Published : 02 Apr 2026, 01:06 PM
অনেকেরই স্বপ্ন থাকে নিজের একটি ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট হবে। তবে স্বপ্নের ফ্ল্যাট কেনার পর নিবন্ধনের ঝামেলা, দলিলের জটিলতা এবং বিভিন্ন ফি ও কর নিয়ে অনেকেই বিব্রত হয়ে পড়েন।
ফ্ল্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রথম দেখায় জটিল মনে হলেও সঠিক তথ্য ও পরিকল্পনা থাকলে এটি অনেক সহজ ও ঝামেলামুক্ত হয়ে যায়।
আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘জেমস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম কে আনোয়ার হাসান বলেন, “আবাসন প্রকল্পের জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা সঠিক আছে কি-না, যাচাই করতে হবে। যিনি বিক্রি করছেন, তার নামে খতিয়ান রয়েছে কি-না, সেটি নিশ্চিত হওয়া দরকার।”
“সিএস, এসএ, আরএস এবং ঢাকা সিটি জরিপ ঠিক আছে কি না, তা–ও দেখতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে গিয়ে জমিটি নিষ্কণ্টক নাকি কোনো সমস্যা আছে, যাচাই করা যেতে পারে। আবার জমিটি কোথাও বন্ধক আছে কি-না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে আইনজীবী নিয়োগ করেও কাজগুলো করা যায়”- পরামর্শ দেন আনোয়ার হাসান।
ফ্ল্যাট কেনার আগে যা যাচাই করবেন
ফ্ল্যাট কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- ভবনের নকশা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কি না, তা নিশ্চিত করা।
অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও খুঁজে দেখা জরুরি। কারণ, নকশা অনুমোদন না থাকলে বা অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ হলে যে কোনো সময় রাজউক সেই অংশ ভেঙে দিতে পারে।
রাজউকের ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রকল্পের অনুমোদন যাচাই করা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে আবাসন প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্ল্যাট কিনছেন, সেটি ‘রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)’-এর সদস্য কি না।
রিহ্যাবের সদস্য নয় এমন প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্ল্যাট না কেনাই নিরাপদ। কারণ, পরে কোনো সমস্যা হলে রিহ্যাবের কাছে অভিযোগ করা যাবে না।
রিহ্যাব সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনের নিয়মকানুন মেনে চলে এবং জবাবদিহির মধ্যে থাকে।
জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। যিনি বিক্রি করছেন, তার নামে খতিয়ান আছে কি না, সিএস, এসএ, আরএসসহ অন্যান্য খতিয়ানের ক্রম মিলিয়ে দেখতে হবে।
জমিটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কোনো মালিকের কাছ থেকে নিয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র আছে কি-না, তাও যাচাই করতে হবে।
জমিটি নিষ্কণ্টক কি-না, কোথাও বন্ধক আছে কি-না— এসব ভূমি অফিসে গিয়ে নিশ্চিত হওয় যায়। প্রয়োজনে আইনজীবীর সাহায্য নিতে হতে পারে।
ফ্ল্যাট নিবন্ধনের প্রক্রিয়া
ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধের পর তিন মাসের মধ্যে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান দখল হস্তান্তর, দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করে দেয়।
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে-
দলিল লেখকের সাহায্য: সনদপ্রাপ্ত দলিল লেখক বা আইনজীবীর মাধ্যমে দলিলের খসড়া তৈরি করা।
কাগজপত্র যাচাই: জমির মালিকানা দলিল, পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি, অনুমোদিত প্ল্যান, চুক্তিনামা ইত্যাদি সংযুক্ত করা।
ফি ও কর পরিশোধ: দলিল মূল্যের ওপর স্ট্যাম্প ডিউটি, রেজিস্ট্রেশন ফি (১%), স্থানীয় সরকার ফি (২-৩%) এবং ভ্যাট (২-৪.৫%) পরিশোধ করতে হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরে আয়তন অনুযায়ী অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নিবন্ধন: দলিলসহ সব কাগজপত্র নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে হাজির হয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়।
নামজারি: নিবন্ধনের পর ভূমি অফিসে গিয়ে নামজারি করা দরকার, যাতে সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম নিশ্চিত হয়।
ফ্ল্যাট নিবন্ধনের খরচ
ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় ক থেকে ঘ শ্রেণির মৌজায় ১৬০০ বর্গফুটের নিচে ২% এবং তার বেশি হলে ৪.৫% ভ্যাট প্রযোজ্য।
এছাড়া স্ট্যাম্প ফি ১.৫%, রেজিস্ট্রেশন ফি ১%, স্থানীয় সরকার কর ২% এবং অতিরিক্ত কর (প্রতি বর্গফুট অনুযায়ী) যোগ হয়।
স্থান, আয়তন আকারে খরচ কমবেশি হতে পারে।
যেসব সাধারণ ভুল এড়াতে হবে
রেজিস্ট্রেশন ফি বাঁচাতে ফ্ল্যাটের মূল্য কম ঘোষণা করা (অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ)
রেজিস্ট্রেশনের আগে সম্পত্তির মিউটেশনের অবস্থা যাচাই না করা
নিবন্ধনের পর মিউটেশন আবেদনে বিলম্ব
ডেভেলপারের এনওসি বা ভবন অনুমোদনের নথি উপেক্ষা করা
কর ছাড়পত্র বা টিন জমা দেওয়ার তথ্য উপস্থাপন না করা
ওপরের তথ্যগুলো জানিয়ে আনোয়ার হাসান বলেন, “ফ্ল্যাট নিবন্ধন কেবল একটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা নয়— এটি আপনার বৈধ মালিকানার প্রমাণ। যদিও প্রক্রিয়াটি প্রথমে কঠিন মনে হতে পারে। তবে সঠিক তথ্য এবং নির্দেশনার মাধ্যমে এটি সুচারুভাবে ও দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা যায়।”
আরও পড়ুন
ঢাকার জিপিওতে মিলবে সাশ্রয়ী আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সেবা