Published : 21 Jan 2026, 04:10 PM
রাজধানীর টঙ্গীর চেরাগ আলী মার্কেটে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন সিরামিকের এক অপার রাজ্যে পা রেখেছেন।
এখানে দেশের সবচেয়ে বড় খুচরা ও পাইকারি ক্রোকারিজ পণ্যের বাজার অবস্থিত, যেখানে বাজেটের মধ্যে কেনাকাটা করার আদর্শ স্থান।

প্রধান সড়ক থেকে কয়েক কদম হাঁটলেই বাঁদিকে চোখে পড়বে, ক্রোকারিজের এই বিশাল বাজারে। বাজারের ভেতরে আরেকটি বাজার— নাম ‘শের-ই-বাংলা সিরামিক মার্কেট’।
মাহবুব এন্টারপ্রাইজ এর কর্ণধার মো. আবুল কালাম আজাদ জানালেন, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাজারে এখন পাঁচ শতাধিক দোকান রয়েছে।
ফটকে প্রবেশ করতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়, অসংখ্য দোকানে সাজানো সিরামিকের নানান পণ্যে। কেউ দেখছেন, কেউ কিনছেন, কেউ অগ্রিম অর্ডার দিয়ে যাচ্ছেন, কেউ প্যাকিং করে নিচ্ছেন, আর কেউ গাড়ির অপেক্ষায় গল্পে মগ্ন।

এখান থেকে অনেকে পণ্য কিনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যান, গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করেন। কেনাকাটা শেষ হলে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন।
পণ্যগুলো অত্যন্ত যত্নসহকারে বড় বড় কাগজের বাক্সে খড় বিছিয়ে সাজিয়ে মোড়কজাত করা হয়, যাতে পরিবহনকালে কোনো ক্ষতি না হয়।
মক্কা ক্রোকারিজ দোকানে স্কুলশিক্ষক মুমিনুল ইসলাম সহকর্মীদের সঙ্গে এসেছেন। তিনি খেলাধুলার বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার হিসেবে বিভিন্ন প্লেট কিনছেন— ভাতের প্লেট, নাশতার প্লেটসহ নানান কিছু।
প্রতিটি দোকানে এমনই ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। দোকানগুলোতে একচিলতে জায়গা ছাড়া সবকিছু সিরামিক পণ্যে ভর্তি; মেঝেতে স্তূপীকৃত, দেয়ালে থড়ে থড়ে সাজানো।

রংয়ের বৈচিত্র্য: সাদা থেকে নীল, লাল সবকিছু
পণ্যগুলোতে রংয়ের ছড়াছড়ি। সাদা রংয়ের প্রাধান্য থাকলেও আকাশি নীল, লাল, কালো, হলুদ, বাদামি, খয়েরি, সবুজ ও ধূসর রংয়ের পণ্যও প্রচুর।
নানান ফুল-পাতার নকশায় ছাওয়া এসব পণ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। এখানে কী নেই! চায়ের কাপ-পিরিচ থেকে শুরু করে পানির মগ, কফি মগ, জগ, ভাত-পোলাওর প্লেট, হাফ প্লেট, তরকারির বাটি, নুডলস বাটি, ফিরনি-পায়েসের বাটি, সসের বাটি, স্যুপের বাটি, পিৎজা প্লেট, স্যান্ডউইচ প্লেট, চা-কফির কেটলি, লিকার পট, দুধ-চিনির পট, ট্রে, লবণদানি— সবকিছু মিলবে।

আকার-আকৃতিতেও বৈচিত্র্য অপরিসীম। গোলাকার, বর্গাকার, আয়তাকার, খাঁজকাটা প্লেট; মাছের আদলে বাটি, ফুল-পাতার আকৃতির বাটি, হাঁড়ি আকৃতির তরকারির বাটি, জগ আকৃতির ফুলের টব—সবই আছে।
২৭, ৩১, ৩২ বা ৫২ আইটেমের ডিনার সেটও পাওয়া যায়, যাতে খাবার টেবিলের সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। এমনকি ফেইসবুকের ইমোজির আদলে বানানো পণ্যও রয়েছে। সিরামিকের পাশাপাশি অল্প কাচের পণ্যও চোখে পড়ে।

দামের সীমা: বাজেট অনুসারে সবার জন্য কিছু না কিছু
দামের দিক থেকে এই বাজার অত্যন্ত সাশ্রয়ী। চায়ের কাপ প্রতিটি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। ৬টির সেট ৬শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা।
পানির মগ বা কফি মগ ১৩০ থেকে ২৫০ টাকা। পানির জগ ১ হাজার ২শ’ থেকে ১ হাজার ৮শ’ টাকা।

চ্যাপ্টা জুস জগ ১২শ’ টাকা। ভাতের প্লেট ডজন ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। পোলাও প্লেট ৬শ’ থেকে ১ হাজার টাকা।
ক্যাসারল ১৫শ’ টাকা। হাফ প্লেট ডজন ১ হাজার ৪৪০ থেকে ২ হাজার ১শ’ টাকা। ৩টি বাটির সেট ৬শ’ টাকা, ৭ পিসের তরকারি বাটি সেট ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ৪শ’ টাকা।
৯ ইঞ্চি বাটি ৪শ’ থেকে ৯শ’ টাকা।

হাঁড়ি আকৃতির বাটি সেট ১৬শ’ থেকে আড়াই হাজার টাকা। ফিরনি বাটি সেট ১ হাজার ২৫০ টাকা। পিৎজা প্লেট ৮শ’ টাকা।
স্যান্ডউইচ প্লেট ১৭৫ টাকা। সস বাটি সেট সাড়ে ৫শ’ টাকা। চা-কফি সেট ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা।
ডিনার সেটের দামও বৈচিত্র্যময়। মেসার্স ফিরোজ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ২৭ আইটেমের সেট সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু। ৩১ আইটেম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু।
৩২ আইটেম সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার টাকার মধ্যে মিলবে। আর ৫২ আইটেম সাড়ে ৮ হাজার থেকে সাড়ে ৪০ হাজার টাকা।

কাস্টমাইজড পণ্য: ফরমাশে তৈরি উপহারসামগ্রী
এখানে ফরমাশে সিরামিক পণ্য তৈরির সুবিধাও রয়েছে।
মক্কা ক্রোকারিজের মারুফ ইসলাম বলেন, “জন্মদিন, স্কুল-কলেজের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, প্রতিষ্ঠানের পুনর্মিলনী বা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অর্ডার আসে। মগ বা প্লেটে লোগো, ছবি বা স্মারক কথা যোগ করা যায়। সাধারণত ৫০টির কম অর্ডার নেওয়া হয় না, এবং অতিরিক্ত খরচ ২৫ থেকে ৫০ টাকা।”
অন্যান্য বিশেষ পণ্যের মধ্যে আলাদিনের চেরাগ আকৃতির দুধ পট সাড়ে ৪শ’ টাকা। চিনি পট ৩শ’। কেটলি সাড়ে ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকা। ছোট ট্রে ২শ’ টাকা, বড় ট্রে ১ হাজার ২৫০ টাকা।
মাছ আকৃতির বাটি সাড়ে ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা। সূর্যমুখী ফুলের বাটি সাড়ে ৪শ’ টাকা। ফুলের টব ৮০ থেকে ৪৭০ টাকা।

যে কারণে এই বাজার আকর্ষণীয়
চেরাগ আলী মার্কেটের এই ক্রোকারিজ অংশটি শুধু কেনাকাটার স্থান নয়, এটি একটি জীবন্ত বাজার যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মিলন ঘটে।
বাজেটের মধ্যে উন্নতমানের সিরামিক পণ্য কিনতে চাইলে এখানে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন