকে ঘিরেই প্রত্যাশিত আস্থার আবহকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অধিকাংশ অভিযোগই আসছিল জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে এবং এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘লাইলাতুল গুজব’ শব্দটিকে আলোচনায় আনেন।
রাজনীতিতে অর্থের ভূমিকা নিয়ে দেশে বিদেশে বিস্তর গবেষণা আছে। একটি রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক সম্পদ তার সংগঠন বিস্তার, প্রচারযন্ত্র সক্রিয় রাখা, মাঠপর্যায়ে কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং ভোটার সংযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাস্তব সুবিধা দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে অর্থের আধিক্য কাঠামোগতভাবে অন্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে অসম করে তোলে। বিশেষত যেখানে নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা নির্ধারিত থাকলেও তার আইনি প্রয়োগ বরাবরই দুর্বল। বাংলাদেশেও প্রার্থীদের ব্যয়সংক্রান্ত বিধিনিষেধ থাকলেও নগদ লেনদেন, অনানুষ্ঠানিক তহবিল এবং অঘোষিত প্রচার ব্যয়ের অভিযোগ নতুন নয়। ফলে যখন কোনো মাদ্রাসা শিক্ষক বা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে হঠাৎ বড় অঙ্কের নগদ অর্থ পাওয়া যায়, তখন বিষয়টি শুধু একটি ফৌজদারি তদন্তের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর সন্দেহের জন্ম দেয়।
এই সন্দেহের গতি আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে দ্রুত। আদালত বা তদন্ত সংস্থা প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই করতে সময় নেয়, কিন্তু সামাজিক রায় তৈরি হয় তাৎক্ষণিকভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন টকশো, দলীয় বিবৃতি এবং গুজব মিলিয়ে একটি ধারণা গড়ে ওঠে যে, অর্থের প্রবাহ নির্বাচনি ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। গণতন্ত্রের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ নির্বাচন প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষার চাইতেও বেশি–এক ধরণের আস্থার চুক্তি। ভোটার যদি বিশ্বাস করেন যে, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা সমান নয়, তাহলে রাজনীতিতে জনঅংশগ্রহণের নৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোটার হিসেবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ তখন আর নাগরিক দায়িত্ব না থেকে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এ ধরণের মানসিক বিচ্ছিন্নতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। কারণ, রাজনীতিতে আস্থাহীন নাগরিক বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে আগ্রহ হারায়।
ভোটের দিনের চিত্রও আগের রাতের স্নায়ুচাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল না। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণের খবর এসেছে, কোথাও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা, কোথাও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ, আবার কোথাও বিরোধী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিছু কেন্দ্রে জাল ভোট সনাক্তের পর ভোটগ্রহণ সাময়িক স্থগিত করা হয়, কিছু স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের কথাও সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দুপুর পর্যন্ত কয়েকশ ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার তথ্য নথিভুক্ত হয় এবং সীমিতসংখ্যক জাল ভোট ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা স্বীকার করা হয়।
পরিসংখ্যানের বিচারে মোট কেন্দ্রের তুলনায় এই সংখ্যা হয়তো কম। দেশে যদি ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্র থাকে, তবে কয়েকশ কেন্দ্র শতাংশের হিসেবে সীমিত অনিয়মকে স্পষ্ট করে। কিন্তু গণতন্ত্রে গাণিতিক অনুপাতের বাইরেও কথা থাকে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিক ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে। একটি কেন্দ্রের অনিয়ম মানে সেখানে উপস্থিত ভোটারের জন্য প্রক্রিয়াগত অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া। ফলে শতকরা হিসাব অনিয়মের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে না।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল সেইসব ভোটারের অভিজ্ঞতা, যারা কেন্দ্রে গিয়ে শুনেছেন তাদের ভোট ইতোমধ্যে দেওয়া হয়ে গিয়েছে। একজন প্রবীণ নারী ভোটার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেক কষ্টেসৃষ্টে কেন্দ্রে এসেও ভোট দিতে না পেরে। আরেকজন বিস্মিত হয়ে উপস্থিত সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রশ্ন করেছেন তারা উপস্থিত থাকতে তার নামে অন্য কেউ ভোট দিল কীভাবে। ভোটাধিকার একজন নাগরিকের একটি সংবিধিবদ্ধ অধিকার শুধু নয়। এটি একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও নাগরিক অস্তিত্বেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভোট দানের মধ্য দিয়ে একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে নিজের অস্তিত্ব, পছন্দ এবং আগামীর সিদ্ধান্তটুকু পৌঁছে দেন। তাই কেউ যখন জানতে পারেন যে তার অজান্তেই তার অমূল্য সিদ্ধান্তের অধিকার অন্য কেউ হরণ করে ফেলেছে, তখন এটা তার জন্য হয়ে দাঁড়ায় গুরুতর অবমাননা।
তবে পুরো চিত্র একরৈখিক ছিল না। অনেক কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন, শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, প্রবীণ নাগরিকের অংশগ্রহণ, প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণ-তরুণীর উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। শতবর্ষী নারী নাতনির মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে কেন্দ্রে এসেছেন, নববিবাহিত তরুণ বিয়ের পোশাকেই ভোট দিয়েছেন, তরুণ প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সচিত্র অভিজ্ঞতা ভাগ করেছে। এসবের মাধ্যমে এটা অন্তত স্পষ্ট যে, নাগরিক স্তরে গণতন্ত্রের প্রতি এদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখনও শক্তিশালী।
এই দুই অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনে বোঝা যায়, নাগরিকের আকাঙ্ক্ষা আর রাজনীতির সমীকরণ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন ভোটকেন্দ্রে নবীন-প্রবীণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক চেতনার গভীরতাকে ফুটিয়ে তুলেছে অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দানেও এসেছে বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের দ্বিমেরু রাজনীতির কাঠামো ভেঙে এখন নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে; বিশেষকরে আদর্শিক দলগুলো তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। তবে কেবল সাংগঠনিক শক্তি বা মাঠপর্যায়ের দখলই সব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক সহনশীলতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনও জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। দিনশেষে সাধারণ মানুষের এই যে ভোটের প্রতি প্রবল আগ্রহ, তার পূর্ণ মর্যাদা দিতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল শক্তিশালী সংগঠন হলেই চলবে না, নৈতিক স্বচ্ছতা ও বৃহত্তর গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে।
একইভাবে, যদি প্রধান বিরোধী শক্তি প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং নির্বাচন সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে তাদের সামনে আত্মসমালোচনা এড়ানোর সুযোগ থাকবে না। অভিযোগ নির্ভর আন্দোলন কিছু সময় সমর্থন জোগাতে পারে ঠিকই, কিন্তু জনগণের স্পষ্ট রায়ে পরাজয় চেপে ধরলে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। প্রয়োজন হবে সংগঠন পুনর্গঠন, নেতৃত্বের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক কৌশল ও নীতির পুনর্বিবেচনা। যে দল নিজেদের ভেতরের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটে, দীর্ঘমেয়াদে তারাই টিকে থাকে এবং দ্রুতই জনআস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
নাগরিক স্মৃতিতে এই নির্বাচন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা রেখে যাবে। এক দিকে গ্রেপ্তার, জরিমানা, সহিংসতার আশঙ্কা এবং বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের সফল সমাপ্তি। নির্বাচন ব্যবস্থায় অন্তত এইটুকু সফলতা দেখা গেছে যে, যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল নির্বাচনকে সেমত সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে এই স্বস্তিতে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই।
‘লাইলাতুল গুজব’ দিয়ে শুরু হওয়া এই নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত আলো আর আঁধারের এক বিচিত্র মিশেলে শেষ হয়েছে। আমাদের গণতন্ত্র এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব হলেও, তা যে একেবারে স্থবির হয়ে যায়নি- এই নির্বাচন এর বড় প্রমাণ। কেন্দ্রে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আর বিপুলসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়া আস্থাকে আবারও জাগিয়ে তোলার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন, যদি দলগুলো উপলব্ধি করে যে, প্রতিটি ভোটারই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার এক একটি দরকারি শক্তিকেন্দ্র, তাহলে এই নির্বাচন আগামীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।