Published : 09 Mar 2026, 04:31 PM
জিমে মানে ব্যায়ামাগারে গিয়ে ঘাম ঝরাচ্ছেন, সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন হাঁটছেন বা দৌড়াচ্ছেন, ক্যালরি কাউন্ট করছেন— তবু স্কেলের কাঁটা যেন আটকে গেছে।
প্রথম দুয়েক মাসে চার-পাঁচ কেজি কমেছে, তারপর আর নড়ছে না। এটা অনেকেরই অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “ওজন কমানো শুধু ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করে না। এটা একটা পুরোপুরি লাইফস্টাইলের ব্যাপার— খাবার, ঘুম, স্ট্রেস, হরমোন সব মিলে কাজ করে। অনেকে ব্যায়াম করে কিন্তু অন্যান্য কারণে ‘প্ল্যাটো’তে আটকে যান।”
নরওয়ে’র ‘নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র ‘ওবেসিটি রিসার্চ গ্রুপ’য়ের করা গবেষণায় দেখা গেছে- ‘মেটাবলিক অ্যাডাপটেশন’য়ের মাধ্যমে ‘ক্যালরি বার্ন’ কমিয়ে দিয়ে, শরীর ওজন কমানোর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণা অনুসারে ওজন না কমার প্রধান কারণগুলো এবং কীভাবে সেগুলো ঠিক করা যায়- জেনে নেওয়া যাক।
অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া: শরীর ‘অ্যাডাপ্ট’ করে ফেলে
শুরুতে হাঁটা বা জিম করে ওজন দ্রুত কমে কারণ শরীর নতুন চাপে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর শরীর আরও দক্ষ হয়ে যায়— একই কাজে কম ক্যালরি বার্ন করে। ফলে ‘ডেফিসিট’ বা খরচ কমে যায়।
আবার অতিরিক্ত ব্যায়াম করে বিশ্রাম না নিলে বা প্রোটিন-পুষ্টি না দিলে পেশি ক্ষয় হয়, যা মেটাবলিজম আরও ধীর করে।
সমাধান: ব্যায়ামের ধরন বদলান— হাঁটার পরিবর্তে ‘ইন্টারভেল রানিং’, ‘সাইক্লিং’ বা ‘স্ট্রেংথ ট্রেনিং’ যোগ করুন।
প্রতি চার থেকে ছয় সপ্তাহে ব্যায়ামের ধরন পরিবর্তন করতে হবে (প্রোগ্রেসিভ ওভারলোড)।
‘কার্ডিও’ এবং ‘ওয়েট ট্রেনিং’ বা ওজন তোলা ধরনের ব্যায়াম মিলিয়ে করলে, পেশি ও ‘রেস্টিং মেটাবলিজম’ বাড়ে।
ঘুমের অভাব: হরমোনের দুষ্টচক্র
কম ঘুম (ছয় ঘণ্টার কম) ‘ঘ্রেলিন’ হরমোন বাড়ায় (ক্ষুধা বাড়ে) এবং ‘লেপটিন’ কমায় (পেট ভরার সংকেত কমে)।
ফলে দিনে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, বিশেষ করে চিনি-কার্বোহাইড্রেইট।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম কম হলে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ৩০০ থেকে ৫০০ বেশি হয়।
সমাধান: প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমান। একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠা।
ঘুমের আগে ফোন-টিভি বন্ধ করা। কুসুম গরম পানিতে গোসল করে ঘুমাতে যাওয়া।
মানসিক চাপ: কর্টিসলের খেলা
দুশ্চিন্তা, চাকরির চাপ বা পরিবারের ঝামেলা- ইত্যাদি কারণে কর্টিসল হরমোন বাড়ে। এটা পেটের চর্বি জমায়, ক্ষুধা বাড়ায় এবং ইন্সুলিন ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধী অবস্থা তৈরি করে। ফলে ব্যায়াম করলেও চর্বি ঝরা কম হয়।
সমাধান: প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধ্যান, প্রার্থনা বা গভীর শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা মানসিক চাপ কমাতে উপকারী। হালকা যোগ-ব্যায়ামও সাহায্য করে। মানসিক চাপ কমলে আজেবাজে খাবার খাওয়ার ইচ্ছাও কমে।
পানি কম পান ও চিনিযুক্ত পানীয়: লুকানো ক্যালরি
পানি কম গ্রহণ করলে মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়।
অনেকে ভাবেন চা-কফি বা জুস পানি হিসেবে চলে— তবে চিনিযুক্ত পানীয় (সফট ড্রিঙ্ক, ভিটামিন ওয়াটার, ফলের জুস) তরল ক্যালরি দেয়, যা শরীর সঠিকভাবে ‘রেকর্ড’ করে না।
এক গ্লাস জুসে দুতিনটা ফলের চিনি থাকে, তবে থাকে না আঁশ— ফলে ক্ষুধা কমে না, বরং বাড়ে।
সমাধান: দিনে আড়াই থেকে তিন লিটার (৮-১০ গ্লাস) পানি পান করতে হবে। চিনিযুক্ত পানীয় বাদ দেওয়া আর পানির সঙ্গে লেবু বা শসা দিয়ে স্বাদ যোগ করে পান করলে উপকার মিলবে।
খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া: ‘মাইন্ডলেস ইটিং’
ব্যস্ততায় বা টিভি দেখতে দেখতে কিংবা ফোনে স্ক্রল করতে করতে খেলে পেট ভরার সংকেত শরীর দেরিতে পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ধীরে খেলে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম ক্যালরি খাওয়া হয়।
সমাধান: খাবারের সময় ফোন-টিভি বন্ধ রাখা। প্রতিটি কামড় চিবিয়ে খাওয়া (২০ থেকে ৩০ বার)। পেট ভরার সংকেত আসলে খাওয়া থামান।
অন্যান্য লুকানো কারণ: থাইরয়েড, অতিরিক্ত খাওয়া বা পেশি ক্ষয়
অনেক সময় থাইরয়েড সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম) বা ইন্সুলিন ‘রেজিস্ট্যান্স’ ওজন কমাতে বাধা দেয়।
ব্যায়ামের পর ক্ষুধা বেড়ে গিয়ে অজান্তে বেশি খাওয়া হয়। শুধু কার্ডিও করে পেশির ক্ষয় হলে ‘মেটাবলিজম’ কমে।
সমাধান: এসব করেও চার-ছয় সপ্তাহে ফল না পেলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত হবে। থাইরয়েড ও রক্তের শর্করা (ব্লাড সুগার) পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন পড়তে পারে।
অ্যাপ ব্যবহার করে ক্যালরি ট্র্যাক করার চেষ্টা করতে হবে।
প্রোটিন গ্রহণ বাড়ানো উপকারী হতে পারে।
আরও পড়ুন