Published : 19 May 2026, 05:57 PM
বাজার করার দায়িত্ব নিয়ে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়া অনেকের জন্যই নতুন কিছু নয়। অনেক নারীর অভিযোগ থাকে, বাজারের তালিকা হাতে দিয়েও প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে বাড়ি ফেরেন তাদের সঙ্গী।
কখনও দামি কিন্তু অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হয়, আবার কখনও মূল উপকরণই বাদ পড়ে যায়।
তবে বিষয়টির পেছনে থাকতে পারে বড় সামাজিক বাস্তবতাও।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাজার করার ক্ষেত্রে পুরুষদের কিছু সীমাবদ্ধতা সত্যিই দেখা যায়, আর এর কারণ শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়; বরং পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষাও।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রকাশ করে।
যেখানে দেখা যায়, অনলাইনে কেনাকাটা ও সপ্তাহের মাঝের দিনগুলোতে বাজার করার প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে পুরুষদের বাজার করার অংশগ্রহণও বেড়েছে।
তবে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল খরচের পার্থক্য। দেখা গেছে, যেসব পরিবারে পুরুষ সদস্য বাজার করার দায়িত্ব বেশি নিয়েছেন, সেখানে খাদ্য কেনার খরচ তুলনামূলক বেশি বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে তারা বাজারে কম সময় কাটিয়েছেন, তবে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, পুরুষ সদস্য যখন বাসা থেকে কাজ শুরু করে বাজার করার দায়িত্ব বেশি নিচ্ছেন, তখন খাদ্য কেনার খরচ বৃদ্ধির হার আরও বেশি দেখা যাচ্ছে।
শুধু বাজার নয়, এর পেছনে আছে সামাজিক শিক্ষা
‘ইকুয়াল পার্টনারস: ইমপ্রুভিং জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যাট হোম’ বইয়ের মার্কিন লেখক কেট ম্যানগিনো রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “সমাজে এখনও ছেলেদের গৃহস্থালির দায়িত্ব পালনের শিক্ষা মেয়েদের মতো করে দেওয়া হয় না। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় ঘর গোছানো, রান্না বা পরিবারের প্রয়োজন বোঝার বিষয়গুলো। অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় উপার্জনের ধারণাকে।”
ফলে বড় হওয়ার পর অনেক পুরুষ বাজার করার শারীরিক কাজটি করতে পারলেও পরিকল্পনা, পরিবারের প্রয়োজন বোঝা বা সবার পছন্দ মাথায় রাখার মানসিক প্রস্তুতিতে পিছিয়ে থাকেন।
বাজার শুধু জিনিস কেনা নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার করা মানে শুধু দোকানে গিয়ে পণ্য কিনে আনা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে পরিকল্পনা, হিসাব ও পরিবারের চাহিদা বোঝার মতো মানসিক কাজও।
কেট ম্যানগিনো বলেন, “রান্না করা একটি আলাদা কাজ, আবার পুরো সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করা আরেকটি কাজ। এর সঙ্গে আবার পরিবারের কে কী খেতে পছন্দ করে, কার কোন খাবারে সমস্যা আছে— এসব মনে রাখাও এক ধরনের মানসিক শ্রম।”
তার মতে, বর্তমানে অনেক পুরুষ আগের তুলনায় গৃহস্থালির শারীরিক কাজে বেশি অংশ নিচ্ছেন ঠিকই, তবে মানসিক ও আবেগগত দায়িত্বের বড় অংশ এখনও নারীদের ওপরেই থেকে যায়।
কেন ভুল জিনিস কেনা হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পুরুষ বাজারকে একটি দ্রুত শেষ করার কাজ হিসেবে দেখেন। ফলে প্রয়োজনীয় পণ্য বাছাইয়ে সময় কম দেওয়া হয়।
কেউ হয়তো দামের তুলনা না করে সরাসরি দামি পণ্য কিনে ফেলেন। আবার কেউ তালিকার বাইরের জিনিস কিনলেও মূল প্রয়োজনীয় জিনিস ভুলে যান। কারণ তাদের কাছে কাজটি দ্রুত শেষ করাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে যিনি নিয়মিত রান্না করেন বা পরিবারের খাবারের পরিকল্পনা করেন, তার কাছে প্রতিটি উপকরণের গুরুত্ব আলাদা। ফলে সামান্য ভুলও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
সমাধান যা হতে পারে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার সমাধান শুরু হতে পারে পারস্পরিক বোঝাপড়া থেকে।
কেট ম্যানগিনোর মতে, “প্রত্যেক মানুষ ভিন্নভাবে উৎসাহিত হন। কেউ আবেগ দিয়ে অনুপ্রাণিত হন, কেউ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে।”
যদি কেউ খরচ কমাতে আগ্রহী হন, তাহলে বাজারের বাজেট নিয়েই তাকে সচেতন করা যেতে পারে। যেমন- কম খরচে ভালো বাজার করতে পারলে সেই সঞ্চিত অর্থ অন্য কোনো আনন্দের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এতে বাজার করাকে দায়িত্বের বদলে যৌথ লক্ষ্য হিসেবেও দেখা সম্ভব হয়।
সব দায়িত্ব নিজে নিয়ে নিলে সমস্যা বাড়ে
অনেক নারী অভিযোগ করেন, আর শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সব দায়িত্ব নিয়ে নেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হয় না।
কেট ম্যানগিনো মনে করেন, “একজন সঙ্গী যদি ভুল করেন, তাহলে তাকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ভুলে যাওয়া জিনিস আনতে আবার দোকানে যেতে হতে পারে। অথবা ভুল উপকরণ দিয়ে কীভাবে রান্না করা যায়, সেটিও ভাবতে হতে পারে।”
এতে ধীরে ধীরে দায়িত্ববোধ ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য চাপ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গৃহস্থালির কাজ নিয়ে অনেক চাপই অদৃশ্যভাবে কাজ করে। সমাজে এখনও ধারণা রয়েছে, ঘর অগোছালো থাকলে বা পরিবারের প্রয়োজন ঠিকভাবে পূরণ না হলে তার দায় নারীর ওপরই বেশি পড়ে।
কেট ম্যানগিনো বলেন, “পরিবারের জন্য সঠিক খাবার রাখা, সবার পছন্দ মাথায় রাখা এবং নিয়মিত রান্না করা—এসব দায়িত্বকে এখনো নারীর কাজ হিসেবেই দেখা হয়।”
এই চাপ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পুরুষও আবার পরিবার চালানো বা উপার্জনের বিষয়ে আলাদা সামাজিক চাপ অনুভব করেন। দুপক্ষ নিজেদের অনুভূতি নিয়ে কথা বললে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়তে পারে।
কখনও কখনও ছাড়ও দিতে হয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবকিছু নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি ভুলটি খুব বড় না হয় বা পরিবারের ক্ষতির কারণ না হয়, তাহলে কিছু বিষয় সহজভাবে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
হয়ত ভুল ধরনের নুডুলস এসেছে, বা প্রয়োজনের তুলনায় একটু দামি কফি কেনা হয়েছে। তবে যদি এতে দায়িত্ব ভাগাভাগি হয় এবং একজন মানুষের ওপর সব চাপ না পড়ে, তাহলে সেটিও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
আরও পড়ুন
সাপ্তাহিক বাজারে খরচ কমানোর উপায়