Published : 16 Mar 2026, 11:00 AM
একটি ঘোষণা, আকস্মিক হামলা, তারপর গল্প আর থামেনি; এর মধ্যে সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা ও মায়ের অন্তর্ধান- প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’।
এতে বিনোদনের মোড়কে রাজনৈতিক গল্প বলে গেছেন হলিউডের পরিচালক পল টমাস অ্যান্ডারসন; তিনি তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন।
আর সেই গল্পই ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের গড়ল ইতিহাস। সেরা সিনেমা, সেরা নির্মাতাসহ অস্কারে সর্বোচ্চ ছয় পুরস্কার জিতল সিনেমাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে রোববার সন্ধ্যায় অস্কারের জমকালো আসরে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘এবারের অস্কার হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক’।
১৯৯০ সালে প্রকাশিত টমাস পিনচনের উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি বানিয়েছেন অ্যান্ডারসন। যে সিনেমার সঙ্গে এই সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার সাদৃশ্য মেলে। সিনেমার পরতে পরতে বিপ্লব, অভিবাসন, দুর্নীতি, সংঘর্ষ, শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য উঠে এসেছে।
সেরা নির্মাতার পুরস্কার জিতে অ্যান্ডারসন বলেন, “এই প্রাপ্তির জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আপনাদের ধন্যবাদ।”

অ্যান্ডারসন বলের তার দলের সদস্যরা সম্মানিত, এই সম্মানের ভাগীদার হওয়ার জন্য।
রসিকতা করে অস্কারজয়ী এই নির্মাতা বলেন, “কোনো কিছু পাওয়ার আগে আপনার মনে সন্দেহ থাকতে পারে যে আপনি এটার যোগ্য কী না। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই আমি অস্কার পেয়ে আনন্দিত।”
তবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার ছিটকে যাওয়ায় বড় সম্ভাবনা থাকলেও, দ্বিতীয়বার আর অস্কার জয় হল না ক্যাপ্রিওর।
এ সিনেমার মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক নিয়েছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। ২০২৩ সালের জুনে প্রাথমিকভাবে সিনেমাটির কাজ শুরু হলেও পুরোদমে শুটিং চলতে থাকে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে দৃশ্যধারণের কাজ। প্রাথমিক নাম ছিল ‘দ্য ব্যাটল অব বাকটান ক্রস’। পরে কিছু জটিলতা এড়াতে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনেমাটিকে ‘সমাজের আয়না’ বলে অভিহিত করেছিলেন ডিক্যাপ্রিও। তার ভাষ্যে, “আমাদের সংস্কৃতির বিভাজন আর চরম মেরুকরণকে দেখায় এই সিনেমা। যদিও ছবির নির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই, তবে চরমপন্থার একধরনের প্রভাব এখানে কাজ করেছে।”
তিনি আরও বলেছিরেন “ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার রাজনৈতিক ঘরানার সিনেমা হলেও রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই। পরিচালক সবকিছু বিনোদনের মোড়কে বলে দিয়েছেন।”
এই সিনেমায় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, ব্ল্যাক কমেডি ও অ্যাকশন আছে, যার প্রশংসা করেছেন সমালোচকেরা।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এই সিনেমা অসন্তোষ, প্রতিবাদ আর সমাজের বাইরে থাকা একাকী নায়কের গল্প, যা আজকের আমেরিকায় দেখা যায় না।

গেল বছরের ২০ মার্চ সিনেমার টিজার প্রকাশ করেছিল পরিবেশক ওয়ার্নার ব্রাদার্স। টিজারের পর এ সিনেমার প্রতি দর্শকদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
১৭৫ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি পরিচালক অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বলা হচ্ছে।
ডিক্যাপ্রিও প্রংশসা করে বলেছিলেন, “অ্যান্ডারসন সব সময় দারুণ সিনেমা বানান, তবে এবার যেন নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন।”
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ শুরুতেই মনোযোগ কেড়ে নেয়। সিনেমায় প্রথম আধঘণ্টার এক বিপ্লবী লড়াই দেখা যায়, যার প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে বাকি সময় ধরে। অপহরণ, পালানো, ধাওয়া আর দিশাহারা এক বাবার মেয়েকে খুঁজে বেড়ানোর গল্পে পুরো সময়ে দর্শক আবিষ্ট হয়ে থাকে।
বড় স্টুডিওগুলো যেখানে সুপারহিরো আর সিকুয়েল না হয় জনপ্রিয় ধারার পেছনে লগ্নি করেছে, তখন ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ হলিউডের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন তোলা এমন ব্যয়বহুল সিনেমা যে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো স্টুডিও প্রযোজনা করেছে, সেটাও খানিকটা বিস্ময়কর।

সেই নিপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, অভিবাসীদের প্রতি আক্রমণ—সব কমবেশি একই। সিনেমাটি আসলে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের গল্প বলে না; বরং মনে করিয়ে দেয় সাধারণ নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বরাবরই নিপীড়নমূলক আচরণ করেছে।
এ সিনেমাকে পুরোপুরি রাজনৈতিক সিনেমা বললেও ভুল বলা হবে। গতিময়, রোমাঞ্চকর এক যাত্রা শেষে এটি হয়ে ওঠে এক গভীর মানবিক সিনে,আ। যেখানে মানুষেরাই গল্পের নায়ক আর যাদের জীবন এক বিশৃঙ্খলতার চাকার ভেতর বন্দী। বৈশ্বিক মঞ্চে বিদ্রোহ ও বিপ্লব দেখানো এ সিনেমা জীবনের গল্প বলে। এ গল্পের গভীরে প্রকাশ পেয়েছে কীভাবে জীবন আমাদের আদর্শ, নৈতিকতা ও নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন টেয়ানা টেইলর, শন পেন, বেনিসিও দেল তোরো, রেজিনা হলসহ কয়েকজন।
চিত্রনাট্যে যা আছে
চিত্রনাট্য দেখিয়েছে ‘ফ্রেঞ্চ ৭৫’ নামের এক কল্পিত বিপ্লবী গোষ্ঠী মেক্সিকো-মার্কিন সীমান্তে অভিযান চালায়। বিপ্লবীরা সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে বন্দী অভিবাসীদের মুক্ত করে। দলটির নেতৃত্ব দেয় পারফিডিয়া বেভারলি হিলস। হিলসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টেয়ানা টেইলর।
ক্রোধে উন্মত্ত এক তরুণী হলেন পারফিডিয়া, যিনি আবার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা ও বেপরোয়াও। কিন্তু অভিযান চালানোর সময় সে কর্নেল স্টিভেন লকজয়কে (শন পেন) অপমান করে। এ ঘটনা কর্নেল লকজয়কে উন্মাদ করে তোলে।
‘কালো নারী’ পারফিডিয়াকে সে তার বর্ণবাদী অহংকারে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আবার তার প্রতি সে অনুভব করে এক বিকৃত আকর্ষণও।

এদিকে পারফিডিয়ার সঙ্গী বব ফার্গুসনের (লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও) বিপ্লব চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাদের পিছে ধাওয়া করতে থাকে কর্নেল লকজয়। এর মধ্যে মা হয় পারফিডিয়া। কিন্তু এ বন্দিজীবন মেনে নিতে পারে না সে।
মেয়েকে রেখে সে পালিয়ে যায়। তবে সামাজিক অভিযানে বিপ্লবীরা টিকতে পারে না। কেউ এনকাউন্টারে মারা যায়, কেউ গ্রেপ্তার হয়। সদ্যোজাত মেয়ে উইলাকে (চেইস ইনফিনিটি) নিয়ে নতুন শহরে, নতুন পরিচয়ে থিতু হয় বব ফার্গুসন।
এরপর ১৬ বছর কেটে যায়। হঠাৎ কর্নেল লকজয়ের সামনে আসে ডানপন্থি এক শ্বেতাঙ্গ সমাজের সদস্য হওয়ার সুযোগ। তবে এই সমাজের সদস্য হতে হলে অতীত নিষ্কলঙ্ক হওয়া চাই। নিজের অতীতকে মুছে ফেলতে আবার মাঠে নামেন লকজয়। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ।
সিনেমায় লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অভিনয় সংযত, শক্তিশালী অভিনয় করেছেন। এখানে নেতার ভূমিকায় তাকে দেখা যায় না। বিপ্লবে বিশ্বাস রেখে এর পক্ষে কাজ করলেও সব ছাড়িয়ে যায় তার স্নেহময় বাবার পরিচয়কে।
মেয়ে উইলার সঙ্গে ববের সম্পর্ক এ সিনেমার প্রাণ। উইলা চরিত্রে চেইস ইনফিনিটিও দারুণ অভিনয় করেছেন। নিজের প্রথম সিনেমাতেই তিনি মাত করেছেন বলা যায়।
বাবা ও মেয়ের রসায়ন এ সিনেমায় গতি এনেছে।
তবে শন পেনের কথা সমালোচকরা বলেছেন আলাদাভাবে। সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন এক কর্নেলের রূপকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দুর্দান্ত।