Published : 25 Jun 2026, 05:28 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে যাওয়ার পর প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় কেমন চলছে? আগের মতই কি কর্মীরা ঠিক সময়ে দপ্তরে আসছেন? মন্ত্রীরা কি আসেন নিয়মিত?
বাজেট অধিবেশনে অনেক মন্ত্রীর ‘অনুপস্থিতি’ নিয়ে জাতীয় সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা এবং সংসদের বাইরে সমালোচনার মধ্যে সচিবালয়ে উপস্থিতির আলোচনাও সামনে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ কার্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে অবস্থান করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথমবারের মত বিদেশ সফরে অনেক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা তার সঙ্গী হয়েছেন। কিন্তু যারা দেশে আছেন তারা এবং সচিবালয়ের কর্মীরা নিয়মমত কি আসছেন? তা দেখতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ছয় সদস্যের একটি দল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছেন। তারা নির্ধারিত সময়ের পরে কোনো কোনো সচিবকে উপস্থিত হতে দেখেন; মন্ত্রীরাও এসেছেন ঢিমেতালে সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার আশপাশে।
যেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে আছেন তাদের দপ্তরে অফিস শুরুর দেড় ঘণ্টা পরে গিয়েও কর্মকর্তাদের মেলেনি; যারা দেশে রয়েছেন তাদের দপ্তরে সোয়া ৯টার দিকে ঝাড়পোঁছ করার প্রস্তুতি দেখা গেছে।

সচিবদের যাদের প্রথমেই আসতে দেখা গেছে, তারাও এসেছেন ৯টা ৭ মিনিটে। তারা অবশ্য বলতে চেয়েছেন, ‘নিয়মিত’ সকাল ৯টার মধ্যেই অফিসে প্রবেশ করেন তারা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ঘুরেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর প্রতিবেদক লিটন হায়দার, গোলাম মর্তুজা অন্তু, মাসুম বিল্লাহ, কাজী মোবারক হোসেন, মাছুম কামাল ও হামিমুর রহমান ওয়ালিউল্লাহ।
প্রায় দুই দশক ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা বিএনপি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে থেকেই প্রশাসনে গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল; এর ধারাবাহিকতা দেখা যায় প্রথমবারের মত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসা তারেক রহমানের কর্মসূচিতে।
তিনি প্রথম থেকেই নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস শুরু করে প্রশাসনকে কর্মঠ হওয়ার বার্তা দেন; শনিবারে ছুটির দিনে অফিস করেও কর্মীদের বাড়তি কাজে মনোনিবেশ করতে অনুপ্রাণিত করেন। হঠাৎ সাত মন্ত্রণালয়ে হাজির হয়ে তিনি যেমন সংবাদের শিরোনাম হন, তেমনই কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তার মনোযোগও দেখা যায়।
এরই মধ্যে নাগরিক সেবা দেওয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বাড়ানো ও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে জোর দিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে। সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কিংবা ব্যক্তিগত কাজের কারণে অনেক কর্মী নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে জনসাধারণ ও অন্যান্য দপ্তরের যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং নাগরিক সেবায় বিঘ্ন ঘটে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে তুলে ধরা হয়।
সে কারণে সচিবালয়ের কর্মীদের দপ্তরে উপস্থিত ও অবস্থানের সময়সূচি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে তার প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন। সেখান থেকে সরাসরি চীনে গেছেন তিনি। শুক্রবার সফর শেষ করে দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী।
এর মধ্যে ১১ জুন ঘোষণা হওয়া আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে অধিবেশন চলছে জাতীয় সংসদে’ প্রধানমন্ত্রী না থাকায় অনেক মন্ত্রী যে সংসদে যাচ্ছে না, তা সংসদের আলোচনায় এনেছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
ঢাকা-১২ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেছেন, “আমি লক্ষ্য করছি বাজেট অধিবেশনে অধিকাংশ সময় আমাদের মন্ত্রীরা থাকেন না।”
তিনি বলেন, “এইখানে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারপরে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অনেক মন্ত্রী নাই। মন্ত্রীদের চেয়ার সব খালি। এ ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাচ্ছি মাননীয় স্পিকার।”
জবাবে স্পিকার বলেন, “বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও উপস্থিতি দেখতে চাই। শোকর করেন যে, অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন এখানে। কিন্তু অন্য মন্ত্রীদেরও অনুরোধ জানাবেন সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে। বাজেট সেশন গুরুত্বপূর্ণ সেশন, তারা থাকলে আমরা বাধিত হব।”
ওই সময় জাতীয় সংসদে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে খেদ প্রকাশ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, তাদের সংসদে উপস্থিত থেকে সদস্যদের বক্তব্য শোনা উচিত।
তিনি বলেন, “কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংসদ অধিবেশন সবচাইতে বেশি গুরুত্ব পায়।”
সংসদের এই আলোচনা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সকালের চিত্র দেখতে যান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদকরা।
সচিবালয়ে সকালে যা দেখা গেল
বাজেট অধিবেশন চলায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশেই রয়েছেন; আর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীন সফরে।
এদিন অর্থমন্ত্রী ও অর্থ উপদেষ্টার দপ্তরে ৯টা থেকে ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিব আসিফ ইকবাল, সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সেলিম, জনসংযোগ কর্মকর্তা সিরাজ উদ-দৌলা খান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম (সোহাগ), প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান এবং উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. সারওয়ার মোর্শেদকে দপ্তরে মেলেনি।
ওই দপ্তরে অন্য একজন কর্মী বলেন, “মন্ত্রীর আসতে দেরি আছে। তিনি ১২-১টা নাগাদ আসতে পারেন।”
এদিন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বাজেট বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল; একই সঙ্গে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টা থেকে।
অর্থ সচিবের দপ্তরে যেতে যেতে দেখা যায় তিনি তার কক্ষে ঢুকছেন। তখন ঘড়ির কাঁটায় ৯টা বেজে ৭ মিনিট।
এরপর ৯টা ১০ মিনিট পর্যন্ত অর্থ সচিবের দপ্তরে তার কক্ষ ছাড়াও অন্য ছয় কক্ষের দুটিতে কোনো কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি।

সারাবছরই ব্যস্ত থাকা অর্থ মন্ত্রলায়ের প্রশাসন ও সমন্বয় শাখার ১০ কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে ৯টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তিনজনকে পাওয়া যায়নি। আর প্রবিধি অনুবিভাগ ঘুরে ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দুই কর্মকর্তার দেখা মেলেনি।
শুধু জ্যেষ্ঠ সহকারী থেকে উপরের দিকের কর্মকর্তাদের খোঁজ নেওয়া হয়েছে; তবে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ও উপসচিবদের ব্যক্তিগত সহকারী না থাকায় তারা ছুটিতে বা বিদেশে সরকারি কাজে রয়েছেন কি না সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বেশি থাকায় এবং একই কক্ষে একাধিক কর্মকর্তা বসায় তাদের উপস্থিতির হিসাব নেওয়া হয়নি; তবে বেশিরভাগ চেয়ারেই উপস্থিতি মিলেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর দপ্তরে ৯টা ৪৮ মিনিটে গিয়েও জানা যায় তিনি আসেননি। তার দপ্তরের বেশিরভাগ কর্মকর্তা এসেছেন সোয়া ৯টার পরে। পরে মন্ত্রী তার দপ্তরে আসেন ৯টা ৫২ মিনিটে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, “সত্যি বলতে, প্রধানমন্ত্রী না থাকলে ‘হাউজের’ যেমন কোরাম পূরণ হয় না। তেমনি সচিবালয়েও। উনি না আসলে মন্ত্রীরা দ্রুত আসতে চান না। আর মন্ত্রীরা না এলে কর্মকর্তারাও দ্রুত আসেন না।”
১০টা ১৭ মিনিটে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে জানা যায়, তার একান্ত সচিব এবং জনসংযোগ কর্মকর্তার তখন আসেননি।
“মন্ত্রী দেশের বাইরে রয়েছেন। আর স্যার (একান্ত সচিব) কেন যে আজ ‘লেট করছেন…,” বলেন ওই মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মী।
সাড়ে ৯টায় নম্বর ভবনে ঢোকেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
৯টা ১০ মিনিটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে ঝাড়পোঁছ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ৯টা ৩ মিনিটেও স্বরাষ্ট্র সচিব আসেননি। ৯টা ৪ মিনিটে তার খোঁজ নিতে একান্ত সচিবের কক্ষে ঢুকে দেখা যায়, তখন পর্যন্ত তিনিও আসেননি।
পরে ৯টা ১২ মিনিটে দপ্তরে আসেন স্বরাষ্ট্র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী; একই সময় তার একান্ত সচিব মো. শিমুল আকতারও ঢোকেন মন্ত্রণালয়ে।
সোয়া ৯টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, এক নারীসহ দুই কর্মী মন্ত্রীর কক্ষ পরিষ্কার করছেন।
পরে মন্ত্রণালয়ের জেষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, স্বরাষ্ট্র উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফয়সল আহমেদ অফিসে এসেছেন ৯টা ১৪ মিনিটে, আর পুলিশ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নাইম ঢুকেছেন ৯টার পরপর।
একই ভবনে থাকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে পাওয়া যায়নি। তার একান্ত সচিব মোহাম্মদ মাহবুব আলমও আসেননি সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।
এরপর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অফিস সরকারী সাইফুল ইসলাম সোহাগ বললেন, “স্যার নাও আসতে পারেন।”

তিনি জানালেন, আগারগাঁওয়ে সকাল ১০টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠান আছে।
যদিও পরে ধর্মমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মাহমুদ বলেন, “স্যার (মন্ত্রী) একটু ‘অসুস্থ’। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রামে যেতেও পারেন, নাও যেতে পারেন।”
অবশ্য ভিন্ন তথ্য দেন এক অফিস সহায়ক। তিনি বললেন, “মন্ত্রীর সংসদে প্রোগ্রাম আছে।”
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদের কোনো কমর্সূচি না থাকার তথ্য দেন এক কর্মকর্তা। কিন্তু তাকেও তখন পর্যন্ত অফিসে আসতে দেখা যায়নি।
দেরি করেও তারা ‘টাইমলি’ আসেন
সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের পাঁচটি মন্ত্রণালয় ঘুরে কোনো সচিবকেই সকাল ৯টার মধ্যে দপ্তরে আসতে দেখা যায়নি। তবে অফিস শুরুর স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থ সচিবের মতো কয়েকজনকে উপস্থিতি হতে দেখা যায়।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিয়াউল হক ৯টা ৭ মিনিটে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি সবসময় টাইমলি আসি, নয়টার আগেই অফিসে আসার চেষ্টা করি।”
যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব উল আলম ৯টা ৭ মিনিটে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন।
এই দুই সচিব একত্রে প্রবেশ করেন সচিবালয়ের এ ভবনটিতে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুর রহমান তরফদার ৯টা ৩০ মিনিটে প্রবেশ করেন।

তিনি বলেন, “নিয়মিত সকাল ৯টার মধ্যে প্রবেশ করি, আজকে ৯টার পরপরই আসছি।”
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিব মোহাং শওকত রশীদ চৌধুরী ৯টা ২০ মিনিটে প্রবেশ করেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক সকাল ১০টায় প্রবেশ করেন নিজের দপ্তরে।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুনিমা হাফিজ ৮টা ৫৭ মিনিটে ৭ নম্বর ভবনে নিজের মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করেন।
সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তাহমিনা আক্তারও দপ্তরে এসেছেন ৯টার আগেই।
৭ নম্বর ভবনের পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো মন্ত্রীই বেলা ১১টা পর্যন্ত আসেননি।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করেছেন সকাল ১১টায়।
সকাল ১০টার দিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সহকারী একান্ত সচিব শেখ সাহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকে দুই বেলা সংসদ থাকার কারণে মন্ত্রী মহোদয় অফিসে যাবেন না।”
শিক্ষা ও বিমান মন্ত্রণালয়ের চিত্র
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময়ে নৈতিকতার কথায় আকৃষ্ট করা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকেও তার দপ্তরে বেলা সোয়া ৯টায় গিয়েও পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, তিনি বরিশালে একটি কর্মসূচিতে গেছেন।
একই সময় ওই মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শিবলী সাদিকের কক্ষে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি আসেননি। কখন আসবেন বলতে পারছি না।”
পাওয়া যায়নি মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. বোরহান উদ্দিনকেও।
কিন্তু ৯টার মধ্যে তারা থাকার কথা, এমন প্রশ্ন করলে দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “থাকার কথা, কিন্তু আছেন, হয়ত কোনো কাজে।”
সকাল ৯টা ২১ মিনিটে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানমকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, “উনি আসতেছেন। এসে একটা মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার কথা।”
পরে ৯টা ৩৪ মিনিটের দিকে মন্ত্রী তার দপ্তরে আসেন।
ওই মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম এবং মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব আবদুল আউয়ালকে পাওয়া যায়নি সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এ বিষয়ে কেউ কিছু জানাতে পারেননি।

আর সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে হাজিরা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোসা. এলিজা আক্তার। একইসঙ্গে প্রবেশ করেন আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। যাদের প্রত্যকের আসার কথা ছিল ৯টায়।
অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রউফ আসেননি বেলা সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, “স্যার আসবেন ১০টার মধ্যে। আপনি সামনে সোফায় অপেক্ষা করেন।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “৯টার মধ্যেই আসার কথা কিন্তু, পথে বোধ হয় জ্যাম ছিল।”
ভিন্ন চিত্র জনপ্রশাসনে
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে যে চিত্র দেখা গেছে, তার উল্টোটাই দেখা গেল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে, যেখান থেকেই মূলত মাঠপ্রশাসন ও আমলাদের কাজের সমন্বয় করা হয়ে থাকে। কর্মীদের পদায়ন, পদন্নোতি ও শাস্তির সবকিছু হয়ে থাকে এখান থেকেই।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের নতুন এ ভবনটিতে অফিস করায় এখানকার চিত্র আর আগের মতো নেই।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সকালে ৮টা ৪০ মিনিট থেকে পৌনে ৯টার মধ্যেই দপ্তরে প্রবেশ করেন।
এ দপ্তরে দর্শনার্থীর ভিড় বেশি থাকায় এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক বেশি থাকায় তিনি একদম সকালে, ১০টার মধ্যে নথিতে সই করেন। এরজন্য সচিবও আসেন সে সময় অনুযায়ী। এর প্রভাব পড়েছে অন্য কর্মীদের মধ্যেও।
এদিনও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সকাল ৯টার কয়েক মিনিট আগেই নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন মো. আব্দুল বারী।
প্রতিমন্ত্রী দপ্তরে আসার আগেই নিজের কক্ষে বসেছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক।
কর্মীদের উপস্থিতি, কর্মবিরতি, কর্মে শৃঙ্খলার ব্যত্যয় দেখভালের দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়েরই।
তাই সচিবালয়ে কর্মীদের নির্ধারিত সময়েও অনুপস্থিত থাকা নিয়ে এহছানুল হকের কাছে জানতে চায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

চারজন প্রতিবেদক সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য জনসংযোগ দপ্তরের দ্বারস্থ হলে প্রথম দফায় এহছানুল হক ‘ব্যস্ততা দেখিয়ে’ কিছুক্ষণ বসার জন্য খবর পাঠান। প্রায় ৩৫ মিনিট অপেক্ষার পর খবর পাঠান যে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না।
সকাল থেকে সংসদ থাকায় এ সময় অফিস ছাড়েন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। পরে তাকে মুঠোফোনে সরাসরি তিনজন প্রতিবেদক বিভিন্ন সময়ে ফোন করলেও সাড়া দেননি তিনি। পরে তার মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো হয়; সংসদের বিরতিতে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
সরকারি কর্মীদের সময়তো দপ্তরে আসা এবং বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত দপ্তরে অবস্থান করার নির্দেশনা এসেছিল মন্ত্রিপরিষদ থেকে। এর বাস্তবায়ন কী হচ্ছে? তা কী আদৌও পর্যবেক্ষণ করা হয়?
এ ব্যাপারে জানতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির দপ্তরে গেলেও তখন একটি বৈঠকে চলে যাওয়ায় তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘বেতন কাটা হলে ঠিক হয়ে যাবে’
২০০৩ সালে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব সা’দত হুসাইনের স্বাক্ষরে প্রথম এমন আদেশ জারি হওয়ার তথ্য দিয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “এটার ফরওয়ার্ডিংয়ে আমার স্বাক্ষর ছিল, আমি তখন কেবিনেট ডিভিশনের উপসচিব।
“এবার সরকার নতুন করে আগেরটাই জারি করেছে। সেখানে আমরা বলে দিয়েছিলাম, মন্ত্রী বা সচিব এই সময়ে কাউকে ডাকবেন না এবং কাদের বেলায় এটা প্রযোজ্য হবে না, সেটাও বলে দিয়েছিলাম।”
ওই আদেশ জারির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এটা মূলত করা হয়েছিল দুইটা কারণে। একটা কারণ হল, যাতে সবাই সময়মত অফিসে আসেন। এখন অনেকেই ধরেন, হয়ত ১১টায় কোথাও মিটিং আছে, উনি আর অফিসে যান না, বাসা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত থেকে ১১টার মিটিংয়ে যান।
“এই কারণে সবাই আগে অফিসে যাবেন, এরপর অফিস থেকে তার মিটিং-সিটিং বা যে কাজ থাকে, সেখানে যাবেন। আর মানুষও জানল যে, ওই সময়টায় তাকে অফিসে পাওয়া যাবে। ভিজিটর যারা, তাদেরও সুবিধা হল, তাদের বসে থাকা লাগল না।”
সাবেক এই সচিব বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য যে, অফিস সময়ে দেরি করে, গল্প করে, আড্ডা দেয়, আগে চলে যায়; এটা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে নাই যে দেরি করে অফিসে যাওয়া, আগে চলে যাওয়া বা অফিস ‘আওয়ারে’ বসে আড্ডা দেওয়া।
“আমি জানি না, এটা কীভাবে সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী নিজে ঠিক সময়ে যান বা উনি সবাইকে এটা আহ্বান জানিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “এটা মূলত নির্ভর করবে, আমি মনে করি, সচিব বা সংস্থার প্রধানদের উপরে। সচিব বা সংস্থা প্রধানরা যদি সময়মত অফিসে যায় এবং এটা মনিটর করে, তাহলে এটা বাস্তবায়ন হতে পারে।
“কিন্তু সচিবেরা নিজেরা সময়মত না গেলে এবং মনিটর না করলে কোনো আদেশ বা অনুরোধ জানিয়ে কোনো লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না।”
এই নির্দেশনা মন্ত্রীদের জন্য না হলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রীকে অফিস করতে দেখার কথা বলেন সরকারের সাবেক এই কর্মকর্তা।
তার ভাষায়, তারা যদি প্রধানমন্ত্রীর মতো অফিস করা শুরু করেন, তাহলে অফিসের উপস্থিতি বাড়বে এবং শৃঙ্খলা ফিরতে বাধ্য।

কর্মকর্তাদের ঠিক সময়ে আসার এই নির্দেশনা যে শুরু থেকেই হোঁচট খেয়েছিল, তার একটি উদাহরণ দেন সাবেক মুখ্যসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার।
তিনি বলেন, “যখন ড. সা’দত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন, তখন আদেশটা হয়েছিল, ৪০ মিনিট কোনো মিটিংয়ে যেতে পারবে না।
“কিন্তু মুখ্যসচিব ড. কামাল সিদ্দিকী ঠিক ৯টার সময় মিটিং ডাকা শুরু করলেন, বিভিন্ন দিনে। আমিও একজন সচিব ছিলাম, যে নোটিস পেতাম। আমাদেরতো ড. কামাল সিদ্দিকীকে অমান্য করার উপায় ছিল না, আমাদের মিটিংয়ে যেতে হত। তো, ওই লেভেলে যদি নিজেরা অর্গানাইজ না হয়, এটা নিচের লেভেল থেকে কার্যকর হবে না।”
হাজিরার বিষয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “হাজিরা মনিটরিংয়ের জন্য সিস্টেম আছে, কেউ যদি দেরি করে তার জন্য নিয়মও আছে। কয়দিন দেরির জন্য কয়দিন অনুপস্থিত ধরা হবে, বেতন কাটা হবে। যদি বেতন কাটা হয়, তাহলে এক মাসেই ঠিক হয়ে যাবে।”
আলী ইমাম মজুমদার বলেন, “সরকারের নির্দেশ যেটা আছে, সেটাকে কঠোরভাবে কার্যকরের জন্য যে ব্যবস্থা আছে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। না হয় এটা হবে না। শুধু বললেই হবে না, কেউ না করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”