Published : 09 Mar 2026, 02:42 PM
মার্কিন কিংবদন্তি নির্মাতা অরসন ওয়েলসের প্রশংসা আর সুপারিশেই হলিউডের ফিল্ম স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। পরে সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে যেতে গিয়ে তিনি চিত্রনাট্য নিয়ে পরামর্শ নেন দুই কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের কাছ থেকেও।
তবে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের পথেই আর এগোননি তিনি; ঋণ ও আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি ভেবে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন জুয়েল আইচ।
কদিন আগে একটি টেলিভিশন স্টেশনে পডকাস্ট অনুষ্ঠানে এসে কথাগুলো বলছিলেন জুয়েল।
হলিউড ফিল্ম স্কুল থেকে চলচ্চিত্রের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন জুয়েল আইচ। সেখানে এই স্কুলে ভর্তির প্রেরণায় ছিলেন অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘সিটিজেন কেইনের’ অভিনেতা ও নির্মাতা অরসন ওয়েলস। জুয়েল আইচের জাদু দেখে মুগ্ধ হয়ে বিজনেস কার্ড দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের এই স্কুলটিতে পাঠান অরসন।

জুয়েল আইচ স্মৃতিচারণ করে বলেন, "১৯৮১ সালে 'সোসাইটি অব আমেরিকান ম্যাজিশিয়ানস' এদের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার শো দেখে সবাই খুব প্রশংসা করেছিল। শো শেষে একজন ছেলে এসে আমাকে বলেন, 'জুয়েল তোমার জন্য অরসন অপেক্ষা করছে'। আমি তো তাদের দেশের সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ নই, আমি প্রথমে অত গুরুত্ব দেইনি।“”
তিনি বলেন, “গিয়ে দেখি অনেকগুলো লোক একজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, আর উনি বসে আছেন। আমি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উনার পাশের সিটটা ফাঁকা করে দিলেন, দেখি একজন বেশ ভারিমত মানুষ বসে আছেন এবং বললেন, মাই বয়, ইট ওয়াজ এ স্পেক্টাকুলার শো।’ আমি তখন কণ্ঠটা শুনে বুঝলাম আরেহ তিনি তো সিটিজেন কেইনের অরসন ওয়েলস।"

ওয়েলস তাকে বললেন, গল্প বলতে বলতে যেভাবে তিনি ম্যাজিক দেখান, সেই গল্পভিত্তিক উপস্থাপনা সিনেমায়ও ভালো কাজ করবে।
জুয়েল আইচ বলেন, “ওয়েলস বলেন, ‘তুমি গল্প বলে বলে যেভাবে ম্যাজিক দেখাও, যেভাবে গল্প জুড়ে ম্যাজিক করতে পার তুমি যদি সিনেমা কর তুমি খুব ভালো করবে’। তো অরসন ওয়েলসের মুখ থেকে যখন এই কথা শুনে আমি বললাম আমি সিনেমা করব এভাবে করে ভাবিনি কখনো।
"তিনি বললেন, 'তুমি একটা কাজ কর তুমি এখানে চলে যাও।' তিনি উনার বিজনেস কার্ড বের করে দিয়ে ঠিকানাটা দিলেন। দিয়ে বললেন এইখানে চলে যাও। একটা চিঠিও দিলেন মানে দুইটা কার্ড দুইটা কার্ডের পিঠে লিখে দিলেন এবং অরসন পাঠিয়ে দিয়েছেন, আমি গেলাম যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাকে নিয়ে নিলেন। অরসনের সুপারিশ মানে তো বিশাল ব্যাপার।”
ওয়েলসের সেই সুপারিশ নিয়ে জুয়েল আইচ লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফিল্ম স্কুলে যান এবং সেখানে তিন মাসের একটি শর্ট কোর্স করেন।
পরবর্তীতে জাদুশিল্পীকে সিনেমায় পাওয়া গেল না কেন প্রশ্নে তিনি বলেন, "আমি খুব সিরিয়াস ছিলাম, সিনেমা নিয়ে পাগলের মত হয়ে গেছিলাম। আমি দেশে ফিরে জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি' বই থেকে তিনটা সিনেমা তৈরি করব বলে চিত্রনাট্য লিখে ফেললাম। আমার চিতনাট্য হল কিনা সেটা দেখানোর জন্য চলে গেলাম এখন স্ক্রিপ্ট করে হলো কি না এইটা বোঝার জন্যে আমি চলে গেলাম কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের কাছে।"

সত্যজিৎ রায়ের কাছে পৌঁছানোর গল্প তুলে ধরে জুয়েল বলেন, “সত্যজিতের দেখা কি করে পাওয়া যাবে এই চিন্তায় ছিলাম, আমার বয়স তখন কম আমাকে চেনে না কেউ, সিনেমা লাইনে কেউই চেনে না। তখন আমি জানলাম যে আনন্দবাজারের সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষের সঙ্গে উনার খুব ভালো সম্পর্ক। আমি গৌরকিশোর ঘোষের কাছে চলে গেলাম। উনি ফোন করে দিলেন, উনার ফোনে আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলেন একটা। আমি সময়মত গিয়ে পৌঁছালাম, উনাকে স্ক্রিপ্ট দিলাম, স্ক্রিপ্ট লেখার কায়দা দেখে বললেন যে, 'আরে তুমি তো বেশ হোমওয়ার্ক করে এসেছ বলে মনে হচ্ছে।'
সেই স্ক্রিপ্টে সত্যজিৎ রায় কিছু সংশোধন করে দিয়েছিলেন।
জুয়েল আইচ বলেন, "ওই স্ক্রিপ্টের পাশে স্পেস রেখে কিছু ছবি আমি এঁকেছিলাম কীভাবে কী করব এটা বুঝানোর জন্য, যেহেতু আমি ছবি আঁকতে পারি। সত্যজিৎ রায় আমাকে পাঁচ-ছয় দিন পরে একটা ডেট দিলেন, বললেন আমি একটু পড়ে দেখি তারপর তুমি এই তারিখে এস। আমি গেলাম দেখি উনি একেবারে লাল কালিতে নানান জায়গায় অনেক কিছু লিখলেন কোথাও কেটে দিয়েছেন কোথাও নিজে জুড়ে দিয়েছেন, কোথাও স্টার মার্ক করে দিয়েছেন এবং বললেন, 'তুমি পারবে, কাজে লেগে যাও।'"
এরপর পূর্ববাংলার বাস্তবতা বোঝার জন্য তিনি চাইলেন ঋত্বিক ঘটকের পরমর্শ নেওয়া। তাকে খুঁজতে আবারও আনন্দবাজারে গিয়ে তথ্য নেন। পরে কলকাতার এসপ্ল্যানেডে গিয়ে দেখা পান এই নির্মাতার।
সেই গল্প তুলে ধরে জুয়েল বলেন, "আমার ধারণা হলো সত্যজিৎ রায় কলকাতার ব্যাপারটা যত ভালো বোঝেন তার চাইতে পূর্ব বাংলার ব্যাপারটা বুঝবেন ঋত্বিক ঘটক বেশি। আমার মনে হল আমি ঋত্বিক ঘটকের পরামর্শ নেব।
"আমি আবার আনন্দবাজারে যাই, সেখানকার এক তরুণ সাংবাদিক বললেন, কলকাতার এসপ্ল্যানেডে চৌরঙ্গীর মোড়ে দুপুরে পাওয়া যাবে উনাকে। আমি সেখানে গিয়ে দাঁড়াই, দেখি ঋত্বিক ঘটক আসছেন।"
সিনেমা বানানোর কথা শুনে জুয়েলকে ঋত্বিক বলেছিলেন, 'ও ভূতে ধরছে'।
জুয়েল বলেন, "দেখি একটা খাটো ধরনের লোক, ধুতি হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পরা, চুল আঁচড়ানো নয় খোঁচা খোঁচা দাড়ি একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর আমি গিয়ে কথা বললাম, একটা ছবি বানাতে চাই আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চাচ্ছি। উনি বললেন, 'ও ভূতে ধরছে'। উনি একদম বাঙ্গাল ভাষায় বললেন, 'তুমি যে মোর সঙ্গে কথা কইবা আমারে ভাত খাওয়াইতে পারবা?' ঋত্বিক ঘটক এ কথা বলছেন, আমি উনাকে পারলে তো গ্র্যান্ড হোটেল নিয়ে খাওয়াই।"

তারপর দুজন একটি ছোট ভাতের হোটেলে বসে দীর্ঘ আলাপ করেন।
ঋত্বিক ঘটককে দুপুরে একবেলা খাওয়ানোর কথা স্মরণ করে জুয়েল বলেন, "চলেন কোথায় খাবেন। আসো মোর সঙ্গে, উনি একটা সরু গলি করে একটা ভাতের হোটেলে গেলেন, মানে সস্তা একটা হোটেল। উপরে একটা ফ্যান ঘটর ঘটর করে শব্দ করে ঘোরে ওর নিচে গিয়ে বসলেন। তারপরে অর্ডার করলেন, খাওয়া খুবই সামান্য মানে একটা লাবড়ার মত কিছু একটু, ডাল আর একটা মাছের ঝোল খুবই অল্প পয়সায় হয়ে গেল। ওই খেতে খেতে তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি যে সিনেমা বানাবা তুমি কি পাওনাদারের খোঁচা সইতে পারবা , হাত দিয়ে দেখালেন 'এরকম খোঁচা সইতে পারবা?'"
জুয়েল বলেন, "এই কথা বলছেন কেন? ঋত্বিক বললেন, 'এই কলকাতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খেয়াল গানের প্রোগ্রাম যখন হয়, প্রোগ্রামের আগে সব টিকেট বিক্রি হয়ে যায়। সেই কলকাতায় আমার সিনেমা খায় না, আমার মাল অচল। আমার সবচাইতে খারাপ যে সিনেমাটা 'মেঘে ঢাকা তারা' ওইটা খুব খাইছিল।
"ওইটা খাইছিল খুব, তো এখন কোনটা খাবে কোনটা খাবে না এইটা তুমি জানো না। তুমি আমার কাছে আসছ কেন আমি বুঝি, তোমার কিছু বলার আছে বলেই। আমি বললাম, হ্যাঁ তা তো বটেই। আমি তো শুধু শুধু ব্যবসা করার জন্য সিনেমা করব না, আমি কিছু বলতে চাই বলে সমাজকে কিছু দিতে চাই বলে করব।
জুয়েলকে আরেকটু চিন্তা ভাবনা করার সময় দেন ঋত্বিক। তা জানিয়ে এই জাদুকর বলেন, "' ঋত্বিক বললেন, 'সেইখানেই তো মুশকিল তুমি যে আমার কাছে আসছ ওইটা দেখেই আমি বুঝছি যে ভূত পাইছে তোমাকে। তুমি যাও আজকের রাতটা ঘুমাও, ঘুম তো আসবে না বুঝছি কালকে আবার আসো এই সময়। যদি আসো তাইলে বুঝব যে তুমি সাহস করছ আর যদি না আসো তাইলে বুঝব যে সাহস হারিয়ে ফেলেছ।'"

তবে শেষ পর্যন্ত সেই পথেই আর এগোননি জুয়েল আইচ।
সিনেমা নির্মাণ থেকে সরে দাঁড়ালেন জুয়েল আইচ।
"আমার আর ভালো লাগল না কিছুতেই, আমি আসলে পাওনাদারের খোঁচা আমি সইতে পারি না। আমি ঋণ করতেই পারি না, না খেয়ে থাকব তাও ভালো কিন্তু ঋণ করতে পারি না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম না আমি এ পথে পা বাড়াব না।"
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ ১৯৮০ সালে অভিনয় করেছিলেন কালজয়ী সিনেমা ‘ছুটির ঘন্টা’য়। এরপর পরপর তিনটি সিনেমায় নায়ক হবার প্রস্তাব-ও পেয়েছিলেন তিনি। তবে সে সময় জাদুশিল্পকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।