Published : 19 Apr 2026, 03:09 PM
কাঠমান্ডুর ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটলে একটা সুবাস আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করবেই। সেটা হলো ধোঁয়া ওঠা গরম গরম মোমোর সুবাস। নেপালি খাবারের কথা উঠলে প্রথমেই যে নামটা মাথায় আসে, তা হলো মোমো। ময়দার পাতলা আবরণে মোড়ানো কিমা করা মাংস, সবজি আর সুগন্ধি মশলার এক জাদুকরী মিশ্রণ।
সাধারণত ভাপে তৈরি হলেও একে কড়াইয়ে ভেজে (প্যান-ফ্রাইড) বা ডুবো তেলেও (ডিপ-ফ্রাইড) পরিবেশন করা হয়। আর সঙ্গে যদি থাকে ঝাল টমেটোর চাটনি বা আচার, তবে তো সোনায় সোহাগা!
মোমোর সঠিক জন্ম ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর শিকড় যে তিব্বতি বাণিজ্যের সঙ্গে মিশে আছে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই বললেই চলে। প্রাচীনকালে কাঠমান্ডু উপত্যকার আদি বাসিন্দা 'নেওয়ার' সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা তিব্বতের লাসার সঙ্গে বাণিজ্য করতেন। ধারণা করা হয়, এই ব্যবসায়ীদের হাত ধরেই হিমালয় পেরিয়ে এই বিশেষ ডাম্পলিং নেপালে প্রবেশ করে।
কলকাতার বিখ্যাত শেফ এবং ‘মোমো কুইন’ হিসেবে পরিচিত ডোমা ওয়াং স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “নেপালি ব্যবসায়ীরা তিব্বত থেকে ফেরার সময় এই খাবারের ধারণা সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাতে নিজেদের মতো স্বাদ যোগ করেন। তিব্বতি মোমোতে মূলত আদার প্রাধান্য থাকে, কিন্তু নেপালি সংস্কৃতির ছোঁয়ায় এতে যোগ হয়েছে হরেক রকম মশলা।”
খাদ্য ইতিহাসবিদ বিন্তি গুরুংয়ের মতে, মোমোর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক গল্প আছে। কেউ কেউ একে তিব্বতি অভিবাসীদের অবদান মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন এটি সম্পূর্ণভাবেই নেওয়ারি ব্যবসায়ীদের আবিষ্কার। তবে লিখিত কোনো দলিল না থাকলেও মৌখিক ইতিহাস আর বাণিজ্যিক স্মৃতিতেই বেঁচে আছে মোমোর আদি কথা।
নেপালের লিচ্ছবি বংশের (৪০০-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) শাসনামলকে বলা হয় ‘স্বর্ণযুগ’। সেই সময় থেকেই তিব্বতের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুঙ্গে ছিল। শেফ বিনোদ বারাল, যিনি বিশ্বজুড়ে নেপালি খাবারের দূত হিসেবে কাজ করছেন, তিনি মনে করেন- মোমোর কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন নেই। এটি মূলত সামাজিক মেলামেশা আর সংস্কৃতির বিনিময়ের ফসল। ষাটের দশকে তিব্বত সীমান্ত বন্ধ হওয়ার আগেই মোমো হিমালয়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল।
বিনোদ বারাল এখন লন্ডনে থাকলেও তার মন পড়ে থাকে নেপালের সেই ছোট্ট মোমোর দোকানে। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ বা ফর্মুলা ওয়ানের মতো বড় বড় আসরে ক্যাটারিং সামলানো এই শেফ আজও মনে করেন, হরেক রকম আধুনিক ফিউশন মোমো (ভেগান বা লবস্টার মোমো) থাকলেও সাধারণ স্টিমড চিকেন মোমোর কোনো তুলনা হয় না।
মোমো তৈরির পদ্ধতিটা যেন একটা শৈল্পিক কাজ। ময়দা আর জল দিয়ে মাখা পাতলা লেচির ভেতরে এক চামচ পুর দিয়ে নিপুণ হাতে কুচি দিয়ে বন্ধ করা হয় এর মুখ। ডোমা ওয়াংয়ের পরামর্শ হলো, মোমোর স্বাদ বাড়াতে মাংসের কিমায় কিছুটা চর্বি এবং পেঁয়াজের সঠিক অনুপাত থাকা জরুরি। আর নিরামিষাশীদের জন্য সবজির সঙ্গে মাখনের ব্যবহার মোমোকে করে তোলে রসালো।
মোমোর গড়নেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কেউ একে গোল পুটলির মতো বানান, কেউ আবার বাঁকা চাঁদের মতো অর্ধচন্দ্রাকৃতি। এরপর মিনিট ১৫ ভাপে দিলেই তৈরি গরম গরম মোমো।
নেপালে মোমো মানেই আড্ডা। এটি কেবল দুপুরের লাঞ্চ বা বিকেলের নাস্তা নয়, যেন উৎসবের নাম। কাঠমান্ডুর অলিতে-গলিতে যেমন মোমো পাওয়া যায়, তেমনি বড় বড় রেস্তোরাঁতেও এর জয়জয়কার। বিন্তি গুরুংয়ের মতে, হিমালয় সংলগ্ন সংস্কৃতিতে একে অপরকে সাহায্য করার যে প্রথা রয়েছে, মোমো তৈরি তারই এক অনন্য উদাহরণ।
ডোমা ওয়াং স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় প্রতি রোববার আমরা পরিবার আর বন্ধুরা মিলে মোমো বানাতে বসতাম। কেউ লেচি কাটছে, কেউ পুর ভরছে, আর সেইসঙ্গে চলছে জম্পেশ আড্ডা আর হাসাহাসি। মোমো কেবল পেট ভরায় না, এটি মানুষের মনকেও জুড়ে দেয়।”
শৈশবের স্মৃতি হাতড়ালে দেখা যায়, বাড়ির ছোটরা ময়দার তাল নিয়ে খেলছে আর বড়রা দ্রুত হাতে মোমো মুড়ছে, এই দৃশ্য নেপালি বা হিমালয় সংলগ্ন প্রতিটি বাড়ির চেনা ছবি। আজ মোমো কেবল নেপালের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন এক প্রিয় খাবার। তবুও এর প্রতিটি কামড়ে মিশে থাকে হিমালয়ের হিমেল হাওয়া আর কয়েক প্রজন্মের আবেগ।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন