Published : 26 Aug 2025, 10:34 PM
গত তিন দিন ধরে চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ভেতরটা যেন শূন্য হয়ে গেছে। হৃদয়ের প্রতিটি কণিকা আজও বিশ্বাস করতে পারছে না—আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, আমাদের সবচেয়ে বড় ছাতা, সেই বিভুদা হারিয়ে গেছেন চিরতরে।
২১ অগাস্ট সকাল ১০টার দিকে তিনি বের হয়েছিলেন—সাধারণ দিনের মতো, অফিসে যাওয়ার কথা বলে। কে জানত, এটাই হবে তার শেষ প্রস্থান? আমরা ভেবেছিলাম বিকেলে বা রাতে হয়তো ফোন আসবে, কিংবা তিনি ফিরবেন হাসিমুখে। কিন্তু ভাগ্য যে এমন নিষ্ঠুর হতে পারে, তা কোনো দিন কল্পনাও করিনি।
পরদিন, ২২ অগাস্ট বিকেলে খবর এল—মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া এলাকায়, বিশাল মেঘনার বুকে ভেসে উঠেছে তার নিষ্প্রাণ দেহ। চোখের সামনে আঁধার নেমে এল। মনে হচ্ছিল, এ যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য, কিন্তু না—এটাই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা।
কীভাবে বোঝাই, এটি আমাদের পরিবারের জন্য কত বড় ট্রাজেডি! কী সীমাহীন ক্ষত, কী অসীম ক্ষতি আমাদের বুকের ভেতর চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেল! স্বপ্নেও আমরা ভাবিনি, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। বিভুদা ছিলেন আমাদের পুরো পরিবারের প্রাণ—বটবৃক্ষ। তার ছায়ায় আমরা দাঁড়িয়ে থেকেছি এতদিন, তার শক্তি নিয়েই টিকে ছিলাম।
কিন্তু বিভুদাকে বোঝার জন্য হলে শুধু শেষ কয়েকটা দিন নয়, ফিরে যেতে হয় অনেক দূরে—অতীতের গভীর অন্ধকারে, আমাদের পরিবারের সংগ্রামের সূচনালগ্নে।
আমাদের পরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমরা ছিলাম একেবারেই স্বচ্ছল পরিবার। ব্যবসা ছিল, জমি-জমা ছিল, স্বপ্ন ছিল। কিন্তু একাত্তর সব কেড়ে নিল।

জীবন বাঁচাতে আমরা সীমান্ত পার হয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিলাম। স্বাধীন দেশে ফিরে এসে পেলাম কেবল একখণ্ড ভিটে। যেসব প্রতিবেশীর কাছে আমাদের দ্রব্যসামগ্রী রেখে গিয়েছিলাম—তাদের কাছে থেকে কিছুই ফেরত পাইনি। এমনকি ঘরের বেড়া, টিনের চাল পর্যন্ত লুট হয়ে গিয়েছিল।
একেবারে শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে আমার বাবা তখন জীবনযুদ্ধে নামলেন। একদিকে নিঃস্বতা, অন্যদিকে ১১ সন্তানের বিশাল দায়িত্ব—এই যুদ্ধ সহজ ছিল না। বাবা ব্যবসায় আর সুবিধা করতে পারলেন না। অল্পবিস্তর জমি চাষ করেই চালাতে লাগলেন সংসার। আমাদের বড় ভাই কিছুটা সাহায্য শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার অকাল মৃত্যু এল অকস্মাৎ বজ্রপাতের মতো।
তখন লেখাপড়া বাদ দিয়ে এইচএসসি পাস তৃতীয় ভাই এগিয়ে এলেন সংসারের হাল ধরতে। তিনি স্থানীয় এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। দিনান্ত পরিশ্রম করে যে সামান্য আয় করতেন, তার পুরোটাই সংসারে দিতেন। তখন আমরা ছোট পাঁচ ভাইবোন স্কুলে পড়তাম। সংসারে টানাটানি ছিল, অভাব ছিল, কিন্তু কোনোভাবে দিন চলছিল।
এরপর এল সেই ভয়ঙ্কর রাত। আমাদের সেই ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। তিনি যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, সেখানেই রাতে থাকতেন। ধারণা করা হয়, ডাকাতরা লুট করতে এসে বাধার মুখে তাকে খুন করে।
এই মৃত্যুতে বাবার মন ভেঙে যায়। দুই সন্তানের অকাল মৃত্যু, সর্বস্ব হারানোর বেদনা, প্রতিদিনের অভাব—এসবের চাপে তিনি হয়ে পড়লেন ভীষণ ক্লান্ত, বিষণ্ণ। দুঃখ আর বিষাদ ছাড়া আমাদের তখন আর কোনো সম্বল ছিল না।

এমন কঠিন সময়ে পরিবারের মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে বিভুদার। ভাইদের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝো। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্য সবার থেকে আলাদা—মনেপ্রাণে বিপ্লবী।
স্কুলজীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। সমাজ বিপ্লবের বাইরে তার আর কোনো ধ্যান-জ্ঞান ছিল না। এইচএসসি পাস করে ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পরিবারের সঙ্গে তার যোগসূত্র ছিল খুবই ক্ষীণ। মাকে তিনি একদিন বলেছিলেন—
“তোমার তো ১১ জন সন্তান, এর মধ্যে থেকে আমার নাম কেটে দাও। মনে কর, তোমার ১০ জন সন্তান। আমি পরিবারের নয়, পার্টির জন্য, দেশের জন্য বাঁচব।”
তিনি সত্যিই তাই করেছিলেন। বাড়ি থেকে কোনো টাকা নিতেন না, বাবারও সেই সামর্থ্য ছিল না যে তাকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করবেন। ঢাকায় তিনি পার্টির কাজ করতেন, নিজের টিকে থাকার মতো আয় করতেন। বছরে এক-দুদিন বাড়ি ফিরতেন—এটাই ছিল আমাদের সঙ্গে তার সান্নিধ্য।
কিন্তু ভাগ্য তাকে অন্য পথে টেনে আনল। আমাদের দ্বিতীয় ভাইয়ের মৃত্যুর পর যে ছেলে নিজেকে পরিবারের দায় থেকে সরিয়ে নিয়েছিল, সেই বিভুদার কাঁধেই ধীরে ধীরে চেপে বসল সংসারের সমস্ত দায়িত্ব।
এদিকে একদিন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বাবাও মারা গেলেন। অসীম পাথারে ডুবে যাওয়া পরিবারের ভার এসে পড়ল বিভুদার ওপর। তিনি আর তখন শুধু বিপ্লবী ছিলেন না—তিনি হলেন আমাদের অভিভাবক, আশ্রয় এবং বেঁচে থাকার শেষ ভরসা।
দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পর যে ভয়াবহ শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার দায়িত্ব এসে পড়ে বিভুদার কাঁধে। তিনি রাজনৈতিক জীবনকে বিদায় দিয়ে ভাইবোনদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবার প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করলেন।
আমাদের পিঠাপিঠি পাঁচজনকে লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে এলেন। সংসারে তখন ভাতেরই ছিল অপ্রতুলতা, অথচ তিনি স্বপ্ন দেখতেন—আমাদের প্রত্যেককে মানুষ করবেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বাড়ল। পরিবার থেকে বিয়ের চাপও এল। অবশেষে কিছুটা পরিণত বয়সে তিনি বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—বিয়ের পরও তার অঙ্গীকার বদলাল না। বৌদিকে পাশে নিয়েই তিনি আমাদের মানুষ করার কাজ চালিয়ে গেলেন।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, আমার সামনে তখন বিশাল অনিশ্চয়তা। হলে থাকা, খাওয়া, পড়াশোনার খরচ—কোথা থেকে আসবে? ঠিক তখনই বৌদি—যিনি নিজেও সীমাহীন কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন—আমার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন। পুরো ছয় বছর আমার হলে থাকার খরচ এসেছে তার হাত থেকে।
এ যেন ছিল এক অদৃশ্য মায়ের হাত—যিনি নিজের পরিবার, সন্তান, স্বামী সামলিয়ে আমাদেরও সন্তান ভেবে আগলে রেখেছিলেন।
সময়ের স্রোতে আমরা ধীরে ধীরে চাকরিজীবনে ঢুকতে থাকি। আমাদের প্রতি বিভুদার অর্থলগ্নি করার দায় কমে আসে। কিন্তু আমার প্রতি তার বিশেষ কেয়ার ছিল সবসময়।
তিনি চাইতেন আমি যেন একটি ভালো, স্থায়ী, নিশ্চিত চাকরি পাই। যেখানে মাসের শেষে বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না, প্রতিদিন অস্থিরতায় ভুগতে হবে না।
এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি একসময় বাংলা একাডেমিতে আমার চাকরির জন্য অমানুষিক চেষ্টা চালালেন। ‘প্রথম আলো’ সম্পাদক মতিউর রহমান, শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ছায়ানটের ওয়াহিদুল হকসহ বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে সুপারিশ জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে গেল। পরে জানলাম, বাংলা একাডেমি অন্য একজন প্রার্থীকে নিয়েছে।
সেই খবর বিভুদার চোখে একরাশ অভিমান ফুটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি আমার সামনে কখনো ভেঙে পড়েননি। বরং বলেছিলেন—“চেষ্টা করতে হয়। আজ হলো না, কাল হবে।”

এদিকে বিভুদার নিজের সংসারে নতুন আলো জ্বলে উঠল। তার ঘরে জন্ম নিল দুই নক্ষত্র—অদিতি আর ঋত। কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
মাত্র চার বছর বয়সে ঋত ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হলো—গুলেনবারি সিন্ড্রোম। প্রায় পাঁচ মাস ঢাকা পিজি হাসপাতালের আইসিইউতে কাটাতে হলো ছোট্ট শিশুটিকে। প্রতিদিন চিকিৎসকরা জানাতেন খারাপ খবর। আমরা প্রায় হার মানছিলাম। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ঋত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এল।
এই চিকিৎসায় বিভুদা পড়ে গেলেন লাখ লাখ টাকার দেনায়। কিন্তু ঋতকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে সেই দেনার ভারকেও তিনি হালকা মনে করলেন। সবাই বললেন—“সন্তান বেঁচে আছে, সেটাই তো বড় কথা।”
তবে ভাগ্য আর তাকে শান্তিতে থাকতে দিল না। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই আক্রান্ত হলেন নানান জটিল রোগে। একসঙ্গে হার্ট, কিডনি, লিভার—সব অঙ্গ যেন বিদ্রোহ শুরু করল।
চিকিৎসা শুরু হলো। শুভানুধ্যায়ীরা সাহায্যের হাত বাড়ালেন। তবু একপর্যায়ে খরচ দাঁড়াল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। শুভানুধ্যায়ীদের সাহায্যের বাইরেও অনেক টাকা ঋণ করতে হলো। এই ঋণের বোঝা থেকে তিনি আর কখনোই মুক্ত হতে পারেননি।
স্বাস্থ্য আর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থেকেও বিভুদা হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। মতাদর্শিক কারণে ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি নানা পত্রিকায় সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। প্রথমে ‘অপরাজেয় বাংলা’। এরপর আরও কয়েকটি। সবগুলোর নাম এই মুহূর্তে মনে নেই! তারপর আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা—‘দৈনিক মাতৃভূমি’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত। মেজর সুরঞ্জন দাস নামের এক ব্যক্তি আশার সিঁড়ি দেখিয়ে শেষমেশ গাছে তুলে মই কেড়ে নিলেন। ঋণ করে, জোড়াতালি দিয়ে পত্রিকাটি কিছুদিন চালালেন বিভুদা। কিন্তু ততদিনে তিনি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে পড়েছেন। এই পত্রিকাটি বিভুদাকে একেবারেই সর্বস্বান্ত করে দেয়।
অনেকদিন বেকার থাকার পর শুরু হলো নতুন অধ্যায়। ‘চলতিপত্র’ নামে একটি সাপ্তাহিক বের করলেন। দ্রুত জনপ্রিয়ও হয়ে উঠল। কিন্তু যাকে বিশ্বাস করে হিসাবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি সব টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন।
পত্রিকাটি বাঁচাতে ছুটলেন ব্যবসায়ী মিরনউল্লাহ মানিকের কাছে। প্রথমে সাহায্য পেলেও একপর্যায়ে সেই ব্যক্তি নিজেই সম্পাদক হয়ে গেলেন। আবারও বিভুদা বঞ্চিত হলেন।
কিছুদিন পর আওয়ামী লীগ আমলের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ‘মৃদুভাষণ’ নামে একটি মননশীল সাপ্তাহিক বের করলেন। পত্রিকাটি বাজারে খুব না চললেও রাজনৈতিক মহলে আস্থা অর্জন করেছিল। সে সময় কিছুটা আর্থিক স্বস্তিও পেয়েছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, কিবরিয়া সাহেব গ্রেনেড হামলায় নিহত হলেন। তার ছেলে রেজা কিবরিয়া পত্রিকার দায়িত্ব নিলেও তার হস্তক্ষেপ আর অনভিজ্ঞতায় পত্রিকাটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
আবারও বেকারত্ব।
একপর্যায়ে বিভুদার বন্ধু রঞ্জন কর্মকারের হাত ধরে স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট নামে একটি এনজিওতে যোগ দিলেন। কিছুদিন ভালোই চলল, কিন্তু হঠাৎ নানা-ঘটনা-দুর্ঘনায় প্রতিষ্ঠানটির তহবিল বন্ধ হয়ে গেল। আবার অনিশ্চয়তা।
শেষমেশ নাইমুল ইসলাম খানের সহযোগিতায় ‘আমাদের সময়’ দৈনিকে যোগ দিলেন। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের চাপ, ধারদেনার ঝামেলা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দ্রুতই সম্পর্ক ছিন্ন হলো।
এরপর আবার দীর্ঘদিনের বেকারত্ব।
তখনই নতুন করে শুরু হলো ‘আজকের পত্রিকা’। শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যস্থতায় ও অধ্যাপক গোলাম রহমানের সুপারিশে তিনি সম্পাদকীয় বিভাগে চাকরি পেলেন—৫০ হাজার টাকা বেতনে।

এবার যেন আবার প্রাণ ফিরে পেলেন। সকালে রমনা পার্কে হাঁটাহাঁটি, অফিসে সহকর্মীদের আড্ডা, বাসায় নাতি পরমের সঙ্গে খেলা—সব মিলিয়ে তিনি আবার কিছুটা সুখি হয়ে উঠলেন।
এই সময় বিভুদা ফেইসবুকে ভীষণ আসক্ত হয়ে পড়লেন। যা কিছু করতেন, ভাবতেন, যাদের সঙ্গে দেখা হতো—সব ফেইসবুকে লিখে ফেলতেন। আমরা প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও ভেবেছিলাম, এও তো নির্দোষ এক শখ!
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এল ভয়াবহ সুনামি। ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিশোধে মেতে উঠল।
অপমান, বর্জন, কালো তালিকা—সব একসঙ্গে শুরু হলো।
পরিবারের চাপে বিভুদা তার ফেইসবুক ডিঅ্যাক্টিভেট করলেন। আরও নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন।
‘আজকের পত্রিকা’য় তার শেষ দিনগুলো তেমন স্বস্তিকর ছিল না। পদোন্নতি হয়নি, কাঙ্ক্ষিত বেতন পাননি। সহকর্মীদের ভালোবাসা ছিল তার জন্য, কিন্তু ভালোবাসায় তো আর জীবনের বাস্তব চাহিদা মেটানো যায় না।
তবু ওটাই ছিল তার শেষ আশ্রয়স্থল। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। কিন্তু তিনি মুখে কিছু বলতেন না—মুখে হাসি রাখতেন, অন্তরে কান্না চাপা দিতেন। এভাবেই বিভুদার জীবন চলতে থাকে—অভিমান, প্রতারণা, ব্যর্থতা আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুখের টুকরো মিলিয়ে।
গত কয়েক বছরে বিভুদার জীবনে নানা রকম শারীরিক সমস্যা একে একে হাজির হতে থাকে। প্রথমদিকে সেগুলো তেমন ভয়ঙ্কর মনে না হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জটিল আকার ধারণ করে। ভাগ্যক্রমে তার মেয়ে ও মেয়েজামাই দুজনেই ডাক্তার হওয়ায় অনেক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান ঘরে বসেই হয়ে যেত। কিন্তু সব কিছুরই সীমা আছে। শেষ কয়েক বছর ধরে তার নিজের জন্য মাসে অন্তত ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকার ওষুধ লাগত। এই নিরবচ্ছিন্ন খরচই যেন তাকে আর্থিক দিক থেকে চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্নে ফেলে দিয়েছিল।
বিভুদার কর্মজীবন ছিল বিচিত্র। চাকরি আর বেকারত্ব হাত ধরাধরি করে চলেছে। টাকার টানাপোড়েন মেটাতে তিনি এমন কোনো কাজ নেই যা করেননি—শুধু আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায়। অন্যের নামে বই লিখে দিয়েছেন, অসংখ্য বই সম্পাদনা করেছেন, করে দিয়েছেন অন্যদেরও, দিস্তা দিস্তা প্রুফ দেখেছেন। কারও শ্রুতিলিখন করেছেন, কারও জন্য অনুবাদ করেছেন, এমনকি নোট বই লিখে দিয়েছেন ছাত্রদের পড়ার সুবিধার্থে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি মেনিফেস্টোও লিখেছেন তিনি। এসব কাজের বেশিরভাগই হয়েছে নেপথ্যে, ছদ্মনামে। তিনি যে কত জনের নামে, কত নামে লিখেছেন সংখ্যাটা হয়তো নিজেও জানতেন না।
বড় বড় লোকেরা তাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিত—“এই কাজটা তোমার মতো আর কেউ করতে পারবে না”, “তোমার জন্য তো এটা ডাল-ভাত”। বিভুদা এসব শুনে খুশি হতেন, বিশ্বাস করতেন, পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য তিনি পাবেন। কিন্তু বাস্তব ছিল ভিন্ন। মাত্র ২০-২৫ হাজার টাকা দিয়ে কেউ কেউ তার কাছ থেকে একটি বই লিখিয়ে নিয়েছেন। বড় বড় সম্পাদনার কাজ, অনুবাদ বা গবেষণা প্রকল্পের যথাযথ সম্মানি তিনি পাননি। হাজার হাজার টাকার পারিশ্রমিক বাকি রেখেই মানুষ তাকে ঠকিয়েছে। আর আশ্চর্যের বিষয়—প্রতিবারই বিভুদা নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, “হয়তো এবার কিছু পাব”, আরেকবার নতুন আশার খোঁজে কাজ করে গেছেন।
বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন—“আপনি একটি সরকারি প্লটের জন্য আবেদন করেন না কেন? আপনার মতো মানুষ তো রাষ্ট্রের কাছ থেকে এরকম সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।” কেউ কেউ এমনকি আশ্বাসও দিয়েছিলেন—“আপনি শুধু আবেদন করুন, বাকিটা আমি দেখে নেব।” বিভুদা সরল বিশ্বাসে আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম—আবেদন করেই তিনি থেকে থেমে গিয়েছিলেন, কিছুই হাতে আসেনি।
একবার একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা তাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি বই লেখার অনুরোধ করেন। বিভুদা প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু সীমাহীন অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে অবশেষে লিখে ফেললেন বইটি। সেই নেতা তখন তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন—“এই বই লেখার পর আপনার জীবনে আর কোনো দুঃখ থাকবে না।” কিন্তু পরিণতি হয়েছিল ভিন্ন। বইটির জন্য কোনো আর্থিক বা কর্মজীবনের উন্নতি তো আসেনি, উল্টো সেই প্রচ্ছদ ব্যবহার করে অনেকে পরবর্তীকালে (এমনকি মৃত্যুর পরও) তাকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। অথচ বইয়ের ভেতরে কী লেখা আছে, তার সারবস্তু কী—তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
সত্য কথা বলার কারণে তিনি বারবার বিপদে পড়েছেন। একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি টকশোতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। এর পর থেকেই বিটিভির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আমি একবার তাকে বলেছিলাম—“দাদা, বিটিভিতে গিয়ে সরাসরি ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করাটা ভালো হয় না।” উত্তরে বিভুদা দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—“তাই বলে কি আমি সত্য কথা বলব না?” তার এই উত্তর শুনে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।
সত্যিই তাই ছিল তার চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। বিভুদা সব সময় সত্যের দিকেই দাঁড়াতেন। সত্য যদি কারও পক্ষে যায়, যাক; বিপক্ষে যায়, যাক—সে নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আপস ছিল না। কিন্তু দুঃখজনক হলো, কেবলমাত্র তার নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ শব্দটি যুক্ত থাকার কারণেই আমৃত্যু তাকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ট্যাগ বয়ে বেড়াতে হয়েছে। এর বোঝা তিনি কখনো মুছতে পারেননি।
বেঁচে থাকার জন্য, টাকার জন্য, কিংবা ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে বিভুদা সাংবাদিকতার বৃত্তের বাইরেও নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটার পর একটা উদ্যোগ তাকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
প্রথম বড় উদ্যোগ ছিল আমাদের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে, করতোয়া নদীর তীর ঘেঁষে। পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে কিনলেন প্রায় ১১ একর জমি। স্বপ্ন ছিল কৃষি খামার গড়ে তোলার। স্ট্রবেরির চাষ করলেন বিপুল বিনিয়োগ করে। উৎপাদন আশাতীত ভালো হলো। কিন্তু বাজারের অভাবে সেই স্ট্রবেরি বিক্রি হলো না, নষ্ট হয়ে গেল চোখের সামনেই। এরপর বাউকুল, মিষ্টি কুমড়ো, অন্যান্য ফসল চাষের চেষ্টা হলো। কিন্তু নদীর ধারের বালুমাটিতে কিছুই ফলল না। সর্বনাশা সত্য একটাই—সব বিনিয়োগ গেল মাটিতে।
অবশেষে যখন জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলেন, দেখা গেল জমির অর্ধেকই আসলে বনবিভাগের আওতাধীন। জমি কেনা হয়েছিল এক সময়ের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হামিদা বানু শোভার কাছ থেকে। বিভুদা যখন দৌড়ঝাঁপ শুরু করলেন, তখন জানা গেল—বনবিভাগ মালিকানা দাবি করছে, আর হামিদা বানু শোভা ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। আইনি প্রমাণ ছাড়া সেই জমি আর বিক্রি সম্ভব হলো না। পরে স্থানীয় এক চেয়ারম্যান পুরো জমিটাই জবরদখল করে নিলেন।
এরপর শহরমুখী আরেক স্বপ্ন। শান্তিনগরে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল—এরা ইন্টারন্যাশনাল। বিপুল খরচ, প্রচেষ্টা, শ্রম দিয়েও স্কুলটি দাঁড় করানো গেল না। শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থী না পাওয়া, ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে কয়েক বছরেই স্কুল ভেঙে পড়ল। এখান থেকেও ফিরতে হলো শূন্য হাতে।
বিভুদা ছিলেন সহজ-সরল মানুষ, সহজেই প্রভাবিত হতেন। মানুষের কথা সহজে বিশ্বাস করাটা তার একধরনের দুর্বলতা ছিল। কেউ যদি সামান্য লাভের আশাও দেখাতেন, বিভুদা ঝাঁপিয়ে পড়তেন, প্রতারিত হতেন। একবার এক প্রতারক, একজন মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে, তাকে প্রস্তাব দিলেন—জাপানে লোক পাঠানোর জন্য একটি ট্রেনিং সেন্টার গড়ার। বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হলো তার কাছে। বিভুদা জাপানি এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গেও যোগাযোগ করলেন। এরপর শুরু হলো ২০ জনের একটি দলের ট্রেনিং। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তাদের কাছ থেকে নেওয়া হলো পাসপোর্ট, কাগজপত্র, টাকা। কিন্তু দিন গড়াল, সপ্তাহ গড়াল—ভিসা আর এল না। যিনি মধ্যস্থতাকারী ছিলেন, তিনি হাওয়া হয়ে গেলেন। মন্ত্রী ফোন ধরলেন না। জাপানি প্রতিনিধিরাও অদৃশ্য। স্পষ্ট হলো—পুরো ব্যাপারটাই প্রতারণা। অথচ যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল, ফেরত দিতে হলো বিভুদাকেই। আর তা হলো নতুন করে ঋণ করে। সেই বোঝা তার জীবন থেকে আর কখনও নামেনি।
আসলে বিভুদা অর্থকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে যত চেষ্টা করেছেন, প্রতিবারই প্রতারণা বা ব্যর্থতায় তিনি আরও ডুবে গেছেন।
একসময় তিনি ফেইসবুকে স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেছিলেন। অসাধারণ সেই লেখাগুলোতে ফুটে উঠেছিল তার রাজনৈতিক কর্মীজীবনের অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার পথের দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রাম, হাসি-কান্না। কিন্তু হঠাৎই থেমে গেল সেই লেখা। তিনি কবিতা লিখতেন—খুবই সুন্দর, গভীর কবিতা। অনেক সময় ফেইসবুকে নিজের মোবাইলের তোলা ছবি দিতেন। বৌদিকে বলেছিলেন—টেলিভিশনের জন্য ধারাবাহিক নাটক লিখবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয়নি।
যে মানুষ এত স্বপ্ন দেখতেন, এত চেষ্টা করতেন, এত দৌড়ঝাঁপ করতেন—তিনি আসলে কোথাও তার প্রাপ্য সম্মান পাননি। বড় বড় মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। মতিউর রহমানের হাত ধরেই ঢাকায় বিভুদার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পরবর্তীকালে অজ্ঞাত কারণে মতিভাইও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অথচ মতি ভাইকেই বিভুদা মা-বাবার পর সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করতেন। বিভুদার বড় ইচ্ছা ছিল—‘প্রথম আলো’তে তার লেখা ছাপা হোক। একবার বিভুদার একটি কলাম ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে ছাপা হয়েছিল। তারপর আর কখনও লেখা পাঠাননি।
বিভুদা জীবনে অনেক প্রশংসা, খ্যাতি, ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য যে মৌলিক ভিত্তি লাগে—একটা সম্মানজনক চাকরি, নিয়মিত বেতন, স্থায়ী আশ্রয়—সেটা তিনি কোনোদিনই পাননি।

তবু বিভুদার হৃদয় ছিল অন্যদের জন্য। তিনি যে কতজনকে নগদ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন, তার হিসেব কোনোদিন করা যাবে না। নিজের ঘরে অন্ধকার থাকলেও, নিজের চিকিৎসা বা সন্তানের পড়াশোনার খরচের টাকা হাতে না থাকলেও, অন্য কেউ বিপদে পড়লে তিনি পাশে দাঁড়াতেন।
স্ত্রী-সন্তানের জন্য অশ্রুর স্রোত, হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা অন্তহীন বিষাদ—সবই একসঙ্গে আমাদের কপালে দিয়ে বিভুদা শেষ বিদায় নিলেন। জীবনভর যত লড়াই, যত সংগ্রাম, যত দুঃখ-যাতনা তিনি সয়ে গেছেন, তার সবকিছুর অবসান হলো এই বিদায়ে। কিন্তু সেই বিদায় আমাদের জন্য রেখে গেলো অশেষ গ্লানি আর না-পারার ব্যথা।
আমি আজীবন মনে রাখব—মানুষ হওয়ার জন্য, পথচলায় স্থির হওয়ার জন্য বিভুদা আমার পেছনে কত লাখ টাকা ব্যয় করেছেন, কত অদৃশ্য ত্যাগ করে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অথচ শেষ দিনগুলোতে আমি তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমি তার পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। এই অক্ষমতার বোঝা আমৃত্যু বহন করতে হবে আমাকে। বিভুদা আমার জন্য যেমন লড়েছিলেন, আমি তার জন্য তেমন পারিনি—এটা আমার আমৃত্যু গ্লানি হয়ে থাকবে।
তবু ভাবি—হয়তো মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তিনি মুক্তি পেয়েছেন। এখন আর কোনো সম্পাদককে তার লেখা ছাপানো নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হবে না। রাজীব নূর কিংবা শায়েরের মতো মানুষদের আর কখনও কষ্ট নিয়ে বলতে হবে না: “দাদা, আপনার লেখাটা আমরা ছাপতে পারছি না।” কেউ আর বিরক্ত হবেন না, কেউ আর বিব্রত হবেন না। কারণ বিভুদা আর কারও কাছে টাকা চাইবেন না, সাহায্যের হাত পাতবেন না।
আমার শুধু একটাই অনুরোধ—প্লিজ, তাকে নিয়ে আর কোনো কটু কথা লিখবেন না। যে সব ট্যাগ, দোষারোপ, রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ—এসবের বাইরে এখন তিনি। সব লেনদেন, সব সম্পর্কের পাঠ তিনি চুকিয়েই চলে গেছেন। তাই তাকে আর ছোট করবেন না।
আমাদের কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। বরং আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ—কারণ বিভুদা যতদিন বেঁচেছিলেন, আপনারা সবাই মিলে তাকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, সহযোগিতা করেছিলেন, আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই ঋণ আমরা স্বীকার করি।
কিন্তু আজ, এই শেষ মুহূর্তে, শুধু একটি প্রার্থনা করি—এই আপাত ব্যর্থ, চরম অভিমানী, ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া অথচ অপার দানশীল আমার ভাইটিকে অনন্তলোকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন। তিনি তো সব হারিয়েও অন্যের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। নিজের কষ্ট গোপন করে বারবার অন্যকে হাসিয়েছেন, বাঁচিয়েছেন।
আজ তিনি নেই, কিন্তু আমরা যারা তার ছায়ায় মানুষ হয়েছি, তারা জানি—এমন মানুষ আর দ্বিতীয়জন পাওয়া দুষ্কর।
বিভুদার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ব্যথা, সমস্ত অভিমান—সবকিছুর অবসান ঘটুক চিরশান্তির অনন্তলোকে। এটাই আমাদের সবার প্রার্থনা।