Published : 08 Jun 2026, 08:12 PM
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে হোভার কাভারটিকে বছরের পর বছর ধরেই নিথর দেখতে অভ্যস্ত সবাই। হঠাৎ সেটিতে প্রাণের ছোঁয়া মিলল যেন। সোমবার দেখা গেল, সেটি দিয়েই ঢেকে রাখা হয়েছে ম্যাচের উইকেট। একটা কুইজের প্রশ্ন হয়ে গেল, সবশেষ কবে এটি কাজে লাগানো হয়েছে। সংবাদকর্মীদের মধ্যে মজার একটি প্রশ্নও ছুটে বেড়াতে লাগল, কোনটির বয়স বেশি, এই হোভার কাভারের ব্যবহার নাকি বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার সবশেষ ওয়ানডে সিরিজ?
প্রশ্নটি এমনিতে মজার। কিন্তু আদতে কঠিন এক বাস্তবতারও। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে সবশেষ মুখোমুখি হয়েছে সেই ২০১১ সালের এপ্রিলে! গত ১৫ বছরে এই সংস্করণে দুদলের দেখা হয়েছে স্রেফ চারবার। এর তিনটি বিশ্বকাপে, একটি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। দীর্ঘ সেই খরা অবশেষে কাটছে এবার।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে। বিদ্যুৎ খরচ যতটা সম্ভব বাঁচাতে, আগের সিরিজের মতো এবারও খেলা শুরু বেলা ১১টায়।
গত শুক্রবার বাংলাদেশে পা রেখেছে অস্ট্রেলিয়া দল। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটের এত বড় দলের সঙ্গে খেলা নিয়েও খুব বেশি আলোচনা এই কদিন ছিল না। দেশের ক্রিকেটের বড় খবর ছিল বিসিবি নির্বাচন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন এখন বুঁদ বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায়। এই সিরিজের উত্তেজনা বা আবহ কতটা থাকবে, এমন প্রশ্ন করা হলো সিরিজ শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে। বাংলাদেশ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ বললেন, “আমাদের একটাই পরিকল্পনা, আমাদের ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে, ম্যাচ জিততে হবে।”
এই কাজটা সাম্প্রতিক সময়ে ভালোভাবেই করছে মিরাজের দল। সবশেষ তিনটি ওয়ানডে সিরিজে তারা জিতেছে। আগামী বছরের বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনাও তাই উজ্জ্বল হয়েছে আগের চেয়ে। সেটি আরও ঝলমলে হয়ে উঠতে পারে ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের তিনে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে।
মিরাজের ভাবনায় সেই সমীকরণ তো আছেই। পাশাপাশি বিশ্বকাপে ভালো করার রসদও তিনি খুঁজে নিতে চান এই সিরিজ থেকে।
“যেহেতু সামনে বিশ্বকাপের একটা সমীকরণ আছে এবং আমার মনে হয় যে, এই জিনিসটা যদি আমরা সবাই মেইনটেইন করতে পারি, গত তিনটা সিরিজ যেভাবে খেলেছি… আমার কাছে মনে হয় আমরা ভালো করতে পারব এবং বিশ্বকাপে তাকিয়ে আমরা কীভাবে খেলব, এখন থেকেই মানসিকভাবেই প্রস্তুতি নেব। বিশ্বকাপে তাদের সঙ্গেও খেলতে হবে আমাদের। এই সিরিজগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আরও গুছিয়ে নিতে পারব।”
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সবশেষ ওয়ানডে সিরিজের সময় মিরাজ সবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলছিলেন। শুধু তিনি নন, এই দুই দলের কারও অভিজ্ঞতা নেই পরস্পরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে খেলার। ওয়ানডে ইতিহাসের সফলতম দল ও রেকর্ড ছয়বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে খেলার রোমাঞ্চ ফুটে উঠল মিরাজের কণ্ঠে।
“আমরা অনেক রোমাঞ্চিত যে অনেক দিন পর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ খেলছি এবং অধিনায়ক হিসেবেও আমি রোমাঞ্চিত। আমাদের জন্য একটা ভালো চ্যালেঞ্জ শুরু হতে যাচ্ছে এবং আমরা যদি ভালো জায়গায় ভালো শুরু করতে পারি তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে। এই ধরনের প্রত্যেকটা চ্যালেঞ্জই আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ”।
“যেহেতু আমরা এই কন্ডিশনে খেলে অভ্যস্ত এবং আমরা জানি এই উইকেট সম্পর্কে এবং আমরা যদি আমাদের সেরাটা দিতে পারি, বোলাররা যেভাবে বোলিং করছে গত দুই-তিনটা সিরিজ এবং ব্যাটসম্যানরাও রান করছে, আমার কাছে মনে হয় যে দুইটার কম্বিনেশন যদি ভালো থাকে, অবশ্যই আমরা ফলাফল আনতে পারব।”
অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত পেসত্রয়ী মিচেল স্টার্ক, জশ হেইজেলউড ও প্যাট কামিন্স এই সিরিজের বাইরে ছিলেন আগে থেকেই। শেষ সময়ে ছিটকে গেছেন ট্রাভিস হেড ও মিচেল মার্শও। তারপরও দলটি তো অস্ট্রেলিয়া! সেই সমীহই মিরাজের কণ্ঠে।
“আমরা আগেই শুনেছিলাম এই দুজনের ইস্যু। কালকে আমরা কনফার্ম হয়েছি যে, দুজন আসতে পারছে না। তারপরও দল হিসেবে আমরা চিন্তা করছি যে, ওরা যে দলটা এসেছে, অবশ্যই ওরা অনেক ভালো দল এবং অনেক শক্তিশালী দল নিয়ে এসেছে। আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করব। আমরা ওদেরকে নিয়ে বেশি চিন্তা না করে আমাদের জায়গা থেকে পারফর্ম করার চেষ্টা করব।”
বাংলাদেশের একাদশ নিয়ে সবচেয়ে বড় কৌতূহলের জায়গা, মোসাদ্দেক হোসেন একাদশে জায়গা পাবেন কি না। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফর্ম করে সাড়ে তিন বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরেছেন এই অলরাউন্ডার। তিনি ও মিরাজ দুজনই স্পিনিং অলরাউন্ডার। তবে অধিনায়ক মিরাজ সিরিজ শুরুর আগে জোর দিয়েই বললেন, দুজনের একসঙ্গে খেলায় কোনো সমস্যা তিনি দেখেন না।
কামিন্সের অনুপস্থিতিতে এই সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল মার্শের। তিনিও না থাকায় সেই ভার বর্তেছে ইংলিসের ওপর। এত বছর পর বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার রোমাঞ্চ স্পর্শ করল ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ককেও।
“খুব রোমাঞ্চকর ব্যাপার। বাংলাদেশের সঙ্গে খুব একটা খেলি না আমরা, বিশেষ করে এখানে, বাংলাদেশে। আমারও এটা এখানে প্রথমবার এবং আমি জানি, দলের বাকিদের অনেকের জন্যও এটা প্রথমবার। আমরা এই সিরিজটা নিয়ে দারুণ রোমাঞ্চিত।”
দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য সুখকর কিছু নয়। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত জয়গুলির একটি অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই। তবে ২২ বারের দেখায় একমাত্র জয়টি সেই ২০০৫ সালে কার্ডিফে।
দেশের মাঠে বাংলাদেশ ভিন্ন এক দল হয়ে উঠেছে অবশ্য বেশ আগেই। ইংলিসও সেটা জানেন ও সেই সম্মান দিচ্ছেন বাংলাদেশকে।
“আমার মনে হয়, বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলাটা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। ওরা খুবই সুসংগঠিত একটি দল। স্বাভাবিকভাবেই, এটা তাদের নিজেদের ঘরের মাঠের পরিবেশ। আমাদের মধ্যে অনেকেই এর আগে এখানে আসেনি। কিন্তু আমাদের আত্মবিশ্বাস প্রবল। আমার ধারণা, দারুণ একটি সিরিজ হতে চলেছে।”
সিরিজ দারুণ জমজমাট হতেই পারে। তবে শেষ পর্যন্ত জরুরি ফলাফল পক্ষে আনা, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য। এই সিরিজে কাঙ্ক্ষিত ফল পেলে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে দুর্ভাবনা দূর হবে অনেকটাই।