পথের আলাপন: পর্ব ৫
Published : 20 Jun 2026, 10:25 AM
ফিফা বিশ্বকাপ চলছে। নানা আয়োজন চলছে প্রায় সবখানে। পাড়ায় পাড়ায় পতাকা টাঙানোর হিড়িক। কোনোটি উঁচু দালান থেকে লম্বালম্বি নামিয়ে দেওয়া, কোনোটি দুই দালানের মাঝে আড়াআড়িভাবে টাঙানো।
অনেকেই গোটা পাড়াতেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। যেন অন্য কোনো দেশের ঠাঁই নেই সেখানে। সবাইকে জানান দিচ্ছে তারাই সেরা। পতাকা উড়ছে বাড়ির ছাদে, বারান্দাতে, গাড়িতে, মোটরসাইকেলে, রিকশা ও অটোরিকশায়।
নিজের দেশের না উড়িয়েই সবখানেই উড়ছে ভিনদেশি সব পতাকা। এ যেন বাঙালির উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বকাপ নিয়ে আদিবাসীরা কী ভাবছে? তা জানতেই পায়ের ছাপ ফেলি দিনাজপুরের প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলোতে।
লোহাডাঙায় তুরি গ্রামটির মাহাতো লবানু শিং। বয়স ৭০-এর ওপর। একসময়কার ফুটবল খেলোয়াড় তিনি। একবার লোহাডাঙার সঙ্গে খেলা হয়েছিল পাশের মুরাদপুরের তুরি আদিবাসীদের। লবানুরা ২ গোলে জিতে সে ম্যাচটিতে। একটি গোল করে লবানু নিজেই। ‘ফুটবল’ ইংরেজি নাম হওয়ায় এ নামটির সঙ্গে তুরিরা তত বেশি পরিচিত নন। ফুটবলকে এরা জানে ‘বল খেলা’ হিসেবে।
একসময়কার নামকরা খেলোয়াড় হলেও লবানুর বয়সি আদিবাসীরা বিশ্বকাপ সম্পর্কে খুব কমই জানে। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। টেলিভিশন নেই, তাই খেলাও দেখতে পারে না তারা। লবানু বলতে পারে না বিশ্বকাপে প্রিয় দেশের নাম।
বারান্দায় বসা ছিল তার ছেলে কাজল শিং। খেলার কথা শুনতেই সে এগিয়ে আসে। মুচকি হেসে জানায় বিশ্বকাপে তার প্রিয় দল ‘আর্জেন্টিনা’। শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে না পারলেও জানে মেসির নামটিও।
বাড়ির ভেতর উঁচু করে তৈরি করা ছোট্ট একটি জায়গা। পাশেই সন্ধ্যাতারা ফুলগাছ। এটি তুরিদের ‘তুলসী থান’ বা ‘প্রার্থনার স্থান’। প্রিয় দলের জন্য সেখানে রঙিন জার্সি পরে ভক্তি দিচ্ছে গোত্রের সবানু শিং। নকুল শিং, পলাশ শিং ও কাজল শিংসহ যুবক বয়সিরা বিশ্বকাপ খেলা দেখে রতন শিংয়ের বাড়িতেই। জায়গা না পেলে কেউ কেউ আবার চলে যায় বাজারের দিকে।
অন্য দেশের নাম না জানলেও বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের নাম প্রায় সবার মুখে মুখে। আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে একমাত্র রতন শিংয়ের বাড়িতেই টেলিভিশন আছে। তাই খেলা দেখতে সবাই ভিড় জমায় তার বাড়িতে। খেলার কারণে এসময়ে রতনের মান-সম্মানও যায় বেড়ে। খেলা দেখার সুযোগ পেতে সবাই তাকে খাতির করে।

কথা হয় এ গ্রামের খেলাপাগল কয়েকজন আদিবাসী যুবকের সঙ্গে। অভাবের কারণে নিজ পছন্দের দলটির পতাকা কিনতে পারেনি তারা। তা নিয়ে তাদের বেশ মন খারাপ। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে উৎসাহের কমতি নেই। শকিন্ত শিং তুরি ভাষায় বলে, “আর্জেনটিন যুদি জিতেএ, তালে খুব আনন্দ কেরবে, হাড়িয়া খাবে।”
নয়ন শিং বলে, “মেসি বালাক খেলেল পারছে।” পাশ থেকে রাজন শিং চেঁচিয়ে ওঠে, “বাজিল জিতেবেএ।” গোত্রের পলাশ শিং বিশ্বকাপে কোন দলকে সাপোর্ট করবে তা এখনও স্থির করতে পারেনি। মেক্সিকো ও ব্রাজিলের খেলা তার কাছে ভালো না লাগায়, আপাতত সে আর্জেন্টিনার ভক্ত। বিশ্বকাপ ফাইনালে কোন দল জিতবে? এ রকম প্রশ্নের উত্তরে আদিবাসী তুরিদের মাঝে হট্টগোল বাধে। হয়তো এটিই বিশ্বকাপের মূল আনন্দ।
লোহাডাঙার পরে চলে আসি হালজায় গ্রামে। কড়া আদিবাসীদের বাস এখানে। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে নেই তেমন উত্তাপ। বাংলাদেশে টিকে থাকা কড়াদের একমাত্র গ্রাম এটি। টিকে আছে মাত্র বিশের অধিক পরিবার। এ আদিবাসীদের অনেকেই অন্যের জমিতে কাজ করে। কেউ কেউ আবার ভ্যান চালিয়ে যা আয় করে তা দিয়েই কোনো রকমে চালিয়ে নেয় সংসার।
টেলিভিশনে রাত জেগে বিশ্বকাপ খেলা দেখে কৃষ্ণ কড়া, ওদো কড়া, কামান কড়া ও কাইচাল কড়া। প্রায় অধিকাংশেরই পছন্দের দল ব্রাজিল। পতাকা নেই কেন? প্রশ্ন করতেই কৃষ্ণ কড়ার জবাব, “টাকা নেই, তাই পতাকা নেই।”
কড়াদের এই গ্রামেই রয়েছে একটি ফুটবল দল। দলটির রয়েছে বেশ নামডাক। এ নিয়ে কথা বলেন গোত্রপ্রধান জগেন কড়া। বলেন, “বল খেলাল জেবে আজ হামনে টিম হে।” বিশ্বকাপে কোন কোন দেশ অংশ নিচ্ছে তা জানা নেই গোত্রের কিনা কড়ার। কোন দল জিতবে এমন প্রশ্নে সে চিন্তিত, কী উত্তর দেবে ভেবেই যেন পাচ্ছে না। হঠাৎ বলে ওঠে, “ভারত জিতবে।” উত্তর শুনে চারপাশে হাসির রোল ওঠে।
কড়াদের গ্রামকে বিদায় জানিয়ে হাজির হই বহবলদিঘীতে। এখানকার ওঁরাও পাড়ার নিপেন টিগ্গা; বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনেক দেশেরই নাম জানে সে। ১৯৮০ সালে দিনাজপুর স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার। তার মতে, ফুটবল সবার জন্য উপভোগ্য একটি খেলা। যারা দেখে তারা যেমন সহজে বোঝে, যারা খেলে তাদের জন্যও সহজ। কোন দলের খেলা পছন্দ? প্রশ্ন করতেই পাশ থেকে ভিম লাকড়ার উত্তর, “সবে আর্জেন্টিনা।”
নিপেন জানালো এ গ্রামে তাদেরও একটি শক্তিশালী ফুটবল টিম রয়েছে। ‘টিনপাড়া ফুটবল টিম’ বললেই সবাই একনামে চেনে। ফুটবল নিয়ে গোত্রের মহত বলেন, “এমা খাদদার বল ভাল বেজ নার।” অর্থাৎ, আমাদের ছেলেরা ফুটবল ভালো খেলে। ওঁরাও যুবকেরা সারাদিন কাজ করে। সন্ধ্যা হতেই অপেক্ষায় থাকে টিভিতে খেলা দেখতে।

মহেশপুর গ্রামের সাঁওতালরা অন্য জাতির তুলনায় বেশ অগ্রসর। বিশেষ করে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়েছেন। তাদের অনেকের বাড়িতেই রয়েছে টেলিভিশন। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে কথা হয় গোত্রের মাহাতো শাহ বাছকির সঙ্গে। তিনি বলেন, “বল এনেক এটি মজ, হর ডি মছকো এনেক দাড়িয়া।” অর্থাৎ, ফুটবল খেলা আমাদের খুবই পছন্দের, সাঁওতালরা ভালো বল খেলে।
অন্য কোনো দেশের নাম বলতে না পারলেও এ গ্রামের সাঁওতালরা হরহর করে বলে দেয় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নাম। সাঁওতালি তরুণদের মুখে মুখেও মেসির নাম। গোত্রের দালু সরেনের মতে নামের উচ্চারণ সহজ হওয়াতেই মেসি এখানে বেশ জনপ্রিয়। আবার মুগলী মুরমুর মতো ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার কাকাকে ‘কারকা’ নামে মনে রেখেছে।
বাছকি জানায়, বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন গোটা গ্রামে চলবে আনন্দ-উল্লাস, চলবে হাড়িয়া খাওয়া। পিপল্লা গ্রামের ভুনজার আর কাশিডাঙ্গা গ্রামের মুশহর আদিবাসীরাও পিছিয়ে নেই বিশ্বকাপ খেলা দেখায়। শহরের নিকটবর্তী গ্রাম হওয়াতে এখানকার আদিবাসী গ্রামেও উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার ছোট্ট ছোট্ট পতাকা। চাঁদা দিয়ে পতাকা কিনেছে ভুনজার আর মুশহর যুবকেরা। একইভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালের আনন্দ উদযাপনের।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার স্থানীয় বাঙালিরা জানায়, এ অঞ্চলে ভালো ফুটবল খেলোয়াড়দের তালিকায় আদিবাসীদের নামই শীর্ষে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় টিনপাড়া ফুটবল দলটির সফলতার কথা। সঠিক দিকনির্দেশনা আর সহযোগিতা পেলে আদিবাসীদের মধ্য থেকেও উঠে আসতে পারে দেশের প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড়।
এ অঞ্চলের আদিবাসীরা পিছিয়ে নেই বিশ্বকাপ খেলা দেখায়। প্রযুক্তির কল্যাণে তির-ধনুকের মানুষদের দৃষ্টিও আজ ফুটবল বিশ্বকাপের দিকে। রাতভর খেলা দেখা আর দিনের বেলায় প্রীতি ফুটবল ম্যাচেরও আয়োজন চলছে আদিবাসী গ্রামগুলোতে। তাদের মুখেও উচ্চারিত হচ্ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নাম। তাদের ভালো লাগা শুধুই ফুটবলে।