Published : 26 Aug 2025, 03:34 PM
যদি দেখা যায় খাওয়ার পর স্বাভাবিকের চাইতে বেশি গ্যাস হচ্ছে, তবে সেটা মনে নয়- বাস্তবেই সেটা হচ্ছে।
বয়স বৃদ্ধির সাথে দেহের অন্যান্য কার্যকলাপের মতো হজম প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে যায়। ফলে খাবার পাকস্থলী থেকে মলদ্বার পর্যন্ত যেতে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি সময় লাগে।
এই তথ্য জানিয়ে ‘হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘হার্ভার্ড-অ্যাফিলিয়েটেড ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল’য়ের গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলোজিস্ট ডা. কায়ল স্টলার বলেন, “হজমের রাস্তায় যত বেশি সময় ধরে খাবার থাকবে, ততই গ্যাস হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।”
গ্যাসের প্রকৃতি
গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেটের আকারের পরিবর্তন হয় ও বৃদ্ধি পায়। সাধারণত স্বাভাবিক মাত্রায় গ্যাস হলে, বুক থেকে পেট আলাদা রাখার ঝিল্লির বৃদ্ধি ঘটে, যাতে পাকস্থলীর দেয়াল টানটান অবস্থাতেও এর নিজস্ব আকার বজায় রাখতে পারে। তবে অতিরিক্ত গ্যাস হলে এই অংশের জায়গা সংকুচিত হয়ে চাপ সৃষ্টি করে।
বেশিরভাগ সময় ‘ব্লোটিং’ বা পেটফোলা-ভাব’কে দুটি কার্যপ্রণালীকে বুঝায়। পাকস্থলী স্ফীত হওয়া আর এই কারণে পেটে চাপ পড়া। এই দুইয়ে মিলে পেটভরা, পেট শক্ত হওয়ার অনুভূতি থেকে অস্বস্তির মাত্রা মৃদু থেকে মাত্রাতিরিক্ত হয়।
ডা. কায়ল বলেন, “মাঝেমধ্যে পেটফোলা-ভাব হওয়া চিন্তার কিছু নেই। দেহ গ্যাস বের করে দিতে কাজ করে যায়। আর বেশি অস্বস্তি হলে গ্যাসের ওষুধ সেবনে উপকার মেলে।”
সংবেদনশীল স্নায়ু থেকে গ্যাসের সমস্যা
পেটফোলা-ভাবের আরেকটি কারণ হল সাধারণ গ্যাসের অস্বাভাবিক আচরণ।
ডা. কায়ল বলেন, “আমরা সবাই সারাদিনে কিছু পরিমাণ গ্যাস বা বাতাস গ্রহণ করি পেটে, এমনকি যখন খাওয়া হয় না তখনও। তবে কখনও কখনও ঝিল্লির বিস্তারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া উল্টে গেলেও সমস্যা হয়। যখন পাকস্থলীর দেয়াল শিথিল থাকে তখন বুক থেকে পেট আলাদা রাখার এই ঝিল্লি সমতল বা চ্যাপ্টা হয়ে যায়। যে কারণে পেটে থাকা স্বাভাবিক মাত্রার গ্যাসও চাপ সৃষ্টি করে।”
এই অস্বাভাবিক আচরণ যেসব মানুষের স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল তাদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দেয়, বিশেষ করে যাদের ‘ইরিটেইবল বাওল সিন্ড্রম’ রয়েছে।
এই অবস্থায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর এবং অতিরিক্ত গ্যাস বা বাতাস গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায়।
খাবারের প্রতি নজর দেওয়া
যদি বার বার পোটফোলা বা গ্যাসের সমস্যায় ভোগা হয়, তবে সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খাবারের কারণে হতে পারে। কী খাওয়া হচ্ছে সেটা বিষয় না, বরং খাবার পেয়ে দেহ কী প্রতিক্রিয়া করছে সেটাই আসল।
ডা. কায়ল ব্যাখ্যা করেন, “অনেকে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর চিনি হজম করতে পারেন না। যাকে বলা হয় (ফার্মেন্টেইবল অলিগোসাকারাইজড, ডাইসারাইজড, মোনোসাকারাইজডস এবং পলিওলস), সংক্ষেপে ‘এফওডিএমএপিএস’।
উচ্চমাত্রায় ‘এফওডিএমএপিএস’ আছে এরকম খাবার হল- গম, রাই, পেঁয়াজ, রসুন, মটর, ডাল, বীজ, মধু, পেস্তাবাদাম, কাজুবাদাম, কিছু ফল, অ্যাসপারাগাস এবং কপিধর্মী সবজি।
এছাড়া ফ্রুকটোজ ব্যবহার করা ও কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় এবং খাবারেও ‘এফওডিএমএপিএস’ থাকে।
ডা. কায়ল বলন, “এই চিনি সহজে হজম হয় না, ফলে অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়ার সাথে মিলে গাঁজন প্রক্রিয়াতে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি করে।”
আরেক ধরনের ‘এফওডিএমএপিএস’ হল দুগ্ধজাত খাবারে থাকার ‘ল্যাক্টোস’, যা অনেকেই হজম করতে পারেন না।
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারও পোটফোলা-ভাব তৈরি করে। কারণ চর্বি ধীরে হজম হয়। আর অতিরিক্ত পেটফোলার সমস্যা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য, মল অতিরিক্ত শক্ত হওয়া, পেট পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া বা মলত্যাগে পরিপূর্ণতা না আসার মতো ব্যাপার ঘটে।
পেটফোলা-ভাব যখন বিরক্তির চেয়েও বেশি
যদি ঘনঘন পেটফোলা-ভাব দেখা দেয় তবে হজম প্রক্রিয়াতে নানান সমস্যা থাকতে পারে। যেমন-
ইরিটেবল বাওল সিন্ড্রম (আইবিএস): এই সমস্যা থাকলে পেটফোলার সমস্যার সাথে ব্যথা, টান পড়া এবং অনিয়মিত মলত্যাগ হয়।
ইনফ্লামাটোরি বাওল ডিজিজ (আইবিডি): ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস (মলনালী ও মলদ্বারে প্রদাহ) এবং ‘ক্রোন’স ডিজিজ’ (হজম নালীর যে কোনো জায়গায়, বিশেষ করে ক্ষুদ্রান্ত্রে বা বৃহদান্ত্রে প্রদাহ)। এই দুই রোগ হজম প্রণালীর দেয়ালে প্রদাহ তৈরি করে।
সিলিয়াক রোগ: এটা ‘অটোইমিউন’ রোগ, যেখানে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষুদ্রান্ত্রকে আক্রান্ত করে। গম, বার্লি এবং রাইতে থাকা প্রোটিন ‘গ্লুটেন’, এই আক্রমণকে উস্কিয়ে দেয়।
বিরল ক্ষেত্রে পেটফোলা-ভাব হতে পারে- কোলন (মলাশয়), স্টমাক (পাকস্থলী) বা প্যানক্রিয়াস (অগ্নাশয়) ক্যান্সারের লক্ষণ।
তাই ঘনঘন পেটফোলা সমস্যা সঙ্গে ব্যথা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্না হওয়ার পরামর্শ দেন ডা. কায়ল।
পেটফোলার সমস্যা দূর করতে
যেহেতু সমস্যার প্রধানে থাকে খাদ্যাভ্যাস, তাই খাবারের দিকে নজর দিতে বলেন, ডা. কায়ল।
তার কথায় “দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রেই এর সুফল দেখা গেছে। এরপরও সমস্যা না কমলে ‘এফওডিএমএপিএস’ যুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে বা কমাতে হবে।”
“যদি নিজে বোঝা সম্ভব না হয় কোন খাবার সমস্যা করছে, তাহলে একজন খাদ্য-বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি সমস্যা চিহ্নিত করে খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করে দিতে পারবেন”- বলেন এই চিকিৎসক।
এছাড়া কার্বোনেইটেড পানীয় এবং অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাসও ত্যাগ করতে হবে।
ডা. কায়ল বলেন, “যখন দ্রুত বা বেশি খাওয়া হয় বা খাওয়ার সময় অতিরিক্ত কথা বললে বেশি বাতাস গিলে ফেলার সম্ভাবনা বাড়ে। যা থেকে পেটফোলার সমস্যা হয়। এ কারণে মনোযোগ দিয়ে খেতে হবে।”
আরও পড়ুন
গ্যাসের সমস্যা সমাধানে ৫ খাবার
যে কারণে সালাদ খেলে পেট ফোলাভাব হয়
অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার পর যা খাওয়া যাবে না