Published : 27 Sep 2025, 03:21 PM
শরতের নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। ভোরের শিশিরভেজা মাটি আর দুর্বাঘাস থেকে, সকালের ঝরা ফুলের শিউলিতলা থেকে, ভরদুপুরের দিগন্তজোড়া পাকা ধানের ক্ষেত থেকে, বাহারি বিকেলের বাতাসে ঢেউ খেলানো কাশবন থেকে, সন্ধ্যায় মাটি ছুঁয়ে ভেসে চলা হালকা কুয়াশা থেকে এই গন্ধেরা মিলেমিশে এক অনাবিল আনন্দের অনুভব দেয় মনে। এই গন্ধটা নাকে আসলেই জানতাম পূজা আসছে। স্কুলের বন্ধুরা চোখ বুঁজে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলতাম–দেখ, বাতাসে পূজার গন্ধ! এরই মধ্যে চলে আসতো মহালয়া। সূর্যোদয়ের আগে রেডিওতে বেজে উঠতো বীরেন্দ্র কিশোর ভদ্রের মন্দ্রকণ্ঠে চণ্ডীপাঠ–দেবী দুর্গার বোধন।
অনেকদিন হয়ে গেলো শরতের এই গন্ধটা আর পাই না। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কিংবা নাকের বয়স হয়ে যাওয়া–যে দোষেই হোক না কেন, এই গন্ধটা হারিয়ে ফেলা একটা শূন্যতার বিহ্বলতা সৃষ্টি করে মনে। যেন এই গন্ধের সঙ্গে আমার শৈশব-কৈশোরও চিরতরে হারিয়ে গেছে। একইসঙ্গে হারিয়ে গেছে প্রকৃতি থেকে পাওয়া পূজার আগমনী বার্তাও।
তবে প্রকৃতি যেহেতু শূন্যস্থান পছন্দ করে না, তাই ঘ্রাণের মাধ্যমে পূজার আগমনী বার্তা পাওয়ার ঘাটতি সে পূরণ করেছে শব্দ দিয়ে–মূর্তি ভাঙ্গার শব্দ। নাগরিক মানুষেরা দিন-পঞ্জিকার সঙ্গে তাল রেখে পূজার হিসাব করতে না পারলেও ভাঙচুরের আওয়াজ আর সংবাদ মারফত ঠিকই জেনে যায়–পূজা আসছে। মহালয়ার বোধনের মতো এই প্রতিমা ভাঙচুরও যেন এখন দুর্গাপূজার অবিচ্ছেদ্য কৃত্য বা রিচ্যুয়াল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে বাংলাদেশে।
প্রতিমা গড়ার সময় থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর বিসর্জন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত পুরো সময়টার প্রতিটা মূহূর্তই দুর্গা প্রতিমা ও পূজামণ্ডপ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এসব হামলা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় চোরাগোপ্তা, লোকচক্ষুর অন্তরালে। আবার কখনও সরবে, সদর্পে, সদলে। হামলাকারীরা কখনও অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারী, কখনও মানসিক ভারসাম্যহীন, কখনও রহস্যময় বাতাস পরিচয়ের আড়ালে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অজুহাত তুলে এলাকার পরিচিত মুখগুলোই–কোনও প্রবীণ শিক্ষকের ছাত্র, এলাকার মসজিদের মুয়াজ্জিন, সিগারেট ভাগ করে খাওয়া কলেজের বন্ধু, দল নির্বিশেষে রাজনৈতিক কর্মী, বাজারের তোলা আদায় করা মাস্তান, গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটে, রিকশা-ভ্যান চালানো শ্রমজীবী প্রমুখ–বিক্ষুব্ধ তৌহিদী জনতার বেশে এসে হামলা করে গেলে বিচার চাওয়ার পরিবর্তে আক্রান্তকেই তখন অজামিনযোগ্য মামলায় জেলে যেতে হয়। ফি বছর নিয়ম করে এই প্রতিমা ভাঙ্গা এবং হামলাকারীদের সব সময়ই বিচারের উর্ধ্বে থেকে যাওয়া এক ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
এই হামলার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে হামলাকারী এবং আক্রান্তদের সম্পর্কের বিন্যাস স্পষ্ট করে। হামলায় অংশ নেওয়াদের বেশিরভাগই সাধারণ সময়ে রাষ্ট্রের সুবিধাবঞ্চিত এবং প্রান্তিক নাগরিক হলেও হামলাকালে তাদের সে অবস্থান ও মর্যাদার আমূল পরিবর্তন ঘটে। সেই মূহুর্তে তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবল একাত্মতা অনুভব করে এবং আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে এই শিক্ষা দিতে চায় যে এই রাষ্ট্রে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত, তাদের ধর্মীয় আচার ও সংস্কৃতি ঘৃণিত এবং আক্রমণকারীদের তুলনায় তারা অবস্থান ও মর্যাদায় হীন। বলাবাহুল্য একমাত্র সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সময়ই কেবল সংখ্যাগুরুর এই সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক অংশ আক্রান্তদের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে পারে এবং রাষ্ট্রের ওপর মালিকানা উপভোগ করে। নিজেদের প্রান্তিকতা অতিক্রম করে এই যে সাময়িক মালিকানা ও শ্রেষ্ঠত্বের বোধ–এটা তাদের সুখস্মৃতি হিসেবে বিরাজ করে এবং পরবর্তী হামলার সুযোগের জন্য উন্মুখ রাখে।
বিপরীত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি হয় আক্রান্ত শিবিরে। নিজেদের আবেগ, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীকের অমর্যাদা প্রতিরোধ করতে না পেরে তাদের মনে স্থায়ী ও গভীর হতাশা, অক্ষমতা ও অমর্যাদার বোধ তৈরি হয়। ভেঙ্গে দেওয়া বিগ্রহের পাশে বসে ভোলার লালমোহনের এক নারীকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুনেছিলাম, আমরা দুর্বল, আমাগো ভগবানও দুর্বল। তারা তাদের ভগবানকে রক্ষা করতে পারে না, তাদের ভগবানও তাদের রক্ষা করতে পারে না। এই তুমুল অসহায়ত্বের বোধ নিয়েই পরাক্রান্ত সংখ্যাগুরুর সঙ্গে তাদের সমাজ-সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়, ধর্ষিতার অনুভূতি নিয়ে হামলাকারীদের শ্লেষমেশানো হাসি থেকে চোখ ফেরাতে হয়। হামলাকারীরা সবসময় পার পেয়ে যাওয়ায় হামলার পেছনে তারা রাষ্ট্রের অনুমোদন, প্রশ্রয়, কিংবা নির্বিকারত্ব দেখতে পায়। হামলা থেকে সুরক্ষা কিংবা আইনি প্রতিকার না পাওয়ায় এই হামলাকারীদের মধ্যেই তারা রাষ্ট্রকে উপস্থিত দেখে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবল বিযুক্তি অনুভব করে। তারা মানসিকভাবে উন্মূল হয়, তাদের দেশ হারিয়ে যায় এবং বৈমাত্র্যেয় রাষ্ট্রের অধীনস্ত হিসেবে নিজেদের আবিষ্কার করে।
পূজা উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় নিমন্ত্রণে বঙ্গভবনে নিয়ে গিয়ে শুভেচ্ছা বাণী হিসেবে ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’ শুনিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ, সম্প্রীতি রক্ষার নামে মন্দিরের গায়ে নামাজের সময়সূচি টানিয়ে দেওয়া কিংবা নিরাপত্তা দেওয়ার নামে টুপি-পাঞ্জাবি পরে দল বেঁধে মন্দিরের সামনে অবস্থান নেওয়া–এ সবই প্রত্যক্ষ সহিংসতার মতোই সমান কার্যকর বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধস্তনতা ও নাজুকতা এবং তাদের ওপর সংখ্যাগুরুর সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রদর্শন ও প্রতিষ্ঠায়। কেন তা করতেই হয়, প্রতিবার? সত্যিই কি ‘অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই’?
সংখ্যালঘু এবং তাদের চিহ্ন ও প্রতীকের ওপর হামলা–এগুলো প্রত্যক্ষ সহিংসতা। সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালটাংয়ের মতে প্রত্যক্ষ সহিংসতা হচ্ছে সহিংসতার দৃশ্যমান দশা–যা হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এর অন্তরালে থাকে কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সহিংসতা–যা অদৃশ্য, কিন্তু স্থায়ী এবং তা প্রত্যক্ষ সহিংসতাকে উস্কে দেয়, সমর্থন করে, বৈধতা দেয়।
সমাজের কাঠামো, প্রতিষ্ঠান বা নীতির মাধ্যমে যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত, অবদমিত বা অরক্ষিত রাখা হয়, তখন সেটি কাঠামোগত সহিংসতা। এটি প্রত্যক্ষ সহিংসতা নয়, বরং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইনি, শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে প্রচ্ছন্নে থাকা অবিচার। যেমন, অর্পিত সম্পত্তি আইন–যার ফলে অনেক হিন্দু পরিবারের জমি-সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ন্যায়বিচারের অভাব–মন্দির বা প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় প্রায়ই পুলিশ রিপোর্ট নেয় না বা মামলা প্রমাণিত হয় না। রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধতা–সংখ্যালঘুরা অনেক সময় নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় পান বা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত থাকে।
সাংস্কৃতিক সহিংসতা হচ্ছে সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রথা, ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য বা গণমাধ্যমের ভেতরে থাকা বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি, যা কাঠামোগত ও প্রত্যক্ষ সহিংসতাকে বৈধতা দেয় বা স্বাভাবিক করে তোলে। যেমন, ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে বৈষম্য–‘সংখ্যালঘু মানেই দুর্বল’ বা ‘তাদের দেশ ভারত’–এমন বয়ানের প্রচার যা হামলা বা বৈষম্যকে ন্যায্য বলে মনে করায়। পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসে অনুপস্থিতি–সংখ্যালঘুদের অবদানকে ছোট করে দেখানো বা উপেক্ষা করা। সম্প্রতি হিন্দু লেখকদের লেখা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জনপ্রিয় হয় এবং সরকারও তার অনুকূলে সাড়া দেয়। গুজব ছড়ানো–সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ ও আদিবাসীদের ওপর আক্রমণ বৈধ করার চেষ্টা।
কাঠামোগত সহিংসতা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পদ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে, আর সাংস্কৃতিক সহিংসতা সমাজে এমন মানসিকতা গড়ে তোলে, যা এই বঞ্চনাকে স্বাভাবিক ও বৈধ মনে করায়। এগুলো এতটাই স্বাভাবিক ও মজ্জাগত হয়ে থাকে যে এসবের উল্লেখও এর সুবিধাভোগী সংখ্যাগুরুদের ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হয়। সংবিধান কাটাছেঁড়া করে সংখ্যাগুরুর আধিপত্য নিশ্চিত করা রাজনৈতিক এলিট থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে ভিন্নধর্মের প্রতি বিষিয়ে তোলা বক্তা, বড় হামলার আয়োজন করা রাজনৈতিক ষণ্ডা, কিংবা রাতের আঁধারে মন্দিরে ঢিল ছোঁড়া একলা একা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তি–আপাত যোগাযোগহীন এসব ব্যক্তি ও কর্ম সব একই সূত্রে গাঁথা। তারা সকলে মিলে প্রত্যক্ষ, কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার ত্রিভূজ রচনা করে চলেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছরে অনেক সরকার বদলেছে। কিন্তু সরকার নির্বিশেষে যে বিষয়টা ধ্রুব থেকে গেছে তা হচ্ছে বার্ষিক কৃত্য পালনের মতো করে দুর্গা প্রতিমা ভাঙচুর এবং বছরজুড়ে ইতঃস্তত, কখনও পরিকল্পিতভাবে মন্দির ভাঙচুর এবং হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। কিন্তু রাষ্ট্র না চাইলে কি এই সব হামলা ও নিপীড়ন অব্যাহত থাকতে পারত? একটা কথা হাল-আমলে জনপ্রিয় হয়েছে, রাষ্ট্র না চাইলে দাঙ্গা হয় না। তাহলে সরকার নির্বিশেষে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেন চাইছে না, এই জুলুম বন্ধ হোক।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইলান এইচ মেয়ার ও তার সহযোগীরা তাদের ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস থিওরি’র মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর নিয়মিত, অব্যাহত ও ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার রাষ্ট্রীয় কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন। এই ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস থিওরি’র মাধ্যমে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থাও বিশ্লেষণ করা যায়। বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুরা এই ধারাবাহিক ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস’–এর শিকার হয় ধর্মীয় সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় অবহেলা এবং সামাজিক বৈষম্যের মাধ্যমে। এর ফলে তারা বাস্তব ও অনুমিত ভীতি, আত্মপরিচয় নিয়ে উদ্বিগ্নতা এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়–যা তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হওয়াকে বাধাগ্রস্থ করে।
এই মাইনোরিটি স্ট্রেস থিওরি অনুযায়ী বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত কতগুলো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। তার প্রথমটি হচ্ছে এক্সটার্নাল স্ট্রেসরস বা বহিঃস্থ চাপ–প্রতিমা, মন্দির, মাজার ভাঙচুর, শারীরিক লাঞ্ছনা ও হামলা এবং এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের নির্বিকারত্ব এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। দ্বিতীয়ত, এন্টিসিপেটরি স্ট্রেসরস বা অনুমিত চাপ–প্রতিবছর পূজার আগে মন্দিরে, ওরশের সময় মাজারে হামলার আশঙ্কা করে সংখ্যালঘুরা ও ভিন্নমতাবলম্বীরা এবং মেনেও নেয় যে এমনটা ঘটবেই, কিছুই করার নেই। তৃতীয়ত, কনসিলমেন্ট বা আত্মগোপন করা–সংখ্যালঘুরা জনসমাগমস্থলে আত্মপরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়া নিয়ে ভীতি ও অস্বস্তিতে ভোগে। পোশাক, আচরণে বা ভাষায় তার সংখ্যালঘু পরিচয় যেন প্রকাশ না পায় তা নিয়ে সচেষ্ট থাকে। চতুর্থত, ইন্টারনালাইজড স্টিগমা বা স্ব-আরোপিত আত্ম-অমর্যাদা–নিজেকে ‘আদার’ করে নেওয়া, অধিকারহীনতা মেনে নেওয়া, সংখ্যাগুরুর চোখেই নিজেকে দেখা–যেমন নিজেকেই ‘বিধর্মী’ হিসেবে ভাবা এবং পরিচয় দেওয়া। পঞ্চমত, ক্রনিক স্ট্রেস অ্যান্ড হেলথ বা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ–এই চাপ ও ট্রমা সম্প্রদায়জুড়ে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয় এবং বিষণ্নতা, উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতার বোধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনুপস্থিতি, শিক্ষা ও আর্থিক ক্ষেত্রে অসফলতা–ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
এই প্রক্রিয়া যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে তার ফলে একটি জনগোষ্ঠী তার প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়-অবিচার ও অধিকারহীনতা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হতে পারে না, বরং নিশ্চুপ হয়ে যায়। সে হিসেবে রাষ্ট্র শাসনের এক কার্যকর হাতিয়ারও এটা। এই ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস থিওরি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, কেন হিন্দু জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য হলেও তাদের ওপর চলমান নিপীড়ন নিয়ে কখনও প্রতিবাদী হয় না।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেহেতু তার নাগরিকদের সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু পরিচয়ের নিরিখে বিবেচনা করার আগ্রহ অব্যাহত রেখেছে, অতএব ধরে নেওয়া যায়, দুর্গাপূজায় মূর্তিভাঙ্গা প্রকল্পের সহসাই অবসান হচ্ছে না। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোজন সক্ষমতার ওপর ভরসা করে একটা প্রস্তাব করা যায়–তা হলো মূর্তি ভাঙ্গাকে দুর্গাপূজারই রিচ্যুয়াল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। দেবী আসছেন অসুর দমনে, আর অসুর কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? তাকে তো আঘাত করতেই হবে। এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে একটা উপকার হতে পারে। মূর্তি ভাঙ্গাও পূজারই অংশ এই বিষয়টা প্রচার পেলে ধর্মনাশের ভয়ে মূর্তি ভাঙচুরকারীদের উৎসাহে ভাটাও পড়তে পারে।