Published : 20 Jul 2026, 07:52 PM
দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের সঙ্গে নিজের সংস্থার তুলনা না করার আহ্বান আবারও জানিয়েছেন বিমসটেক মহাসচিব ইন্দ্র মনি পান্ডে।
সোমবার ঢাকায় এক আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি বলেছেন, “আমার নিজের মতামত হচ্ছে, বিমসটেক এবং সার্কের মধ্যে তুলনা করাটা বিভ্রান্তিকর ও ভুল। এই তুলনা বিমসটেকের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমরা দুটি ভিন্ন সংস্থা, দুটি ভিন্ন সনদ এবং কাজের ধরণও দুই রকম। বিমসটেক ও সার্ককে তুলনাটা অন্যায্য।
“সে কারণে আপনাদের সবার প্রতি আমার আবেদন, বিমসটেক যে একটি স্বাধীন স্বত্বা, এটা সার্কের প্রেক্ষাপট থেকে দেখবেন না। বরং আমাদের অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এটার প্রয়োজনীয়তা এবং এটি কী ভূমিকা ইতোমধ্যে রেখেছে এবং ভবিষ্যতে রাখবে, সেই প্রেক্ষাপট থেকে দেখুন।”
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় সার্ক। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ২০০৭ সালে যোগ দেয় আফগানিস্তান।
সার্কের জোরালো কার্যক্রম চলার মধ্যে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (বিস্ট-টেক) যাত্রা শুরু করে।
ওই বছরই মিয়ানমার এই জোটে যুক্ত হওয়ার পর নাম হয় ‘বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’ (বিমসটেক)।
২০০৪ সালে নেপালও সদস্যপদ পায় বিমসটেকের। এরপর দেশের নামের আদ্যক্ষরে পরিবর্তে সংস্থার নামকরণ করা হয় ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন বা বিমসটেক’।
বর্তমানে সাত দেশের জোট বিমসটেকে সার্কের আট সদস্য দেশের মধ্যে পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান নেই।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততার মধ্যে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে অকার্যকর রয়েছে সার্ক। ২০১৪ সালের পর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের একমঞ্চে আনতে পারেনি এই আঞ্চলিক সংস্থা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকে সার্ককে পুনর্জ্জীবিত করার কথা বলছে বিএনপি সরকার। এই সরকারের আগে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সার্ক পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল।
এ বিষয়ে ওই সরকারের আহ্বানের জবাবে ভারতের তরফে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসে এবং এর ঝিমিয়ে পড়ার পেছনে পাকিস্তানের কার্যক্রমকে দায়ী করা হয়।
পাকিস্তান প্রশ্নে অনমনীয় অবস্থানে থাকার বার্তা দিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছিলেন, বাংলাদেশ যেন ‘সন্ত্রাসবাদকে হালকা করে’ দেখানোর অবস্থানে না যায়।
সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএস) ‘বিমসটেক-এর তিন দশক: যৌথ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন বিমসটেক মহাসচিব তিনি।
আসিয়ান, আইওআরএ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত থাকার কথাও বলেন বিমসটেক মহাসচিব।
সংস্থার কাজে সব সদস্য দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়ার কথা তুলে ধরে ইন্দ্র মনি পান্ডে বলেন, “আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিমসটেক সব সদস্য দেশের রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে আসছে। সংস্থাটি রাজনৈতিক বিষয়াদি থেকে দূরে থেকেছে এবং বাস্তবিক সহযোগিতার বিষয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার উপর জোর দিয়েছে।”
ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয়ের অবস্থান এবং বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকার কথা তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, “আমি বলতে চাই, বিমসটেকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং বিমসটেককে শক্তিশালী করতে তার জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন।
“আমি বিশ্বাস করি, এটা এখানে সবগুলো রাজনৈতিকদলের সমর্থন পায়। বাংলাদেশের এখনকার বিমসটেক সভাপতিত্ব আঞ্চলিক সহযোগিতাকে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।”
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের উপর চাপ দিতে বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা দরকার। বিমসটেকের সমন্বিত উদ্যোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এন এম মুনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রাশেদুজ্জামান এবং সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি’র পরিচালক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।