Published : 05 Jan 2026, 01:24 PM
শরীর ভালো রাখার কথা উঠলেই অনেকের মাথায় প্রথম আসে ওজন কমানোর বিষয়টি। নিয়মিত ওজন মাপা, সংখ্যাটা কমল কি-না যাচাই করা যেন সুস্থ থাকার প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ স্থূলতার সমস্যায় ভুগতে দেখা যায়। ফলে ডায়েট, শরীরের আকার আর ওজন নিয়ে উদ্বেগও দিন দিন বাড়ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকতে চাইলে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। কারণ সুস্থতার আসল বিষয় ওজন নয়, বরং শারীরিক সক্ষমতা ও নিয়মিত নড়াচড়া।
ওজন নয়, স্বাস্থ্যই আসল লক্ষ্য
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিয়াটল ক্যাম্পাসে পারিবারিক চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক ডা. লিসা এরল্যাঙ্গার সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “স্বাস্থ্য ভালো করার পথ ওজন কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত হাঁটা বাড়ানো বা পেশিশক্তি উন্নত করার মতো অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখতে পারলে ক্যানসার, বিষণ্নতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে হৃদরোগ এবং যে কোনো কারণে মৃত্যুর আশঙ্কাও কমে আসে।”
অর্থাৎ ওজনের সংখ্যার চেয়ে শরীর কীভাবে কাজ করছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
২০২৪ সালে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অফ স্পোর্টস মেডিসিন’য়ে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ডায়েট করে ওজন কমানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে খুব একটা কার্যকর নয়।
বেশির ভাগ মানুষই কিছুদিন পর আগের ওজনে ফিরে যান। ফলে ওজন কমার সঙ্গে যে সাময়িক স্বাস্থ্যগত উন্নতি দেখা যায়, তা স্থায়ী হয় না।
এই গবেষণার সহলেখক, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়াম ও শারীরবিদ্যার অধ্যাপক গ্লেন গেসার বলেন, “শ্বাসপ্রশ্বাসের সক্ষমতা বাড়ানো ও শরীরচর্চার মাধ্যমে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের শক্তি উন্নত করাই স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বেশি উপকারী।”
স্থূলতার পেছনের জটিল কারণ
অনেকেই মনে করেন, বেশি খাওয়া আর কম নড়াচড়াই ওজন বাড়ার একমাত্র কারণ। তবে বাস্তবতা এতটা সরল নয়।
অধ্যাপক গেসারের মতে, “বড় পরিমাণে খাবার পরিবেশন, অতিরিক্ত চিনি, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবেশগত নানান রাসায়নিক।”
প্লাস্টিক, কীটনাশক ও আগাছানাশকে থাকা কিছু স্থায়ী রাসায়নিক শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে, যা শক্তির ব্যবহার ও সঞ্চয়ে পরিবর্তন আনে।
ডায়েট যে কারণে টেকে না
ডা. লিসা এরল্যাঙ্গার বলেন, “ওজন কমানোর চেষ্টা অনেক সময় উল্টো ফল ডেকে আনে। গবেষণায় দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য ওজন কমানো মানুষের প্রায় আশি শতাংশ পাঁচ বছরের মধ্যে আবার সেই ওজন ফিরে পান। কারণ মানুষের শরীরের একটি স্বাভাবিক ওজন-পরিসর থাকে, যা জিনগত বৈশিষ্ট্য ও জাতিগত পটভূমির সঙ্গে জড়িত।”
শরীর যখন কম খাবার পায়, তখন বেঁচে থাকার জন্য বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেয়। এতে ক্ষুধা বাড়ে, ঘুমের সমস্যা হয় এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়।
এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় ভুলভাবে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, অথচ এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
বারবার ওজন ওঠানামার ক্ষতি
ডায়েট করে ওজন কমানো, আবার বেড়ে যাওয়া— এই চক্রকে অনেকেই অভ্যাসে পরিণত করেন। তবে এই ওঠানামা শরীর ও মনের জন্য ক্ষতিকর।
অধ্যাপক গেসারের মতে, “এমন অভ্যাস হৃদরোগ, রক্তনালির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়া, হাড় ভাঙার ঝুঁকি, ডায়াবেটিস এবং কিছু ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়ায়।”
চলাফেরাই হতে পারে সমাধান
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ স্পষ্ট খাবারের তালিকা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে শরীরকে সচল রাখাই বেশি জরুরি।
সাইকেল চালানো, হাঁটা, পাহাড়ি পথে চলা, নাচ বা বাগান করা যা ভালো লাগে, তাই নিয়মিত করলে উপকার মিলবে।
অবশ্যই শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী এবং কোনো ব্যথা হলে থেমে যাওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
ডা. এরল্যাঙ্গার বলেন, “গবেষণা নিশ্চিতভাবে দেখিয়েছে, স্বাস্থ্য ভালো করতে চাইলে ডায়েট নয়, বরং হাঁটা বা অন্য শারীরিক কর্মকাণ্ড বেছে নেওয়াই ভালো।”
সুস্থতার মানে নতুন করে ভাবা
অনেকেই আছেন যারা পাতলা হতে চান, কিন্তু সুস্থ হতে চান না- এই মানসিকতা বদলানো জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ওজন না কমলেও নিয়মিত শরীরচর্চা রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
অধ্যাপক গেসারের ভাষায়, “ব্যায়াম শরীরের প্রতিটি কোষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই আদর্শ ওজনের ধারণা পাশে রেখে শরীরকে সক্রিয় রাখা হলে সুস্থ থাকা সম্ভব।”
ওজনের বাইরে তাকানোর সময়
স্বাস্থ্য আর দীর্ঘায়ু অর্জনের পথে ওজনের মাপা যেন প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে।
প্রতিদিন একটু বেশি হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, ঘরের কাজ বা খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানো এই ছোট পরিবর্তনগুলোই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রে ফল ও শাকসবজি বাড়ানোও উপকারী, এমনকি ওজনের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও।
আরও পড়ুন
ওজন কমলেও ভুঁড়ি কমে না যে কারণে