২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

হৃদ্-যন্ত্র সুস্থ রাখতে খাবারের ভুমিকা

যদি পাতে থাকে শাক-সবজি বেশি, তবে হৃৎপিণ্ড থাকবে সবসময় মহা খুশি।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 02:00 PM

Updated : 29 Sep 2026, 01:15 PM

নিজের অজান্তে এমন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা হয়, যা হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি করে। নিয়মিত ফাস্টফুড, অতিরিক্ত তেল বা ভাজাপোড়া খাবার— এসবই হৃদ্-রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

অথচ সঠিক খাবার বেছে নিলেই হৃদ্-যন্ত্র দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা যায়।

হৃদ্-যন্ত্রের সুস্থতার জন্য যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস ভালো

বর্তমানে স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘মেডিটারেনিয়ান ডায়েট’। এতে পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, সালাদ, ফলমূল, বাদাম, ডাল, মটরশুঁটি, টকদই, সামুদ্রিক মাছ, চর্বিহীন মাংস, দুধ, অলিভ অয়েল এবং পর্যাপ্ত পানি থাকে।

এই খাদ্যাভ্যাস হৃদ্-রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও টাইপ–টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে— রসুন, কালোজিরা, গ্রিন টি, মাশরুম, ডার্ক চকলেট, স্পিরুলিনা ইত্যাদিও হৃদ্-যন্ত্রের জন্য উপকারী।

খাদ্যাভ্যাস হৃদ্-রোগের ঝুঁকি কতটা কমাতে পারে?

গবেষণা বলছে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে হৃদ্-রোগের ঝুঁকি ১৪ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমে। এমনকি উদ্ভিদভিত্তিক খাবার, মাছ, গোটা শস্য ও জলপাই তেল খেলে ‘করোনারি’ বা ধমনীর হৃদ্-রোগের ঝুঁকি ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কমে।

স্যাচুরেইটেড ফ্যাটের পরিবর্তে পলিআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট খেলে ঝুঁকি ২৫ শতাংশ কমে, আর মনো-আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটে কমে ১৫ শতাংশ।

প্রতিদিন এক মুঠ বাদাম (২৮ গ্রাম) খেলে এলডিএল বা বাজে কোলেস্টেরল কমে ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ২১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়।

তাই প্রতিদিন পাঁচ পরিবেশন সবজি ও দুই পরিবেশন ফল খাওয়া হৃদ্-যন্ত্রের জন্য উপকারী।

প্রতিদিনের হৃদ্-যন্ত্র-বান্ধব খাবার যেমন হওয়া উচিত

একটি সুষম খাবারে উদাহরণ হতে পারে, থালার অর্ধেক জায়গা থাকবে শাকসবজি ও সালাদের, এক-চতুর্থাংশ বা হাতের তালুর সমান থাকবে প্রোটিন, আর এক-চতুর্থাংশ জটিল কার্বোহাইড্রেইটস। সঙ্গে সামান্য পরিমাণে স্বাস্থ্যকর তেল বা চর্বি যোগ হতে পারে।

হৃদ্-যন্ত্রের জন্য উপকারী ফল

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, মানে শর্করা কম ও মৌসুমি ফল খেতে হবে। যেমন- পেয়ারা, আমলকি, স্ট্রবেরি, নাশপাতি, কলা, পেঁপে ইত্যাদি।

শাকসবজির মধ্যে গাঢ় সবুজ শাক যেমন পালং, পাট, কলমি, লাউ, মটরশাক এবং সবজির মধ্যে ব্রকলি, করলা, গাজর, ঢেঁড়শ, বিটরুট, টমেটো, ক্যাপসিকাম, মিষ্টি আলু, সজনে উপকারী।

বাদাম, মাছ নাকি অলিভ অয়েল - কোনটি বেশি কার্যকর?

তিনটিই উপকারী, যদি সুষমভাবে খাদ্যতালিকায় থাকে। মাছে আছে ওমেগা–থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস, যা রক্ত জমাট বাধা রোধ করে এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমায়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সপ্তাহে দুতিন বার সামুদ্রিক মাছ খাওয়া উচিত। আবার বাদাম ও জলপাই তেল মনো এবং পলি আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটের উৎস, যা খারাপ কোলেস্টেরল কমায়।

প্রতিদিন ৩০ গ্রাম বাদাম ও ৪ টেবিল-চামচ জলপাই তেল গ্রহণে হৃদরোগের ঝুঁকি ৩০ শতাংশ কমে।

চর্বিযুক্ত খাবার কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?

সব চর্বি খারাপ নয়। তবে কঠিন বা শক্ত স্যাচুরেইটেড ফ্যাট, যেমন- মাখন, পনির, মাংসের চর্বি, সীমিত খেতে হবে। তরল আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট, যেমন- বাদাম, বীজ, জলপাইয়ের তেল, এগুলো উপকারী।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন পরামর্শ দিয়েছে, স্যাচুরেইটেড ফ্যাট দৈনিক ক্যালরির ১০ শতাংশের নিচে রাখতে।

লাল মাংস কতটা ক্ষতিকর?

লাল মাংস পুরোপুরি বর্জন না করে সপ্তাহে একবার তিন-চার টুকরা চর্বিহীন মাংস খাওয়া নিরাপদ।

প্রক্রিয়াজাত মাংস, যেমন- সসেজ, চিকেন বল, বেকন বা হটডগে স্যাচুরেইটেড ফ্যাট ও সোডিয়াম বা লবণ বেশি থাকে, যা রক্তচাপ বাড়ায়। তাই এগুলো এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

চা-কফি পান কি হৃদ্-স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে?

পরিমিত চা বা কফি উপকারী, তবে অতিরিক্ত খেলে উদ্বেগ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

চায়ে চিনি, ক্রিম বা সিরাপ না মেশানোই ভালো। অতিরিক্ত চা-কফির ট্যানিনের কারণে আয়রন, বিশেষ করে উদ্ভিদজাত খাবার বা শাকসবজির নন-হিম আয়রন শরীরের শোষণে বাধা দেয়।

ভাজা বা প্রক্রিয়াজাত খাবার যে কারণে বিপজ্জনক?

ডুবো তেলে ভাজা খাবারে স্যাচুরেইটেড ও ট্রান্সফ্যাট থাকে, যা ধমনী সংকুচিত করে রক্তপ্রবাহ কমায়।

ফাস্টফুড, স্ট্রিট ফুড ও বেকারিপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হাইড্রোজেনেইটেড তেল হৃদ্-রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

ব্যস্ত জীবনে হৃদ্-যন্ত্র-বান্ধব খাদ্যাভ্যাস যেমন হওয়া উচিত

অফিসে বা চলার পথে সহজে খাওয়া যায় এমন খাবার রাখা যেতে পারে। সিদ্ধ ডিম, এক মুঠ বাদাম, টকদই, চিড়া বা ওটস, মৌসুমি ফল ও সবজি।

ছোলাসিদ্ধ সালাদ, সবজি খিচুড়ি, ডিটক্স ওয়াটার বা লেবু পানি— এগুলোও কার্যকর। সঙ্গে বাইরের ভাজাপোড়া ও প্যাকেটজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চতে হবে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কোন অভ্যাস বেশি ক্ষতিকর?

অতিরিক্ত লবণ, আচার, চিপস, চানাচুর, একই তেলে ভাজা খাবার, টেস্টিং সল্ট ও ফাস্টফুড— এসবই হৃদ্-রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।

বর্তমানে শিশু-কিশোররা প্যাকেটজাত ও বাইরের খাবারে প্রতি ঝুঁকে পড়ায় ভবিষ্যতে তাদের উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ছে।

হৃদ্-যন্ত্রের যত্নে সচেতন হওয়া উচিত, খাবারে বৈচিত্র্য আনতে হবে। সুস্থ হৃদয় থেকেই শুরু হোক সুস্থ জীবন।

লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

পুরানো খবর:

অল্প খেয়েও রক্তে শর্করা বাড়ার কারণ
চা কি প্রতিদিনের পানির চাহিদা মেটায়?
মেদ ঝরাতে ৫ ধরনের নাস্তা