‘ক্লাসে কেবল একজনকে ফার্স্ট বানানো রং আইডিয়া’

‘কিডজ’ এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব-কৈশোরের গল্প শুনিয়েছেন ভাবনা।

কিডজ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 July 2023, 09:56 AM
Updated : 20 July 2023, 09:56 AM

আশনা হাবিব ভাবনা এই সময়ের একজন অভিনেত্রী, ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী ও লেখক। ছবি এঁকেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। ভাবনার অভিনীত কিছু নাটক- ‘প্রতিদিন শনিবার’, ‘বুবুনের বাসর রাত’, ‘রসলুনবাঈ’, ‘নির্বাসন’ ইত্যাদি; চলচ্চিত্র- ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ ও ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’, ওয়েব ফিল্ম: ‘আলী বাবা ও চালিচার’, ‘মুখ আসমান’। প্রকাশিত বই- উপন্যাস: ‘গুলনেহার’, ‘তারা’, ‘গোলাপী জমিন’, কবিতা: ‘রাস্তার ধারে গাছটার কোন ধর্ম ছিল না’ ও ‘ডানপন্থী কবিতারা’। ‘কিডজ’ এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব-কৈশোরের গল্প শুনিয়েছেন ভাবনা।

আপনার শৈশব কোথায় কীভাবে কেটেছে?

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। আব্বার আত্মীয়-স্বজনরা সবাই ধানমণ্ডিতে আর মায়ের আত্মীয়-স্বজনরা সবাই পুরান ঢাকায় থাকেন। তবে মায়ের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেই বড় হয়েছি। ৩ বছর বয়সে বুলবুল একাডেমিতে নাচে ভর্তি হই। ওটাকেই আমি স্কুল ভাবতাম। পরে রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হই। স্কুল থেকে এসে আরবি টিচারের কাছে পড়তাম। পেইন্টিং আর বাস্কেটবল শিখতাম।

স্কুল জীবনের মজার কোন ঘটনা যা এখনও মনে পড়ে?

একবার স্কুলের স্পোর্টস ডে, আমি ছিলাম ইয়েলো বার্ড। অনুষ্ঠানের দিন স্কুলে গিয়েছি, কিন্তু আমার ড্রেস তখনও টেইলার্স থেকে আসেনি। গেইটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছি, সবাই ভেতরে চলে গেছে। মশাল দৌড় শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমার আম্মু-আব্বু এখনও আসেনি ড্রেস নিয়ে। ড্রেস ছাড়া তো আর ঢুকতে দেবে না। আমাদের স্পোর্টস টিচার কালিদাস স্যার এটা দেখে আমাকে কোলে করে নিয়ে লাইনে দাঁড় করালেন। ততক্ষণে ইয়েলো ড্রেস চলে এসেছে। এ কথাটা আমার সবসময় মনে পড়ে।

আরেকটা স্মৃতি হচ্ছে নাচের এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারা। তখন সেভেন-এইটে পড়ি। আমি সেজে বসে আছি। আম্মু বললো যে, আগে আগে যাবো না, গিয়ে বসে থাকতে হয়। কিন্তু আমরা যখন ঢুকলাম তখন স্টেজে আমার পারফরম্যান্স চলছে। আমার সঙ্গে কেউ কথা বললো না। খুব লজ্জা পেলাম।

প্রিয় কোন শিক্ষক যার ক্লাস করতে ইচ্ছে করে এখনও?

বাংলা-ইংরেজি শিক্ষকদের ভালো লাগতো আমার। কিন্তু গণিত শিক্ষকদের ভালো লাগতো না, কড়া ছিল খুব, ভয় পেতাম। মাহবুবা ফেরদৌস ম্যাডামকে মনে পড়ে, বাংলা পড়াতেন। একবার ভ্যালেন্টাইন’স ডেতে আমি ম্যাডামকে গিফট করেছিলোম, ছবিটবি এঁকে। ছোট্টবেলার সেসব লেখা ও আঁকা ম্যাডাম এখনও রেখে দিয়েছেন।

আপনার বাবা হাবিবুল ইসলাম হাবিব একজন নাট্যনির্মাতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক। শৈশবে কেউ যখন বাবার পেশা জিজ্ঞেস করতো তখন কী বলতেন?

আমি দেখতাম আব্বু শুটিং-এ যেতো, আবার শুটিং থেকে আসতো। আমি ভাবতাম যে আমার ক্লাসমেটদের সবার বাবা-ই হয়তো শুটিং করে। জিজ্ঞেস করতাম, এই তোমার আব্বা কোন শুটিং-এ গেছে? তোমার আব্বুর আজ শুটিং কোথায়? বন্ধুরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতো, বুঝতে পারতো না। বলতো, বাবা চাকরি করে। আব্বু আমাকে বলেছিল, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বাবা কী করে, তুমি বলবা বিজনেসম্যান। মাই ফাদার ইজ অ্যা বিজনেসম্যান। কিন্তু ‘বিজনেসম্যান’ বানান আমার এত ভুল হতো! তাই আমি সবসময় লিখতাম- মাই ফাদার ইজ অ্যা ফার্মার। এখন, বানান যদি আপনার কারেক্ট থাকে তাহলে নাম্বার দিতে হবে। বানান তো কারেক্ট, আমি নাম্বার পেতাম। শনিবারে প্যারেন্টস’ ডে থাকতো, যাওয়ার পর খাতা দেখানো হতো- ওইসময় আপনার বাচ্চা কী কী করেছে ইত্যাদি। তো আব্বু একবার প্যারেন্টস’ ডেতে যাওয়ার পর বললেন, মা তুমি কী লিখেছো? আমি তো ফার্মার নই, তুমি ফার্মার কেন লিখেছো!

আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?

আব্বু শুটিং থেকে ফিরে জানতে চাইতো সারাদিন কী করেছি। আমি বলতে শুরু করতাম এটা করেছি ওটা করেছি। আব্বু বলতো, লিখে এনে দেখাও। আমি তখন লিখে দেখাতাম। প্রতিদিন প্রস্তুতি নিতাম, বসে ভাবতাম আজ কী লিখবো! আমার মনে হয় এখান থেকে আমার লেখালেখি শুরু। আব্বু বলতো, গল্প লিখবা। এই মাসে ফ্রাইডেতে একটা গল্প লিখে দেখাবা তোমরা দুই বোন। আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতাম। আর আমার ছোটবোন সবসময় কমিক্স দেখে লিখতো, উপরে নাম চেঞ্জ করে দিত। এরকম করে একদিন ধরাও খেয়েছে। আব্বু বলে দিয়েছে, এটা করলে হবে না। তারপর স্কুল ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করলাম। সেখানে কম্পিটিশন হতো, যাদের কবিতা ভালো হবে তাদেরটাই ছাপা হতো। আমার লেখা সিলেক্টেড হতো আরকি।

আপনার প্রথম উপন্যাস ‘গুলনেহার’, এই গুলনেহার আসলে কে?

গুলনেহার আমার নানুর নাম। নানুর সঙ্গেই আমার মাখামাখি ছিল বেশি, যেহেতু ওখানেই বেড়ে উঠেছি। নানু ছিলেন ধনী পরিবারের মেয়ে। তার কাছে সব সমস্যার সমাধান হতো। আমি আর নানু একসঙ্গে ঘুমাতাম। তার গায়ের একটা গন্ধ আছে, এটা আমি এখনও টের পাই। আমার হাত আর নানুর হাত একসঙ্গে রাখতাম, বলতাম যে নানু তোমার হাতটা অনেক সুন্দর। নানু বলতো, না, তোমার হাত সুন্দর। আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি! নানু খুব পরিচ্ছন্ন ছিলেন। কমলার কোয়াও ছিলতে হবে নিখুঁত করে, তারপর সুন্দর করে রাখতে হবে, তাহলেই তিনি খাবেন। নানা ইয়া বড় বড় গরু কোরবানি দিতেন। সে গরু দেখতে ভিড় লেগে যেত। নানুর অনেক গুণ। তার নিজের হাতে তৈরি জায়নামাজ যেন কোন শিল্পকর্ম। আমার ছবি আঁকা কিংবা কবিতা লেখার পেছনে এটা একটা অনুপ্রেরণা। নানু ছিলেন মারফতি ধারার। আমার মালিকের সঙ্গে আমার সংযোগ, আমার আল্লাহর সঙ্গে আমার সংযোগ। এইসব নানু আমাকে পরিচয় করিয়েছেন। তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার জিকির করতেন। এক-দুইশ মানুষ তার বাসায় আসতো। ল্যাটকা খিচুড়ি আর ঝোলা গরুর মাংস খাওয়া হতো। নানু তার নাতিদের নিয়ে খাটে বসে রাজা-বাদশার মতো খেতেন।

আপনার ‘তারা’ উপন্যাসের মূল চরিত্র তারা নামে এক কিশোরী, কল্যাণপুর গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। আবার ‘গোলাপী জমিন’ উপন্যাসের মূল চরিত্র আরেক কিশোরী প্রিয়াঙ্কা, স্কুলের গণ্ডি পার না হতেই তার বিয়ে হয়ে যায়। দুজনই সংগ্রামী চরিত্র।

আমি কিশোরীদের কথা লিখতে চাই। একটা মেসেজ দিতে চাই। একটা মেয়ের যখন পিরিয়ড হয় তখন পরিবারের ভূমিকা কী, বাবা যখন মাকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করেন তখন করণীয় কী- এসব দেখাতে চেয়েছি ‘তারা’ উপন্যাসে। ‘গোলাপী জমিন’ উপন্যাসে আমি দেখাতে চেয়েছি ‘বাল্যবিবাহ’-এর কুফল। বয়সে বড় প্রবাসীর সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার বিয়ে দিয়ে মা-বাবা মূলত মানবপাচারের মতোই ভুল করেন। সেখান থেকে ফিরে আসতে একটা মেয়ের যে কী লড়াই করতে হয় তা-ই দেখানোর চেষ্টা করেছি।

আজকাল মা-বাবারা সাধারণত সন্তানদের কেবল পড়াশোনা করাতে চান, সন্তান বড় চাকরিজীবী হবে এ স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আপনি হয়েছেন অভিনেত্রী। একইসঙ্গে নাচেন, কবিতা লিখেন এবং ছবি আঁকেন।

ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিলো ড্যান্সার হবো, না হয় আর্টিস্ট হবো। আমার মনে হয়, অনেকগুলো বছর আমরা ভুল শিক্ষায় কাটিয়ে দিই। অনেক সময় আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মা-বাবা আসলে ভুল জায়গায় ইন্সপায়ার করে। জিপিএ-ফাইভ পেতেই হবে, পরীক্ষায় ফার্স্ট হতেই হবে- এসব বলে মা-বাবারা সন্তানদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দেন। আমাদের স্কুলগুলোতে দেখা যায়- যারা ফেল করছে তাদেরকে ক্লাসে দাঁড় করানো হয়। অষ্টম শ্রেণিতে আমি একবার গণিতে ফেল করেছিলাম। আমার জন্য সেটা আরও অপমানজনক ছিল। আমি তো নাচের স্কুলে থাকতাম, নাচই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। যে সারাদিন নাচের স্কুলে থাকে সেতো ফেলই করবে, তাই না! অথচ সেই আমিই কিছুদিন আগে আমার স্কুলে একটা নাচের প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, এটা অনেক বড় প্রাপ্তি।

ছোটবেলা থেকেই আমি যখন অভিনয় শুরু করি তখন আমার আত্মীয়-স্বজনরা ভাবতো যে- সে তো নায়িকা, কোনদিন পড়াশোনা শেষ করতে পারবে না! কেবল সামাজিক চাপ মেটাতেই আমি লন্ডনে গিয়ে নিজের খরচে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করে এসেছি।

যদি কখনও শিক্ষামন্ত্রী হন, কী করতে চান?

পঞ্চাশ-ষাটজনের একটা ক্লাসে কেবল একজনকে ফার্স্ট বানানো রং আইডিয়া। আমি যদি কোন সময় শিক্ষামন্ত্রী হই তখন একটা আইন করতে চাই যে কে কত নাম্বার পেয়েছে এটা কেউ জানবে না, এটা শুধু শিক্ষক আর মা-বাবা জানবে। তারা সিদ্ধান্ত নেবে, সন্তানের কোন বিষয়ে দুর্বলতা আছে, সেটা তাকে ভালো করে পড়ানো। সন্তান যে বিষয় পছন্দ করে সে বিষয়ে পড়তে পারবে, কেউ কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না।

[লেখাটি কিডজ ঈদ সংখ্যা ২০২৩ এর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত]