Published : 13 Aug 2025, 01:17 PM
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক-চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের চলে যাওয়ার এদিনে তাদের স্মরণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
বুধবার তাদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিন বিকেল সাড়ে ৫টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বীর উত্তম মীর শওকত সড়কের গ্রাউন্ড জিরোতে অনুষ্ঠিত হবে ‘চলচ্চিত্র পথ’ শিরোনামের বিশেষ আয়োজন।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, 'চলচ্চিত্র পথ' অনুষ্ঠানে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের জীবন, দর্শন, সৃজনশীল কোলাবরেশন ও চলচ্চিত্রে তাদের অবদানের বিষয়গুলো আলোচনা করবেন অতিথিরা।
তাদের নিয়ে স্মৃতিচারণা করবেন নির্মাতা প্রসূন রহমান, নাহিদ মাসুদ ও আসিফ মুনীর। দর্শকদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন তারা।
পাশাপাশি প্রদর্শিত হবে তারেক মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’, যে কাজের চিত্রগ্রাহক হিসেবে ছিলেন মিশুক মুনীর।
এছাড়া তারেক মাসুদকে নিয়ে নির্মিত প্রসূন রহমানের ‘ফেরা’ সিনেমাটিও দেখানো হবে এ অনুষ্ঠানে। আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন আয়োজকরা।
২০১১ সালের ১৩ অগাস্ট ‘কাগজের ফুল’ সিনেমার লোকেশন দেখে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরের জোকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নির্মাতা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন।

ওই দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক মুস্তাফিজ, তারেক মাসুদের প্রোডাকশন ম্যানেজার ওয়াসিম ও কর্মী জামালও মারা যান।
গাড়িতে থাকা তারেকের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, চিত্রশিল্পী ঢালী আল-মামুন ও তার স্ত্রী দিলারা বেগম জলি এবং তারেকের প্রোডাকশন ইউনিটের সহকারী সাইদুল ইসলাম আহত হলেও তারা প্রাণে বেঁচে যান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তিনি মাটির ময়নার পরিচালক তারেক মাসুদ। জাতীয় আত্মপরিচয়, লোকজ ধর্ম ও সংস্কৃতি তার সিনেমায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

১৯৫৬ সালে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করা তারেকের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল মাদ্রাসায়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি।
১৯৮৯ সালে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে ‘আদম সুরত’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন তারেক মাসুদ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ১৯৯৫ সালে তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান ও মুক্তির কথা (১৯৯৬) প্রশংসিত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
এরপর ২০০২ সালে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড পায়। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ছিলেন এই চলচ্চিত্রের সহ পরিচালক।
নিজেদের প্রোডাকশন হাউজ অডিও-ভিশন থেকে এরপর অন্তর্যাত্রা (২০০৬) ও রানওয়ে (২০১০) নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মাসুদ ও ক্যাথরিন।
১৯৪৭ এর দেশভাগ নিয়ে ‘কাগজের ফুল’ নামে আরেকটি সিনেমা বানানোর কাজে হাত দেওয়ার পরপরই ২০১১ সালের অগাস্টে সেই দুর্ঘটনা ঘটে।
ক্যামেরার পেছনে কাজ করে যে বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আশফাক মুনীর মিশুক ছিলেন অন্যতম। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যম যে কুশলীদের হাত ধরে নতুন যুগে পা রেখেছে, তাদের একজন তিনি।
শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিবিসির ভিডিওগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই সাবেক শিক্ষক মিশুক মুনীর নামেই পরিচিত।
বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তিমালিকানাধীন টেরিস্ট্রেরিয়াল টেলিভিশন একুশে টিভিতে হেড অব নিউজ অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মিশুক মুনীর কানাডার রিয়েল টেলিভিশন, চ্যানেল ফোর ও সিবিসিতেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
২০১১ সালে ওই দুর্ঘটনার আগের বছর তিনি যোগ দেন এটিএন নিউজে। সেখানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব নেন।

তারেক মাসুদের সিনেমা রানওয়ের প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছিলে মিশুক মুনীর। এছাড়া ‘রিটার্ন টু কান্দাহার’, ‘ওয়ার্ডস অব ফ্রিডম’ প্রামাণ্যচিত্রগুলোতেও তিনি ছিলেন ক্যামেরার পেছনে।
তার চিত্রগ্রহণের প্রামাণ্যচিত্র টোকাই (১৯৮৬) ওবার হাউজেন ইন্টারন্যাশনাল শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে এবং রিটার্ন টু কান্দাহার (২০০৩) কানাডার এম্মি জোমিনি অ্যাওয়ার্ডে পুরস্কৃত হয়।
১৯৫৯ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা মিশুক মুনীরের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। একাত্তরে পাকিস্তানি ঘাতকেরা যখন মুনীর চৌধুরীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়, ১২ বছর বয়সী মিশুক ছিলেন তার প্রত্যক্ষদর্শী।