Published : 29 Dec 2025, 08:19 AM
ডিসেম্বর এলেই বাংলাদেশে বিজয়ের কথা উচ্চারিত হয়। রাষ্ট্রীয় ভাষ্য, রাজনৈতিক বক্তৃতা ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় ফিরে আসে রক্তপ্রাণের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ওই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেদিন ৯৩ হাজার পরাজিত পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করেছিল। এই স্মরণপর্ব একদিকে গৌরবের, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলনেরও।
প্রশ্ন উঠছে, এই বিজয় কি কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসে পুনরাবৃত্ত উচ্চারণের বিষয়, নাকি তা একটি চলমান রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় প্রতিফলিত না হয়, তবে বিজয়ের স্মরণ কি নিছক অতীতচারিতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায় না?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এই অভ্যুত্থান কেবল একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়নি, বাংলাদেশকে নতুন এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ঠেলে দিয়েছে। কারণ, আজকের বাংলাদেশে এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই, যাকে দেখে এদেশের মানুষ নিঃসঙ্কোচে বলতে পারে, এরাই আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় থেকে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে রাষ্ট্র, দল ও সরকার কার্যত একাকার হয়ে যায়। ভিন্নমত দমন, নির্বিচার গুম-খুন, নির্বাচন ব্যবস্থার বিপর্যয়, প্রশাসনের দলীয়করণ, অস্বাভাবিক দুর্নীতি ও অর্থপাচার—সব মিলিয়ে মানুষের ক্ষোভ জমতে জমতে বিস্ফোরণ ঘটায় ২০২৪ সালের জুলাই–অগাস্টে। রক্তের দামে ওই সরকার তার দলবলসহ বিদায় নেয়।
এখানেই গল্প শেষ না হয়ে বরং এখান থেকেই শুরু হয় নতুন পরিহাস। যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মিত্র ছিল, ওই ভারতই এবার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত নেতৃত্বকে আশ্রয় দেয়। শুধু আশ্রয় নয়, বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে তারা ‘চরমপন্থা’, ‘অস্থিতিশীলতা’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’, ‘মৌলবাদের উত্থান’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এতে করে বহু মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, ১৯৭১ কি তাহলে ভারতের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক পুঁজি ছিল?
এই প্রশ্ন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসও আর আগের মতো অক্ষত থাকেনি। আওয়ামী লীগ ও ভারতের তৈরি একচেটিয়া বয়ান, অতিরঞ্জন, নির্বাচিত স্মৃতি—সবই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। মানুষ নিরপেক্ষ ইতিহাস চায়। কিন্তু ইতিহাসের এই পুনর্পাঠও যে সহজ নয়, তাও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়।
এই শূন্যতার ভেতরেই সামনে আসে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলো ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ। ফলে অনেকেই বলতে শুরু করেন, ইতিহাস কি তাহলে পুরো উল্টো পথে হাঁটছে?
সমস্যাটা এখানেই শুরু হয়। কারণ, ইতিহাস শুধু ভূমিকার হিসাব নয়, ইতিহাস দায়েরও হিসাব। জামায়াতে ইসলামী আজ সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক অপরাধের প্রশ্নে তারা নীরব। ক্ষমা চাওয়ার নৈতিক সাহস তাদের নেই। উপরন্তু, তাদের রাজনৈতিক দর্শনে এখনো একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার ছায়া রয়ে গেছে। ফলে তারা বিকল্প হলেও, ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্যদিকে, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি হিসেবে বিবেচিত বিএনপি। কিন্তু এই দল নিয়েও জনমনে গভীর সংশয় কাজ করে। কারণ, একদিকে শোনা যায় ভারতের সঙ্গে তাদের গোপন বোঝাপড়ার কথা, অন্যদিকে দেখা যায় জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে তাদের নানাবিধ অনীহা। আরও বড় কথা, গত দেড় বছরে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে যে সহিংসতা, চাঁদাবাজি, পেশিশক্তির প্রদর্শন আমরা দেখেছি, তা পুরনো রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি। সমস্যা কয়েকজন নেতার নয়, সমস্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির। মানুষ ভয় পাচ্ছে, এই দল ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ আবার কি সেই চেনা চক্রেই ফিরে যাবে?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ে প্রাথমিক আশাবাদ তৈরি হলেও তা বেশিদিন টেকেনি। দলটি নতুন, দুর্বল, এবং কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওই সম্ভাবনাকেও ক্ষয় করেছে। জনগণের সঙ্গে সংযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে এই শক্তিটিও এখনো ভরসার জায়গা হয়ে ওঠেনি। বরং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে যে শক্তিটি সবচেয়ে দ্রুত ও আক্রমণাত্মকভাবে উঠে এসেছে, তারা হলো ইসলামপন্থী দলগুলো। শরিয়া আইন, ইসলামী শাসনের স্বপ্ন—এই সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দেড় বছরে শতাধিক মাজার ভাঙচুর, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষকে প্রকাশ্যে নাজেহাল করা, প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব দেখে মনে হয়, রাষ্ট্র সংস্কারের জায়গায় আমরা সমাজ ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছি।
এই পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় বাঙালি জাতির মনস্তত্ত্বের প্রশ্নে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা যে ‘Effeminate Bengali’ বা ‘দুর্বল বাঙালি’র ধারণা তৈরি করেছিল, সেটি যেন আজও আমাদের রাজনীতিতে ছায়া ফেলছে। লর্ড মেকলে থেকে শুরু করে রবার্ট ওরম তারা বাঙালিকে দুর্বল, বাচাল, প্রতিরোধে অক্ষম হিসেবে চিত্রিত করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, একটি জাতির আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া।
কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে এই ধারণা ভেঙে পড়ে। গঙ্গারিডির যুদ্ধ-হাতির গল্পে আলেকজান্ডারের ফিরে যাওয়া, ঈশা খাঁর নদীকেন্দ্রিক গেরিলা যুদ্ধ, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, আর সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ প্রমাণ করে, বাঙালি কখনোই কাপুরুষ ছিল না।
সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। সমস্যা ছিল বিশ্বাসঘাতকতায়, নেতৃত্বের নৈতিক দুর্বলতায়, আর ক্ষমতার মোহে। পলাশীর প্রান্তরে আমরা হেরেছিলাম শক্তির অভাবে নয়, বিশ্বাসঘাতকতায়। আজও কি আমরা ওই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, বাঙালি এখনও প্রতিবাদ করতে জানে। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ দিয়ে রাষ্ট্র গড়া যায় না। রাষ্ট্র গড়তে লাগে নৈতিকতা, ইতিহাসের প্রতি সততা এবং এমন রাজনীতি—যা জনতার মনে ভয় নয়, আস্থার সঞ্চার করে।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই, আমরা কি আবার বিজয়ের স্মৃতিকে রাজনৈতিক পুঁজি বানিয়ে পরবর্তী পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছি? নাকি এই বিভ্রান্তির মধ্য দিয়েই আমরা নতুন কোনো পরিণত রাজনৈতিক চেতনায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখতে পারি?
পলাশীতে যে সূর্য অস্ত গিয়েছিল, একাত্তরে তা আবার উদিত হয়েছিল। ২০২৪-এর পর ওই সূর্য তার আরাধ্য আলো ছড়াবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের ওপর, আমরা সাহসের পাশাপাশি প্রজ্ঞাকেও রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে পারি কি না, তার ওপর।