Published : 20 Jul 2025, 07:14 PM
আঘাত ও সংক্রমণের বিপরীতে দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল প্রদাহ। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর বাজে প্রভাব ফেলে দীর্ঘদিনের প্রদাহ ।
ফলে দেখা দিতে পারে হৃদসংক্রান্ত সমস্যা থেকে স্নায়ুর নানান রোগ।
যদিও ওষুধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যা দূর করা যায়। তবে দৈনিক কিছু অভ্যাস গড়তে পারলে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো
বেশিরভাগ প্রক্রিয়াজাত খাবারে বাড়তি চিনি ও ‘ট্রান্স ফ্যাট’ থাকে। যা তাৎক্ষণিকভাবে রক্তের শর্করা মাত্রা বাড়িয়ে ‘অক্সিডেটিভ’ চাপ তৈরি করে। ফলাফল শারীরিক প্রদাহ।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোলিনা ভিত্তিক ‘প্রিভেন্টিভ মেডিসিন’ চিকিৎসক ওলাবাইসি ব্যাডমাস রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে এই তথ্য জানিয়ে আরও বলেন, “এসব খাবার ‘এলডিএল’ বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। আর ‘এইচডিএল’ বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।”
এছাড়া এসব খাবারে আঁশের পরিমাণও কম। যা পাকস্থলীর জন্য মোটেই ভালো নয়। এই ধরনের খাবার প্রতিনিয়ত খেলে পেটের অসুখ হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
তাই প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিয়ে নাস্তা হিসেবে পত্রল সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক। যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এবং প্রদাহরোধী হিসেবে কাজ করে।
এছাড়া বাদাম ও মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। এগুলো থেকেও মিলবে প্রদাহরোধী উপাদান ‘ওমেগা-থ্রিস’।
মদ্যপান এড়ানো
অ্যালকোহল যকৃতের রোগ প্রতিরোধ কোষ সক্রিয় করে তোলে, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ দেখা দেয়।
ডা. ব্যাডমাস বলেন, “অ্যালকোহল হজম করতে গিয়ে উৎপন্ন হয় ‘অ্যাসেটালহাইড’ এবং ‘রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিশিজ’। এই অনুগুলো কোষ-কলার ক্ষতি সাধান করে দেহে প্রদাহের মাত্রা বাড়ায়।”
এছাড়া হৃদসংক্রান্ত রোগের জন্যও দায়ী অ্যালকোহল।
পর্যাপ্ত ঘুম
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রদাহ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে স্বাভাবিক ঘুমচক্র। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না হয় তবে এই ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়।
ডা. ব্যাডমাস বলেন, “অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস দেহের স্বাভাবিক ছন্দে পতন ঘটায়। যা থেকে দেখা দেয় প্রদাহ। তাছাড়া বাজের ঘুমের কারণে কর্টিসলের মাত্রা বাড়ে। এই চাপের হরমোনও প্রাথমিকভাবে প্রদাহ বাড়ানোতে ভূমিকা রাখে।”
এজন্য প্রতিরাতে অন্তত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়তে হবে।
“প্রতিরাতে প্রায় একই সময়ে বিছানায় যাওয়া আর একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়লে দেহের ছন্দে ভারসাম্য থাকবে”- বলেন ডা. ব্যাডমাস।
প্রতিদিন দেহ নড়ানো
হতে পারে ব্যায়ামাগারে গিয়ে শরীরচর্চা করা কিংবা বাইরে হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা সাঁতার কাটা- সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন শারীরিক কসরতে লিপ্ত থাকার পরামর্শ দেন ডা. অ্যালিসন বাটারাজি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টার্নাল অ্যান্ড লাইফস্টাইল মেডিসিন’য়ের এই চিকিৎসক আরও পরামর্শ দেন, “দৈনিক ২০ থেকে ৩০ মিনিট শারীরিক কর্মকাণ্ড করা প্রদাহ কমানোর জন্য যথেষ্ট।”
এতে ইন্সুলিনের প্রতি সহনশীলতা বাড়ে, অন্ত্রের চর্বি কমে, পেশি স্ফিত হয়- এগুলো প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা
ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক চিকিৎসক ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. পূজা গিড়ওয়ানি একই প্রতিবেদেনে বলেন, “সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।”
তিনি আরও বলেন, “একাকিত্ব মানসিক চাপ বাড়ায়। আর এটা শারীরিক চাপের মতোই ক্ষতিকর।”
অন্যদিকে ডা. বাটারাজি বলেন, “জোড়ালো মানবিক সম্পর্ক মানসিক চাপের কর্টিসল-সহ অন্যান্য হরমোনের মাত্রা কমিয়ে প্রদাহ হ্রাসে সাহায্য করে।”
এছাড়া মানবিক যোগাযোগ অক্সিটসিন’এর মাত্রা বাড়ায়। যা ‘লাভ হরমোন’ নামে পরিচিত। আর এটা প্রদাহ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রকৃতিতে সময় কাটানো
নীল জায়গা যেমন- আকাশ, সাগর বা নদী এবং সবুজ জায়গা যেমন- পার্ক বা বন- এই দুটোই উত্তেজিত স্নায়ু প্রশমিত করে। ফলে ‘স্ট্রেস হরমোন’ কমে।
ডা. পূজা বলেন, “প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে গেলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমে। আর দেহের নড়াচড়া বৃদ্ধি পায়। যা সরাসরি প্রদাহ কমানোর সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত।”
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ইস্ট অ্যাংলিয়া’র ‘নরউইচ মেডিকেল স্কুল’য়ের করা এক গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, প্রতি সপ্তাহে ১২০ মিনিট প্রকৃতিতে সময় কাটালে সার্বিকভাবে দেহ ও মনে ভালো বোধ হয়।”
ধ্যান
“মনোযোগ দিয়ে ধ্যান করলে দেহের চাপ কমে। ফলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা হ্রাস পায়” মন্তব্য করেন ডা. পূজা গিড়ওয়ানি।
তিনি বলেন, “ধ্যান দেহকে ‘রেস্ট অ্যান্ড রিপেয়ার’ বা বিশ্রাম ও সেরে ওঠার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রদাহ তৈরি হওয়ার উপাদান তৈরি হওয়ার মাত্রা কমে। পাশাপাশি নিয়মিত ধ্যান করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
এই চিকিৎসক নিয়মিত রুটিনে মনোযোগ দিয়ে ধ্যান করার পরামর্শ দেন।
তার কথায়, “প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট ধ্যান করলেও উপকার মিলবে আর কমবে প্রদাহের মাত্রা।”
আরও পড়ুন
প্রদাহ কমাতে পারে এমন কয়েকটি সবজি