Published : 04 Apr 2026, 12:41 PM
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি ওয়াজ মাহফিলে ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার সৌন্দর্যের বর্ণনা করে কঠোর সমালোচনার মুখে ক্ষমা চেয়েছিলেন ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজা। তখন তিনি ফেইসবুকে দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে লিখেছিলেন: “আমি স্বীকার করছি মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি সুস্থ না। শারীরিক ও মানসিক কোনোদিক দিয়েই আমি ফিট না।” তিনি ভক্তদের অনুরোধ করেছিলেন, তার ভুলভ্রান্তিগুলো দিয়ে যাতে বিচার করা না হয়। তিনি কথা দেন, পরবর্তী বছরগুলোতে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি এবং যথাযথ চিকিৎসা নিয়ে তাফসির মাহফিলে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি কথা রেখেছেন কিনা আমাদের জানা নেই। তবে রাশমিকার বিয়ের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে তারা আমির হামজার সেই সৌন্দর্য বর্ণনা বিস্মৃত হননি।
ওই ঘটনার বছরখানেকে পরে গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি ওয়াজ মাহফিলে আমির হামজা দাবি করেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন, সকালবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের শিক্ষার্থীরা মদ দিয়ে কুলি করছেন। তার এ বক্তব্যের একটি অংশ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। যেখানে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, “১৬ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে আজান দিতে দেওয়া হয়নি।” এই বক্তব্য নিয়েও তীব্র সমালোচনা শুরু হলে আমির হামজা দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাম বলতে গিয়ে তিনি মুহসিন হলের নাম বলে ফেলেছেন। মুখ ফসকে গেছে। এ জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রীতিমতন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমির হামজার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমির হামজা নামের একজন বক্তার বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আমির হামজা তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন এবং আবাসিক হলে সকালে ‘মদ’ দিয়ে কুলি করতে দেখেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিক্ষকদের লাঠি দিয়ে পেটায়। প্রকৃতপক্ষে তার কোনো বক্তব্যই সত্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে এই বিভাগে প্রথম শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। সুতরাং আমির হামজা জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা সত্য নয়।
ওই সময় আমির হামজাকে তার দল থেকে সতর্ক করে দেওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি কোরানের তাফসিরের বাইরে আর কিছু বলব না। কোনো বিষয়ে তুলনা করে কথা বলতে গেলেই প্যাঁচ লেগে যায়। আমি আর এসবের মধ্যে নেই।”
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই আমির হামজা কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। সম্প্রতি একটি ওয়াজ মাহফিলে খোদ জাতীয় সংসদের নারী এমপিদের নিয়ে তার বক্তব্যের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়: “রুমিন ফারহানা আপা আছে। এরপর এই যে মন্ত্রী পটলের মেয়ে আছে, ফারজানা শারমিন। আমার বামে, ডাইনে এমন এমন বডিআলা লোক পেয়েছি। এগুলোতো সিরিয়াল করা থাকে আগের থেকে। কে কোথায় বসবে আমরা জানিও না। আল্লাহর ইশারা, ভেতরে গিয়ে দেখি আমার ডানে বামে শুধু ভুড়িওয়ালা। এমন এমন বড় বড় ভুড়ি, আমার মনে হয় ভুড়ি ছিঁড়লে এর ভেতর থেকে ব্রিজ কালভার্ট এগুলো বের হবে। মহিলারা ওদের দেখলে লজ্জা পাবে। রুমিন ফারহানা আপা আছে...আপারা আমার সামনে। আমার মাঝেমাঝে চিন্তা হয়, হায় আল্লাহ আমার ডানে বামে যে অবস্থা, ম্যাডামগুলো যদি ওদের পেটের দিকে তাকায়, ভাববে আল্লাহ–ছেলেমেয়ে হয় আমাদের, আর পেট হয় হুজুরের পাশের দুইজনের। কি বডি (এটা বলেছেন খুবই বিকৃত ভঙ্গিতে, তখন বাকিরা হেসে উঠেছেন)! উকুন মারা যাবে বডির ওপরে।”
প্রশ্ন হলো, কোরানের কোনো আয়াত বা কোনো হাদিস প্রকাশ্যে এই ধরনের বক্তব্য দেওয়াকে কি সমর্থন করে? তাও ইসলামিক আলোচনায়? চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়া আর হাজার হাজার মানুষের সামনে ইসলামের বয়ান কি এক জিনিস? একজন ইসলামিক স্কলার, যিনি আবার সংসদ সদস্যও, কি এই ভাষায় কথা বলতে পারেন? তিনি হয়তো দাবি করবেন, নারীদের নিয়ে কোনো কটাক্ষ করেননি। কিন্তু নারী বা পুরুষ কাউকে বডিং শেইমিং করার অধিকার কি তার আছে?
সম্প্রতি আমির হামজা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা আব্বাসের অসুস্থতা নিয়েও ঠাট্টা করে সমালোচিত হয়েছেন। কাছাকাছি সময়ে তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘আপাদমস্তক নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষী’ বলেও মন্তব্য করেন। ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার নামাজের আগে এক আলোচনায় আমির হামজা বলেন, “জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নাস্তিক এবং ইসলামবিদ্বেষী। তিনি জামায়াতে ইসলামী কিংবা চরমনাই বিদ্বেষী নন, তিনি ইসলামবিদ্বেষী।” তার এই বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আমির হামজাকে নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে মানহানির একাধিক মামলাও হয়েছে।
আসা যাক সংসদীয় রীতি-নীতির প্রসঙ্গে। সংসদ চলে সংবিধান ও কার্যপ্রণালি-বিধি দ্বারা। কার্যপ্রণালি-বিধির ২৭০ বিধিতে বলা হয়েছে, বক্তৃতাকালে কোনো সংসদ সদস্য অপ্রীতিকর ভাষা ব্যবহার করবেন না; আক্রমণাত্মক, কটু বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করবেন না; দেশদ্রোহিতামূলক, রাষ্ট্রবিরোধী বা মানহানিকর উক্তি করবেন না ইত্যাদি। কিন্তু সংসদের বাইরে এমপিরা কোন ভাষায় কথা বলবেন বা বলতে পারবেন না, সেটি কার্যপ্রণালি-বিধিতে উল্লেখ নেই। তাছাড়া কোনো সংসদ সদস্য যদি তার কোনো সহকর্মী বা অন্য কারো সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন, সেজন্য কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, সেটিও সংবিধান বা কার্যপ্রণালি-বিধিতে উল্লেখ নেই। তবে বিষয়টা যতটা না সাংবিধানিক ও আইনি, তার চেয়ে বেশি নৈতিকতার।
যিনি সংসদ সদস্য, তিনি রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা। দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তারা সংবিধানও পরিবর্তন করে ফেলতে পারেন। এত বিশাল যাদের ক্ষমতা ও মর্যাদা—তাদের কেউ যখন তার সহকর্মীদেরই বডি শেইমিং করেন, সেটি হোক সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে কোনো রাজনীতির মঞ্চে অথবা ওয়াজ মাহফিলে—সেটি শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধও বটে।
কী কী কারণে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য তার পদ হারাবেন, সেটি সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ-সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়।
আমির হামজা নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ নন। নাকি বারবার তিনি সচেতনভাবেই বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনে অসুস্থতার ঢাল তুলছেন? বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে কি সেটা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব?
সবশেষ তিনি সংসদ সদস্যদের নিয়ে যেসব কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, এতে সংক্ষুব্ধ কোনো নাগরিক যদি তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগে মামলা করেন এবং আদালত তাকে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ড দেন, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদই থাকার কথা নয়।
পৃথিবীর অনেক দেশেই ‘রিকল পদ্ধতি’ চালু আছে। রিকল বা প্রতিনিধি প্রত্যাহার হলো এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো নির্বাচনি এলাকার ভোটারগণ নির্ধারিত সংখ্যক স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে পদচ্যুত করার জন্য পুনর্নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে পারেন। অর্থাৎ কোনো সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের আস্থা হারান বা জনগণ যদি মনে করে যে তিনি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ করেছেন, তাহলে তারা ওই প্রতিনিধিকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনি ব্যবস্থায় কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, শপথ ভঙ্গ করলে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কিংবা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহির সুযোগ নেই বললেই চলে। অর্থাৎ তাদের রিকল বা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এই পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছে। (নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন/২০২৫, পৃ. ১৬৪)।
আমির হামজার বিরুদ্ধে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হবেন কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে যেকোনো সংক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য এর প্রতিকার চাইতে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। গত ২ এপ্রিল পয়েন্ট অব অর্ডারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গে টেনে স্পিকারকে বলেন, “এই সংসদে উপস্থিত আমি এবং আমার আরও দুজন নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে এই সংসদে উপস্থিত আরেকজন সংসদ সদস্য যে কদাকার, কুৎসিত ভাষায় ওয়াজ মাহফিল করেছেন, যে কুৎসিত ভাষায় তিনি বক্তব্য দিয়েছেন; আমি আপনার কাছে এই ব্যাপারে বিচার চাইছি।” জবাবে স্পিকার বলেন, সংবাদপত্রের রিপোর্টিং নিয়ে কোনো পয়েন্ট অব অর্ডার হয় না।
প্রশ্ন হলো, কোনো একজন সংসদ সদস্য যদি সংসদের ভেতরে বা বাইরে আক্রমণের শিকার হন; অসম্মান ও অবমাননার শিকার হন, তার প্রতিকার কী?
কার্যপ্রণালি-বিধির ১৬৫ বিধি অনুযায়ী যেকোনো সংসদ সদস্য তার বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে—এমন অভিযোগ উত্থাপন করে নোটিশ দিতে পারেন। রুমিন ফারহানাসহ সংসদের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে আরেকজন সংসদ সদস্য যে কুৎসিত ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি নিঃসন্দেহে ওই সদস্যদের মর্যাদা হানিকর। এর দ্বারা তাদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। অতএব এ বিষয়ে তারা স্পিকারের কাছে প্রতিকার চাইতেই পারেন এবং চাওয়া শুরু করেছেন। সংসদ কি করে এখন তা দেখার বিষয়।