Published : 14 Jul 2026, 09:41 PM
বাংলাদেশে প্রতি ১৩ নারীর একজন অকালে মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার শিকার হচ্ছেন; যা তাদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
এক গবেষণার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআর,বি মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য দিয়েছে।
গবেষণাটির তথ্য সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর ওপর প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল বিএমজি গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেনোপজ একজন নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হওয়ার এই প্রক্রিয়া সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে। কোনো নারীর ৪৫ বছর বয়সের আগে মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তাকে আর্লি মেনোপজ এবং ৪০ বছর বয়সের আগে বন্ধ হলে তাকে প্রিম্যাচিউর মেনোপজ বলা হয়।
“যখন সময়ের আগে মেনোপজ ঘটে, তখন একজন নারী প্রত্যাশার অনেক আগেই ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে নারীদের হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস (হাড় ক্ষয়জনিত রোগ), স্মৃতিভ্রংশ, বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটি তাদের জীবনমানকেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।’’
আইসিডিডিআর,বি বলছে, এই গবেষণার ফলাফল তৈরি করতে ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (ডিএইচএস)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপে নারীদের মাসিক ও প্রজনন ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। যাদের কমপক্ষে ছয় মাস ধরে মাসিক হয়নি, অথবা যারা মেনোপজ বা জরায়ু অপসারণের কথা বলেছেন, তাদের মেনোপজ হয়েছে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এরপর ৪৫ বছর বয়সের আগেই যেসব নারীর মেনোপজ হয়েছে তাদের শনাক্ত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেনোপজের ১২ মাসের সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুনরায় বিশ্লেষণ করার পরও গবেষণার ফলাফল একই রকম ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অকালে মেনোপজ হওয়ার হার ৭.৫ শতাংশ, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সামগ্রিক গড় ৭.১ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার নেপালে ৭.৯ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৫.৯ শতাংশ। এসব ফলাফল ইঙ্গিত করে, সময়ের আগে মেনোপজ শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
গবেষণায় নারীদের মধ্যে সময়ের আগে মেনোপজের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্য দেখা গেছে বলেও তথ্য দেয় আইসিডিডিআর,বি।
সংস্থাটি বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামের নারীদের ৪৫ বছর বয়সের আগেই মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা বেশি ছিল। শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, কর্মসংস্থান ও প্রজনন সংক্রান্ত ইতিহাসের মত বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও গ্রামের নারীদের মধ্যে প্রিম্যাচিউর বা আর্লি মেনোপজের আশঙ্কা ১৭ শতাংশ বেশি দেখা যায়। এই ফলাফল স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যকে সামনে নিয়ে আসে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষা সময়ের আগে মেনোপজের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে উঠে এসেছে। যেসব নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, তাদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ঝুঁকি ছিল ১১ শতাংশ কম। মাধ্যমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ২৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ কম ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা কম। অন্যদিকে ১৮ বছরের আগে বিবাহিত ও প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীদের আশঙ্কা বেশি।
গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বির গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম বলেন, “আমাদের গবেষণা বলছে অকাল মেনোপজ কেবল জৈবিক কারণেই ঘটে না। ৪৪টি দেশে দেখা গেছে, কম শিক্ষিত, গ্রামীণ সমাজে বসবাসকারী নারীরা এবং যারা অল্প বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্মদান করেছেন, তারা ধারাবাহিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মেয়েদের শিক্ষার উন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনতে পারে।”
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. আনিসুর রহমান বলেন, “অকাল মেনোপজকে শুধু প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একজন নারীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অকাল মেনোপজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
“তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে নারীর মেনোপজের বয়স সম্পর্কে তথ্য নেওয়া প্রয়োজন। যেসব নারীর অকাল মেনোপজ হয়, তাদের হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস, বিষন্নতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বেশি থাকে।”
তিনি বলেন, “আমি চিকিৎসকদের অনুরোধ করব, তারা যেন নিয়মিতভাবে নারীদের মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে চান। এই সহজ তথ্যই ঝুঁকিতে থাকা নারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে, সময়মত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখতে পারে।”