Published : 20 Nov 2025, 01:57 PM
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি সম্ভারে বুঁদ হয়ে বিশ্বকবিকে তিনি ভাবতের নিজের ‘পরমাত্মীয়’। যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর ‘আত্মীয় বিয়োগের’ ব্যথা পেয়েছিলেন মনে। পালন করেছিলেন ‘অশৌচ’। তিনি কিংবদন্তী গীতিকার-সুরকার সলিল চৌধুরী।
বলা হয়ে থাকে বাংলা গণসংগীতের সূচনা নজরুলে, আর পরিণতি সলিল চৌধুরীতে। নজরুল যখন অস্তমিত, তখন সলিলের আবির্ভাব। সেই কিংবদন্তীর জন্ম শতবর্ষ উদযাপিত হয়েছে বুধবার।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বছর দুই পর ১৯৪৩ সালে সলিল চৌধুরী লেখা শুরু করেন ছোট একটি নোটবইয়ে। প্রায় ডায়েরি লেখার ঢঙে, নোটবইয়ের শিরোনাম ছিল ‘রত্মকোষ’। যা পরে অসমাপ্ত আত্মজীবনী 'জীবন উজ্জীবন এবং…’ শিরোনামে প্রকাশ হয়। সেখানে সলিল তার শৈশবের দিন থেকে শুরু করে কৈশোরোত্তীর্ণ যৌবনের চৌকাঠে পদক্ষেপের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। ফাউন্টেন পেনে এঁকেছেন রবি ঠাকুরের রেখাচিত্রও।
অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী 'জীবন উজ্জীবন’র এক অংশে সলিল চৌধুরী লিখছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকের লেখা নিয়ে তার উপলব্ধির কথা। স্কুলে পুরস্কার পাওয়া সঞ্চয়িতা আর গল্পগুচ্ছ পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, অতীতে যা কিছু পড়েছেন, সবই যেন তুচ্ছ। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো বারবার পড়ে সলিল বুঝতে চাইতেন, ভেতরের ‘জাদুটা কোথায়’। রবীন্দ্রনাথের লেখার সঙ্গে নিজের মনজগতের সংযোগ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার সাপ্তাহিক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘রোববার’ সলিল চৌধুরীর আত্মজীবনীর সেই অংশটি প্রকাশ করেছে তার জন্মশতবার্ষিকীতে। সেই অংশটুকু তুলে ধরছে গ্লিটজ।
***
রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনে যখন এলেন, তখন আমি ক্লাস VIII-এর ছাত্র। স্কুলে প্রাইজ পেয়েছিলাম সঞ্চয়িতা আর গল্পগুচ্ছ দু'খণ্ড। রবীন্দ্রনাথ পড়ার পর মনে হল এতদিন যা পড়েছি সব জোলো। তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেই আমি Recitation-এ ফার্স্ট হয়েছি বহুবার। পাগলের মতো এর-ওর-তার থেকে চেয়ে কিংবা লাইব্রেরি থেকে জোগাড় করে অনেক রাত জেগে জেগে পড়তাম।... এক একটা কবিতা বার বার পড়ে খুঁজতে চাইতাম যেন ওঁর জাদুটা কোথায় লুকিয়ে আছে। তখন আমি তেরো-চোদ্দ বছরের কিশোর, তবু তাঁর অসম্ভব পরিশীলিত refined মনকে যেন বুঝতে পারতাম। কেন জানি না, তাঁকে আমার পরমাত্মীয় মনে হত।...
জীবনে যদিও কোনোদিন তাঁকে কাছ থেকে দূরে থাক, দূর থেকে দেখারও সৌভাগ্য হয়নি, মনে হত আমার চিন্তার জগতে ওঁর চেয়ে আপনজন আমার আর কেউ নেই। যখন মারা গেলেন, তখন আমি বঙ্গবাসী কলেজের সেকেন্ড ইয়ার আইএসসি-র ছাত্র- ১৭ বছরের তরুণ। সারা কলকাতা ভেঙে পড়া সেই মৃতদেহের প্রোসেশন দেখলাম, আর লাউড স্পিকারে বাজছিল তাঁর কণ্ঠের 'বহুদিন মনে ছিল আশা/ ধরণীর এক কোণে/ রহিবে আপন মনে'।
শতবর্ষে সলিল: তার মত নির্ভীক সুরকার আর আসেননি, বললেন শান্তনু
আমি একটা বাড়ির রকে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। সেই আমার সচেতন জীবনের প্রথম আত্মীয় বিয়োগ। কাউকে না বলে এক মাসের অশৌচ নিলাম।
তখনো দাড়িগোঁফ ভালো করে ওঠেনি-কামাবার প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু খালি পায়ে কলেজে আসতাম, মাছ-মাংস খেতাম না।... তখন আমি গ্রাম থেকে ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করতাম। বেলেঘাটা (শিয়ালদহ সাউথ) স্টেশন থেকে খালি পায়ে হেঁটে বঙ্গবাসী কলেজ পর্যন্ত কলকাতার পিচগলা রাস্তায় আসতে পায়ের পাতায় ফোসকা পড়ার মত হত, কিন্তু ওটুকু কষ্ট আমার সবচেয়ে প্রিয়জনের জন্য করছি ভেবে ভালো লাগত।
মনে আছে, দিদিমা বা মামারা কেউ আমাকে কিছু বলেননি। শুধু অবাক হয়ে বোঝবার চেষ্টা করতেন কী দুঃখ আমার জীবনে ঘটল। সে কথা তাঁদের বোঝাবার আমার কোনো উপায় ছিল না...।