Published : 16 Oct 2025, 01:04 AM
বাংলাদেশে টেলিভিশনের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কখনোই স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত ছিল না। বেসরকারি খাতের প্রথম টেলিভিশনের লাইসেন্স নিয়ে যে বিতর্কের শুরু হয়েছিল, তা আজও চলমান। যোগ্যতা ও পেশাদারত্বের প্রমাণ দিয়ে লাইসেন্স পেতে হয়নি। দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং কিছু ক্ষেত্রে হয়তো নগদ নারায়ণই ছিল মুখ্য।
এটি ক্রমাগত বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিসরকে দলবাজ, অযোগ্য, অপেশাদার ও সুযোগসন্ধানীদের কুক্ষিগত করতে সাহায্য করেছে—যারা সর্বদা এক পা খাড়া করে প্রভুদের তুষ্ট করতে উদগ্রীব ছিলেন বা এখনও আছেন। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ২০২৪ সালের জুলাই–অগাস্টের গণআন্দোলনের সময়। ওই উত্তাল দিনগুলোতে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞই দেখতে পেয়েছে এবং বারবার দেখিয়েছে আমাদেরকে। রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্তস্রোতে দাঁড়িয়ে স্থাপনার জন্য কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন তাদের সংবাদকর্মীরা।
গণতন্ত্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। গণমাধ্যমের একটি সহজাত প্রভাবক ক্ষমতা রয়েছে, যা মানুষের মতামত ও মনোভাবকে প্রভাবিত করে, প্রতিক্রিয়া তৈরিতে প্ররোচিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে ওই প্রভাব কিছুটা কমলেও টেলিভিশনের আবেদন ও অবদান যে নিঃশেষ হয়ে গেছে, তা বলা যায় না। যে কারণে ২০২৫ সালে কামাল আহমদের নেতৃত্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর লাইসেন্সের আবেদন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র ও লাইসেন্সধারীদের অঙ্গীকারনামা পর্যালোচনা করে স্পষ্ট হয় যে, এসব লাইসেন্স প্রদানে কোনো উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসৃত হয়নি। প্রধানত রাজনৈতিক বিবেচনা ও কিছুটা ব্যবসায়িক পরিচিতির ভিত্তিতেই এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। (সুপারিশমালা: ২১.৫.১, বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন: ২০২৫, পৃ. ১৪৭)
সংস্কার কমিশনের এই সুপারিশমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের অনুমোদন প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ও মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। গণমাধ্যমের অবাধ বিকাশের স্বার্থেই এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। যে লক্ষ্যে কমিশন সুপারিশ করেছে যে, সম্প্রচার নীতিমালায় সম্প্রচার কমিশন গঠনের কথা বলা আছে এবং সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সুপারিশ করার দায়িত্ব সম্প্রচার কমিশনের এবং যেহেতু গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গণমাধ্যমের সব বিষয় অর্থাৎ সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইনের জন্য বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল ও প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়ে গণমাধ্যম কমিশনের সুপারিশ করা হয়েছে, সেহেতু বেসরকারি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্সসমূহ পর্যালোচনার দায়িত্ব গণমাধ্যম কমিশনই পালন করবে। (সুপারিশমালা: ২১.৫.১, বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন: ২০২৫, পৃ. ১৪৭-১৪৮)
একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে সৃজনশীলতা, গতিময়তা, জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্যে এবং দুটি প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্তশাসন প্রদানের নীতিমালা তৈরিতে ১৯৯৬ সালে সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফ্উদ্দৌলাহ্র নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি কমিশন গঠিত হয়েছিল। যে কমিশনের প্রথম সুপারিশ ছিল দেশের সম্প্রচার মাধ্যমকে যথাযথ ধারায় প্রবাহিত করার জন্য জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠন করা; যার অন্যতম দায়িত্ব হবে বেসরকারি চ্যানেলের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা। খেয়াল করুন, এই সুপারিশ করা হয়েছিল আজ থেকে ২৮ বছর আগে, ১৯৯৭ সালে। যে সুপারিশের দিকগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তীকালে কোনো সরকারই আগ্রহ দেখায়নি।
বর্তমানে ফেরা যাক। রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার অনেক আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনসহ মোট ১১টি কমিশন গঠন করেছিল। ২০২৫ সালের ২২ মার্চ গণমাধ্যম কমিশনের প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর অনেকেই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের। বিশেষ প্রত্যাশা ছিল, গণমাধ্যম পরিসরকে দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতিবাজ ও সুযোগসন্ধানীদের হাত থেকে মুক্ত করে এই সরকার একটি সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক, উন্মুক্ত ও সুষম পরিবেশ তৈরি করবে। কিন্তু ওই আশায় গুঁড়েবালি।
অত্যন্ত বিস্ময় ও হতাশার সঙ্গে আমরা দেখলাম, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়িত করার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নেক্সট টিভি ও লাইভ টিভি নামক দুটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে। আরও পরিতাপের বিষয়, ওই লাইসেন্স দিতে অনুসরণ করা হয়েছে হুবহু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন হওয়া এই সরকারের তরফ থেকে এমন সিদ্ধান্ত কোনো অবস্থাতেই কাম্য ছিল না। পুরোপুরি দলীয় বিবেচনায় দুই আরিফকে দুটি টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের একজন মো. আরিফুর রহমান তুহিন এবং অন্যজন আরিফুর রহমানের পাওয়া এই চ্যানেল দুটি নিয়ে গণমাধ্যম পরিসরেই তৈরি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও তীব্র হতাশা।
নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত নেক্সট টিভি ও লাইভ টিভিসহ বর্তমানে বাংলাদেশে সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ৫৫টি টিভি চ্যানেলকে। যাদের প্রায় শতভাগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায়। বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনাবিষয়ক নীতিমালার ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রথম টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। তখন দায়িত্বে থাকা আওয়ামী সরকার প্রথম দফায় তিনটি চ্যানেলের অনুমোদন দেয়। চ্যানেলগুলো ছিল একুশে টিভি, এটিএন বাংলা ও চ্যানেল আই। আওয়ামী লীগের ওই আমলে শুধু অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়া হয়নি, বরং নানা ধরনের নীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে একুশে টেলিভিশনকে টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের সুবিধা দেওয়া হয়। যা পরে আদালত কর্তৃক বেআইনি ঘোষিত হয়। অভিযোগ আছে, ওই সময়ও আনুগত্য ও অশুভ যোগাযোগের মাধ্যমেই লাইসেন্স পেয়েছিলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। ওই সময় লাইসেন্স দেওয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়ায় দেশের বৃহত্তম একটি করপোরেট কোম্পানি এগিয়ে থাকলেও তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়। লাইসেন্স পান সরকার-অনুগত ও আস্থাভাজন ব্যক্তিরা। এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় সরকারের ২০০১-২০০৬ আমলে অনুমোদন দেওয়া হয় ১০টি টিভি চ্যানেলের। ওই চ্যানেলগুলোও বিতরণ করা হয় দলীয় অনুগত ও কাছের ব্যক্তিদের মধ্যে। যেখানে ছিল না পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে যমুনা টিভিকেও টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের লাইসেন্স দেওয়া হয়, পরে তা বাতিল করা হয়।
পরে ২০০৯ সালে আবারও আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর অনেকটা পাইকারি দরে টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া শুরু করে কর্তৃত্বপরায়ণ শেখ হাসিনার সরকার। প্রায় ১৬ বছরের টানা শাসনামলে শেখ হাসিনার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয় ৪০টি টিভি চ্যানেলের। এটা ছিল অনেকটা মুড়ি-মুড়কি বিলানোর মতো প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের বাজার ছোট ও ক্রমাগত সংকুচিত কাঠামোর হওয়া সত্ত্বেও শুধু দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে এই চ্যানেলগুলো রাজনৈতিক কর্মী, স্বজন ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়। যা বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিসরকে অত্যন্ত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
শেখ হাসিনার শেষ আমলের টিভি চ্যানেলগুলোর আবেদনপত্রগুলো পর্যালোচনা করলে এক ভীতিকর চিত্র পাওয়া যায়। চ্যানেলগুলোর আবেদনপত্রের অঙ্গীকারনামায় পেশাদারত্ব, দায়িত্ববোধ ও উৎকর্ষ বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়ার বিপরীতে আবেদনকারীরা সরকারপ্রধানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়ন, ভিশন-২১ বাস্তবায়ন এমনকি দলীয় প্রধান রাজনৈতিক নেতার স্বপ্নের দেশ গড়তে সহযোগিতার শপথের কথা উল্লেখ করেছেন। এমন দলীয় অনুগত্যের অঙ্গীকার চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে অনুমোদনপ্রাপ্ত চ্যানেলগুলোর আবেদনপত্রেও ছিল। লাইসেন্স পাওয়ার জন্য এই ধরনের নগ্ন প্রতিশ্রুতি নিশ্চিতভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতা এমনকি মুক্তভাবে বিনোদননির্ভর অনুষ্ঠানমালা তৈরিতেও এক বড় বাধা। যে দেওয়ালের ভেতরে আজও বন্দি বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য।
আবারও বর্তমানে ফিরে আসি। অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এক নতুন সংস্কৃতি, নতুন দিন, নতুন বন্দোবস্তের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। গণমাধ্যম পরিসরে টেকসই ও যুগোপযোগী পরিবর্তন আনতে কামাল আহমদের কমিশন বিশেষ কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অচলায়তন ভাঙার সুপারিশে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি না দিয়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট কাঠামোকেও বহাল রাখল অন্তর্বর্তী সরকার। তীব্র সমালোচনার মুখে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা আরও হতাশাজনক। তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মিডিয়া দিয়ে মন্ত্রণালয় চাচ্ছে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে। ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করতে তিনি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর আশ্রয় নিয়েছেন। কী অদ্ভুত অজুহাত! যেখানে বৈষম্যবিরোধী চেতনা, নতুন বন্দোবস্ত ও ইনসাফের কোনো স্থান নেই। খুব সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে এই চ্যানেলগুলোর আবেদনপত্র দেখার সুযোগ হলে আগের ধারাবাহিকতায় আবিষ্কৃত হবে সেই দলীয় আনুগত্য, দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।
২০২৫ সালের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের মতো প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় নতুন টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়াকে যেভাবে হালাল করতে চাওয়া হোক না কেন, তা মনে হয় ধোপে টিকবে না। কারণ এই অন্তর্বর্তী সরকারকে মানুষ দায়িত্ব দিয়েছিল আগের সরকারের ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোকে ধ্বংস করে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থে শেখ হাসিনা সরকারের ওই কাঠামোকে অবলম্বন করে প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় টিভি চ্যানেলের অনুমোদন কোনো অবস্থাতেই সমাজে ভালো বার্তা দেয়নি। এছাড়া এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যথাযথ নীতি ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়নি।
অন্তবর্তী সরকারের জন্য নিশ্চিতভাবেই এই টিভি চ্যানেল দুটির অনুমোদন একটি কালো দাগ হিসেবে বিবেচিত হবে। যে ধারাবাহিকতা ১৯৯৭ সাল থেকেই চলে আসছে।