সকালের নাস্তা করার সেরা সময়
ঘুম থেকে উঠে যত দেরিতে নাস্তা করা হবে ততই বাড়তে পারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
মনে হতে পারে সকালের নাস্তা-তো সকালেই করতে হয়; এর আবার সেরা সময় কী?
তবে সারাদিনের এই গুরুত্বপূর্ণ খাবার কখন গ্রহণ করছেন সেটিও শরীরের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে— নাস্তা দেরিতে করলে শুধু হজমেই নয় বরং আয়ুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, সকালে কখন খাবার খাচ্ছেন, সেটি শরীরের ‘সার্কাডিয়ান ক্লক’ বা ‘জৈব ঘড়ি’র ছন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
গবেষণার ফলাফল যা বলছে
‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়- সকালে দেরি করে নাস্তা করা বয়স্কদের মৃত্যুহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা সকালে দেরি করে খেতে শুরু করতেন, তাদের ১০ বছরের বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৬.৭ শতাংশ। অন্যদিকে যারা তুলনামূলকভাবে আগে নাস্তা করতেন, তাদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৯.৫ শতাংশ।
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যে পরিচালিত হয়। আর এতে প্রায় তিন হাজার বয়স্ক মানুষকে ১৯৮৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ফলাফল থেকে দেখা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সাধারণত নাস্তা ও রাতের খাবার দেরিতে খেতে শুরু করেন।
‘ক্রোনোনিউট্রিশন’ বা খাবারের সময়বিজ্ঞান
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলেন, “খাবারের সময় নির্ধারণ বা ‘ক্রোনোনিউট্রিশন’ দেহের বিপাকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেরিতে খাবার খাওয়া মানেই দেহের বিপাক ধীর হয়ে যাওয়া- যা স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।"
গবেষকরা দেখেছেন, অংশগ্রহণকারীদের গড়ে ঘুম থেকে ওঠার ৩১ মিনিট পর নাস্তা শুরু করার প্রবণতা ছিল। অর্থাৎ গড়ে সকাল ৮টা ২২ মিনিটে তারা নাস্তা করতেন।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাস্তা দেরিতে শুরু করার হারও বেড়েছে।
শরীরের ‘জৈব ঘড়ি’ ও নাস্তার সময়
শরীরের নিজস্ব এক ঘড়ি আছে, যার আছে নিজস্ব ছন্দ। যাকে বলা হয় ‘সার্কাডিয়ান ক্লক’। এই ঘড়ি জানে কখন জেগে থাকা, কখন ঘুমানো, কখন খাওয়া উচিত। নাস্তা করার সময় এই ঘড়িকে সক্রিয় রাখে।
খাবারের সময়কে শরীরের ঘড়ির সঙ্গে সমন্বয় করে রাখলে শরীর ভালোভাবে কাজ করে, হজম ও শক্তি উৎপাদনও সঠিকভাবে হয়।
তবে নাস্তা দেরিতে করা হলে, এই ছন্দ ব্যাহত হয়। ফলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিপাকের গতি কমে যায়।
গবেষকরা মনে করেন, সকালে তাড়াতাড়ি নাস্তা করা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে, যাদের দৈনন্দিন রুটিন ও সামাজিক সংযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
নাস্তার সময় শরীরের বিপাকে যেভাবে প্রভাব ফেলে
খাবারের সময় শুধু অভ্যাস নয়, এটি শরীরের ভেতরে এক ধরনের সংকেতও দেয়।
সকালে নাস্তা করলে শরীর বুঝতে পারে— দিন শুরু হয়েছে, এখন শক্তি উৎপাদনের সময়। দেরিতে নাস্তা করলে এই প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু হয়। যার প্রভাব পড়ে সারা দিনের শক্তি ব্যয়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সকালে দেরিতে নাস্তা করেন বা দুপুর পর্যন্ত কিছু খান না, তাদের দেহে ইন্সুলিন প্রতিরোধ বেড়ে যায়।
এতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে না, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
তাছাড়া দেরিতে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে শরীরের এমবিআই (দেহভর সূচক) বেড়ে যায়, অর্থাৎ স্থূলতার আশঙ্কা বাড়ে।
এই অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, কোলেস্টেরল সমস্যা ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি দেখা দেয়।
সকালে নাস্তা আগে করার উপকারিতা
বিপাক ক্রিয়া সক্রিয় হয়: সকালে শরীর দ্রুত শক্তি পায়, ফলে সারা দিন ক্লান্তি কম লাগে।
রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে: আগে নাস্তা করলে ইন্সুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে।
মনোযোগ ও মেজাজ উন্নত হয়: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সময়মতো নাস্তা করেন, তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা বেশি থাকে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে: আগে নাস্তা করলে শরীরের ক্যালোরি পোড়ার হার বাড়ে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
দেরি করে নাস্তা করার ঝুঁকি
দেরিতে নাস্তা করলে শুধু হজমের সমস্যা হয় না, বরং শরীরের ‘ছন্দ’ বিভ্রান্ত হয়। শরীর তখন দিন ও রাতের সময় সঠিকভাবে আলাদা করতে পারে না, ফলে ঘুমের মানও খারাপ হয়।
যারা রাতে দেরি করে খান বা সকালে নাস্তা এড়িয়ে যান, তাদের মধ্যে হজমে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও অনিদ্রার মতো সমস্যা বেশি দেখা যায়।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সময়ের অমিল আরও বেশি ক্ষতিকর হয়। কারণ বয়স্কদের ‘সার্কাডিয়ান ঘড়ি’ স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সময় ঠিক রাখার সহজ উপায়
আরও পড়ুন
