যন্ত্রণাহীন শেষ কিছুদিন: প্রশমন সেবায় বাংলাদেশ কোথায়?

‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার জার্নাল’ বলছে, দেশে বছরে ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ৭ লাখ মানুষের প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন; বিপরীতে এ সেবা পাচ্ছেন ০.০১ শতাংশের কম মানুষ।

রিফাত পারভীনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Feb 2024, 07:28 PM
Updated : 2 Feb 2024, 07:28 PM

ছয় মাস আগে জরায়ু ক্যান্সার ধরা পড়ে আকলিমার, চিকিৎসা শুরুর পর তীব্র ব্যথা-বমি-দুর্বলতা আর রক্তশূন্যতার মত জটিলতায় বন্ধ রাখতে হয় কেমোথেরাপি; শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে নানা দুঃশ্চিন্তা আর অবসাদে ভেঙে পড়েন তিনি।

পরে একজনের পরামর্শে ভর্তি হন বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসা ও সেবার পর শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে মানসিক অবসাদও অনেকটা কমে আসে। ফের শুরু করেন ক্যান্সারের চিকিৎসা।

অবিবাহিত আকলিমা খাতুনের বয়স ৫০ পেরোয়নি। তার দেখাশোনা করছেন এক ভাগনে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ক্যান্সার শনাক্তের কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু করা হয় কেমোথেরাপি। তিনটি কেমোথেরাপির পর শারীরিক ও মানসিকভাবে আর চিকিৎসা নিতে পারছিলেন না খালা। তখন এক বন্ধুর মাধ্যমে জেনে তাকে ভর্তি করি বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে।

“অথচ খালা যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তখন চিকিৎসকের কাছ থেকেও প্যালিয়েটিভ কেয়ারে নেওয়ার কোনো ধরনের পরামর্শ পাইনি।”

প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারের বিছনায় শুয়ে আকলিমা খাতুন বলেন, “ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছে। এই চিকিৎসায় সারা শরীরের অসহ্য ব্যথা কিছুটা কমেছে। সুস্থ হতে পারব কিনা জানি না, তবে জীবনের যে কয়টি দিন বাকি আছে, একটু ব্যথা ও যন্ত্রণামুক্ত হয়ে বাঁচতে চাই আমি।”

বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন। যারা কিছুটা জানেন, তাদের অনেকেই মনে করেন জীবন সায়াহ্নে থাকা রোগীদের অন্তিম সেবা এটি।

রোগীর শেষ সময়ের সেবা সবসময়ই প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অংশ, কিন্তু প্যালিয়েটিভ কেয়ার সবসময় শেষ সময়ের সেবা নয়। শুধু রোগীই নয়, তার পরিবারের সদস্যদেরও সেবা দেওয়া প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অংশ।

মূলত নিরাময় অযোগ্য কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা কমাতে প্রয়োজন হয় প্যালিয়েটিভ কেয়ারের।

এতে চার ধরনের সেবার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়- শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক। হাসপাতাল, নার্সিং হোম, হসপিস কিংবা বাসায়ও দেওয়া হয় এই সেবা।

কাদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার

প্যালিয়েটিভ কেয়ার কেবল ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য, বিষয়টি এমন নয়। দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, এইডসে আক্রান্ত রোগীদেরও এই সেবার প্রয়োজন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তবে বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রেই এ সেবা দেওয়ার উদাহরণ বেশি।

বিশ্বের ১৮৫টি দেশের ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা ‘দ্য গ্লোবোকান’ ওয়েবসাইট ২০২০ সালের একটি গবেষণায় বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯০ জন ক্যানসারে মারা যান।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় এবং ২০২৩ সালে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশের ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার জার্নালে’ দেখা গেছে, দেশে বছরে ক্যান্সারের মত নিরাময় অযোগ্য রোগে আক্রান্ত ৭ লাখ মানুষের প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবার প্রয়োজন।

এই হিসাবের মধ্যে শিশু-কিশোর রয়েছে ৪০ হাজার। পরিসংখ্যান মতে, বিশাল চাহিদার বিপরীতে প্রশমন সেবা পাচ্ছে মাত্র ০.০১ শতাংশেরও কম মানুষ। অর্থাৎ বড় সংখ্যক রোগীই ক্যান্সার যন্ত্রণা নিয়ে মারা যাচ্ছেন।

২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক প্রতিবেদনে বলেছে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৬৮ লাখ মানুষেরও প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন। আর এর মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ এই সেবা পাচ্ছে।

বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ‘ননকমিউনিকেবল ডিজিস’ যেমন- হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে ‘কমিউনিকেবল ডিজিস’ এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, যৌন সংসর্গ থেকে সংক্রমণের মত রোগের কারণে বিশ্বে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রয়োজনীয়তা বাড়তেই থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগেভাগেই এই সেবার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় হাসপাতালে ভর্তিও কমিয়ে আনে।

কোথায় মিলবে সেবা?

বাংলাদেশে ঢাকার কিছু সীমিত হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসক ও কর্মীদের মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া হয়। বিএসএমএমইউয়ের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিশু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সরকারিভাবে এ সেবা দেওয়া হয়।

এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে শিশুদের জন্য আশিক ফাউন্ডেশন, মিরপুরে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিট, হসপিস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ কেয়ার ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রোগীরা প্যালিয়েটিভ সেবা পান।

সুযোগ-সুবিধা কতটুকু

বিএসএমএমইউ প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের প্রধান মতিউর রহমান ভূঞা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশ প্যালিয়েটিভ সেবা প্রদানের অবকাঠামো খুবই দর্বল। এছাড়া চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাতেও প্যালিয়েটিভ সেবার মত গুরত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে না। দেশের অল্পকিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বপ্রথম এই মানবিক সেবাটি দেওয়ার পরিকল্পনা করে বিএসএমএমইউ।

“দীর্ঘ ১৭ বছরে বিএসএমএমইউইয়ে একটি প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ ও কোর্স চালু হয়েছে। বিভাগটিতে এখন সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ জন কাজ করছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এছাড়া প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে চিকিৎসা সেবায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রধামন্ত্রীর কার্যালয় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি সভায় কিছু নির্দেশনা দেওয়া হলেও এখনো তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি।”

বিএসএমএমইউইতে প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে শয্যা রয়েছে ২২টি। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ১০টি, নারীদের জন্য নয়টি, আর শিশুদের জন্য রয়েছে তিনটি। এছাড়া রোগীদের কেবিনেও সেবা দেওয়া হয়।

শয্যার জন্য রোগীদের কোনো ভাড়া দিতে হয় না। প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে সেবা নিতে একজন রোগীর ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। হোমকেয়ার ও কমিউনিটিভিত্তিক সেবাও দেয় প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগ। বিএসএমএমইউয়ের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রোগীদের বাড়ি গিয়ে প্যালিয়েটিভ সেবা দেওয়া হয়।

মিরপুরে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে রোগীদের জন্য রয়েছে ১৬টি শয্যা। প্রতি শয্যার ভাড়া ৮০০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে, এর মধ্যে অস্বচ্ছল রোগীদের জন্য আছে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ। আবার যারা দিনে সেবা নিয়েই চলে যেতে চান তাদের জন্য রয়েছে ডে কেয়ার সেন্টার।

এছাড়াও কমিউনিটিভিত্তিক সেবা পাওয়া যায় দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে। একটি মমতাময়ী নারায়ণগঞ্জ ও অন্যটি মমতাময়ী করাইল। প্যালিয়েটিভ সোসাইটি অব বাংলাদেশ বর্তমানে পরিচালনা করছে মমতাময়ী করাইল প্রকল্পটি।

মরফিন ও দক্ষ জনবলের অপ্রতুলতা

ক্যানসার রোগীদের শারীরিক ভোগান্তি ও যন্ত্রণা কমাতে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের জন্য কার্যকরী ওষুধ মরফিন। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মরফিনের সরবরাহ ও প্রয়োগের চিত্রও সন্তোষজনক নয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড হসপিস প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালায়েন্সের’ (ডাব্লিউএইচপিসিএ) তথ্য বলছে, ৭ লাখ ক্যান্সার রোগীর শারীরিক ব্যথা কমাতে বছরে মরফিনের প্রয়োজন হয় ৩০০ কেজি। তবে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১২ কেজি পর্যন্ত মরফিন ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। অর্থাৎ বড় সংখ্যক রোগীই ক্যান্সারের যন্ত্রণায় ভুগে মারা যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট কমিশনের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে বছরে ২৯৮.৫ মেট্রিক টন মরফিন বা ওই জাতীয় ব্যথানাশক সরবরাহ করা হয়। সেখানে স্বল্প আয়ের দেশে এর ব্যবহার হয় ০.১ মেট্রিক টন।

অপরদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জাতীয় প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রশিক্ষণ সহায়িকারে তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৯০ শতাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরই নেই মরফিন ব্যবহারের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ।

বিএসএমএমইউতে প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের প্রধান মতিউর রহমান ভূঞা জানান, এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি শেষ করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন।

এ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ মরফিনের ব্যবহার নিয়েও রয়েছে নানা ভুল ধারণা। ব্যথা কমাতে কার্যকর ওষুধটি ব্যবহারে নেশার উদ্রেক না হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার জার্নালের প্রধান সম্পাদক ও প্যালিয়েটিভ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, “আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড থেকে প্রতিটি দেশের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে গণস্বাস্থ্য ও ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস মরফিনের ট্যাবলেট, সিরাপ ও ইনজেকশন তৈরি করে।”

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নাশিদ কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্যালিয়েটিভ কেয়ার দামি কোনো সেবা নয় বরং স্বল্প খরচেই এ সেবা পাওয়া সম্ভব। তবে জনসাধারণের মধ্যে তো বটেই, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যেও প্যালিয়েটিভ সেবা কোথায়, কীভাবে পাওয়া যায়- এই সচেতনতার যথেষ্ট কমতি রয়েছে।”

প্যালিয়েটিভ কেয়ার জার্নালের প্রধান সম্পাদক নিজামউদ্দিন বলেন, “স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি পর্যায়ে প্যালিয়েটিভ সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করতে ২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যালায়েন্স একটি প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশসহ সকল সদস্য রাষ্ট্র সেখানে স্বাক্ষর করেছিল। তবে বাংলাদেশে ১০ বছরেও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।”

তিনি জানান, ২০১৫ সালে ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিশ্বের কোন দেশে ‘কোয়ালিটি অব ডেথ’ কেমন তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনে মোট ৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৯তম।

“এরপর আর কোনো কাজ হয়েছে কিনা জানি না, তবে এখনও এই অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপদ জন্ম যেমন গুরত্বপূর্ণ তেমনি নিরাপদ মৃত্যুও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।”