Published : 07 Jun 2026, 08:27 AM
বিয়েবাড়ির মতো সাজগোজ কিংবা উৎসবের আবহ ততটা নেই। তবে কিছুটা সাজসজ্জা চোখে পড়ল মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে। নির্বাচনে প্রার্থীদের কয়েকজনের ঢাউস আকারের ব্যানার চোখে পড়ল, নির্বাচন নিয়ে কিছু ফেস্টুনও। সন্ধ্যায় দেখা গেল আলোকসজ্জাও করা হয়েছে বিসিবি কার্যালয়ে। যদিও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে মূল জায়গাতেই। বিসিবি নির্বাচন ঘিরে এসব আয়োজন, কিন্তু ভোটের মাঠে লড়াইয়ের আবহই নেই তেমন।
নির্বাচনের আগেই বিসিবি পরিচালক হওয়া নিশ্চিত হয়ে গেছে ৮ জনের। রোববারের নির্বাচনে তাই ভাগ্য নির্ধারিত হবে মাত্র ১৫ জন পরিচালকের।
বিসিবি নির্বাচনে ক্যাটেগরি-১ থেকে পরিচালক পদ ১০টি, ক্যাটেগরি-২ থেকে ১২টি ও ক্যাটেগরি-৩ থেকে ১টি। এছাড়াও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সরাসরি মনোনয়নে পরিচালক হন দুজন।
এই ২৫ পরিচালকের ভোটের পরে নির্বাচিত করা হয় বোর্ড সভাপতি ও দুজন সহ-সভাপতি।
আট মাসের মধ্যে বোর্ডের দ্বিতীয় নির্বাচন এটি। গত ৬ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিয়েছিল একটি পরিচালনা পর্ষদ এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তবে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী। পরে সেসব অভিযাগ খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৭ এপ্রিল আমিনুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়।
ওই কমিটি বাদ দিয়ে ১১ সদস্যের নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করে এনএসসি, যেটির প্রধান হয় তামিম ইকবালকে। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে বলা হয় কমিটিকে। সেই নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে ঠিক দুই মাসের মাথায়।
আগের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ৯ পরিচালক। বাকিদের ক্ষেত্রেও বেশির ভাগেরই জয় একরকম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল নির্বাচনের আগেই। এবারের বাস্তবতাও খুব একটা ব্যতিক্রম নয়।
গত নির্বাচনের সঙ্গে এবার একটি মৌলিক পার্থক্য অবশ্য আছে। সেবার নির্বাচনকে ঘিরে অনিয়মের সুষ্পষ্ট কিছু ঘটনা ও কিছু অভিযোগ ছিল। এবার সেরকম কিছু এখনও দেখা যায়নি। যদিও আড়ালে ছক সাজানোর গুঞ্জন আছে। ক্যাটেগরি-০১ বা জেলা-বিভাগের ক্ষেত্রে সরকারী প্রভাব খাটানোর ছাপও আছে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে ৮ পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের ৭ জনই ক্যাটেগরি-০১ বা আঞ্চলিক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধি। ক্যাটেগরি-৩ তথা সাবেক অধিনায়ক, ক্রিকেটার ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হয়ে গেছেন আরেকজন।
ভোটের মূল লড়াই এবার থাকছে ক্যাটেগরি-২ বা ক্লাব ক্যাটেগরিতে, যেখানে ১২টি পরিচালক পদে লড়বেন ১৬ জন। বিসিবির বর্তমান অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল লড়বেন এই ক্লাব ক্যাটেগরিতেই।
ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের কাউন্সিলর তামিম ছাড়াও এই ক্যাটেগরি থেকে ভোটের লড়াইয়ে আছেন ফাহিম সিন্হা (আবাহনী লিমিটেড), মাসুদুজ্জামান (মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব), আসিফ রব্বানী (শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব), ফৈয়াজুর রহমান (উত্তরা ক্রিকেট ক্লাব), ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক (বসুন্ধরা রাইডার্স), মোহাম্মাদ আমজাদ হোসেন (ট্রাই স্টেট ক্রিকেটার্স), মির্জা ইয়াসির আব্বাস (আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব), ইসরাফিল খসরু (এক্সিউম ক্রিকেটার্স), মোঃ রফিকুল ইসলাম বাবু (ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্র), প্রফেসর ডাঃ সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম (ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব), শানিয়ান তানিম নাভিন (ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব), সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ (ফেয়ার ফাইটার্স স্পোর্টিং ক্লাব), সৈয়দ বোরহানুল হোসেন (তেজগাঁও ক্রিকেট একাডেমি), সাকিব আহমেদ সালাম (পূর্বাচল স্পোর্টিং ক্লাব), মেজর ইমরোজ আহমেদ (অবঃ)(কাঁঠালবাগান গ্রীন ক্রিসেন্ট ক্লাব)।
তাদের মধ্যেও ৮-১০ জনের পরিচালক হওয়া একরকম নিশ্চিত বলেই গুঞ্জন ছড়িয়েছে গত কিছুদিনে। তবে ভোটের লড়াইয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কিছু চমক তাই থাকতেও পারে।
এই প্রার্থীদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে বিসিবির গত পরিচালনা পর্ষদেও ছিলেন ফৈয়াজুর রহমান, ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক, আমজাদ হোসেন ও শানিয়ান তানিম নাভিন। তবে পরে নানা সময়ে তারা পদত্যাগ করেন। মেজর ইমরোজ আহমেদও প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু নানা অভিযোগ তুলে সরে দাঁড়ান শেষ সময়ে।
এবারের বিসিবি নির্বাচনে কাউন্সিলর বা ভোটার মোট ১৮৪ জন। তাদের মধ্যে ১ নম্বর ক্যাটেগরির ভোটার ৬৬ জন, ২ নম্বর ক্যাটেগরি ৭৬ ও ৩ নম্বর ক্যাটেগরির ৪২ জন।
১ নম্বর ক্যাটেগরিতে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ থেকে পরিচালক পদ দুটি করে, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর বিভাগ থেকে একটি করে। ৫ বিভাগে ৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হয়ে যাওয়ায় ভোট হবে শুধু দুটি বিভাগে।

খুলনা বিভাগে দুটি পরিচালক পদের লড়াইয়ে থাকছেন তিনজন- খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ শফিকুল আলম, যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার শান্তনু ইসলাম ও চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ আব্দুছ সালাম। বরিশাল বিভাগে একটি পদের লড়াইয়ে আছেন দুজন- বরিশাল বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মোঃ মিজানুর রহমান ও ভোলা জেলা ক্রীড়া সংস্থার মোঃ মুনতাসির আলম চৌধুরী।
এই ক্যাটেগরিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হয়ে গেছেন ঢাকা বিভাগ থেকে ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাইদ বিন জামান ও জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার এস.এম. আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর, সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও লক্ষীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর মঈন উদ্দিন চৌধুরী, সিলেট বিভাগ থেকে সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, রাজশাহী বিভাগ থেকে বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং রংপুর বিভাগ থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থার মির্জা ফয়সাল আমীন।
ক্যাটেগরি-৩ থেকে একমাত্র প্রাথী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মোঃ আলমগীর। চট্টগ্রামের এই অভিজ্ঞ সংগঠক প্রথমবার বিসিবি পরিচালক হয়েছিলেন ২০০৫ সালে। নাজমুল হাসান (পাপন) প্রথম দফায় সভাপতি থাকার সময়ও পরিচালক ছিলেন তিনি।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা নির্বাচিত হয়েছে এবং এখনও যারা প্রার্থী আছেন, তাদের মধ্যে বেশ কজনই সরকারী দল বিএনপি সংশ্লিষ্ট বা ঘনিষ্ঠ। রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত পরিচালক মির্জা ফয়সল আমীন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাই। এই মন্ত্রণালয়েরই প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়া–২ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত পরিচালক হয়ে গেছেন রাজশাহী বিভাগ থেকে।
সিলেট বিভাগের পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি। বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে সাইদ বিন জামান পরিচালক হয়ে গেছেন ঢাকা বিভাগ থেকে। পানিসম্পদমন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর–৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর চাচা মঈন উদ্দিন চৌধুরী পরিচালক হয়েছেন চট্টগ্রাম থেকে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও যশোর–৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলামের ভাই শান্তনু ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন খুলনা বিভাগ থেকে।
ক্লাব ক্যাটেগরিতে প্রার্থীদের মধ্যে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদের বাবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইসরাফিল খসরুর বাবা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মির্জা ইয়াসির আব্বাসের বাবা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। এই তিনজনই বর্তমানে বোর্ডের অ্যাডহক কমিটিতে আছেন।
এবারের বিসিবি নির্বাচনে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম। কমিশনের বাকি দুই সদস্য গাজীপুর মহানগরের পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং উপ সচিব এ বি এম এহসানুল মামুন।