Published : 16 Feb 2025, 01:47 PM
সংগীতের দীর্ঘ জীবনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় এই বাংলায় বেশি সাড়া তুলেছিলেন ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গেয়ে। এই গানটি ছাড়াও খালি গলায় ‘টেনর কণ্ঠের’ এই গায়ক আরো কিছু গান করেছেন, যেসব গান মানুষের বাঁচার কথা বলেছে, দেখিয়েছে বঞ্চনামুক্ত এক দুনিয়ার স্বপ্ন, যে সব গান বিভেদকে ছুটি দিয়ে ডাক দিয়েছে মুক্তির। গণমানুষের কথা বলা সেসব গানে প্রতুল হয়ে উঠেছেন ইতিহাস এবং স্বপ্ন দেখানো মানুষ।
প্রতুল প্রয়াত হয়েছেন শনিবার। তার মৃত্যুর পরদিন রোববার কলকাতার সংবাদমাধ্যম রোববারডটইনে প্রকাশিত প্রতুলের একটি সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি গানের সৃষ্টিকথা তুলে ধরেছে গ্লিটজ।
‘চ্যাপলিন’
‘ছোট্ট দুটি পায়ে’ চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে শ্রোতাকে সঙ্গে করে দুনিয়া ঘুরেছেন প্রতুল। যে গানে স্বপ্নের দূরবীন চোখে লাগানো আর ঠোঁটে হাসি ফোটানো ছোট্ট ভবঘুরে চ্যাপলিনকে ভালোবাসা জানিয়েছেন প্রতুল।
প্রতুলের ভাষ্য,’চ্যাপলিন’ গানটির জন্য শ্রোতাদের কাছ থেকে বেশি সাড়া পেয়েছেন তিনি।
প্রতুল বলেন,“সেদিন এক এইটুকুন বাচ্চা আমাকে দেখে বলল, চ্যাপলিন দাদু। ও নাকি সারাক্ষণ চ্যাপলিন শোনে। এরকমও আছে। ৮২ থেকে ৯২ সাল পর্যন্ত মানুষ আমার গান অনেকেই শুনেছেন।“
সাক্ষাৎকারে গায়ক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় প্রতুলকে বলেছিলেন, “আপনি যখন চ্যাপলিন গাইছেন, একেবারে শেষে গিয়ে প্রেম প্রেম প্রেম জায়গাটা আসে, গানের সেই চেহারাটা আমাদের চেনা চেহারা নয়।“
জবাবে প্রতুল বলেছেন, “'মডার্ন টাইমস'-এই বোধহয় 'লাভ লাভ লাভ'-টা ছিল। তখন চ্যাপলিন হ্যাটটা নামিয়ে ভিক্ষে করছে। হঠাৎ 'লাভ লাভ লাভ লাভ' শুরু হয়ে যায়। ইংরেজি সিনেমা দেখে এই অপেরা স্টাইলটা তুলেছিলাম। আরেকটা জিনিস ছিল আমার উপাদান। কীর্তন। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরেটা ওরা কতভাবে গায়!
'নাকোসি সিকেলে আফ্রিকা'
হেরে গিয়ে ফের ফের লড়াইয়ের ডাক দেওয়া গান 'নাকোসি সিকেলে আফ্রিকা'। প্রতুলের নিজের কথায়, এটি ‘বলি দিবাকে নিশা করা’ গান। যে গানে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে মাতৃভূমি বাঁচাতে অভ্যুত্থানের ডাক দেয় একদল স্বপ্নবাজ।
প্রতুল বলেন, “বাচ্চুদা বলে একজন ছিলেন। মহসিন ইন্সটিটিউটে-এ পড়ত। সেখানে আমরা ব্রতচারী শিখতে যেতাম। 'চল কোদাল চালাই' তো শুধু গান না, নাচও তো বটে! ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে নাচছে, গাইছে। মেয়েদের নিয়ে এখন যেটা চলে, সেটা তখন একেবারে ছিল না। সেখানেই আফ্রিকান গান প্রথম শুনেছিলাম। গানটার মানে আমার জানা নেই। এটুকু বুঝেছিলাম- কঙ্গো নদী দিয়ে একটা নৌকো আসছে। নৌকোতে অনেক যাত্রী আছে। সে কুলে এল, কুল থেকে আবার চলে যাওয়ার দিকে রওনা দিল। দূর থেকে নৌকোটা আসছে, গানের ভলিউম বাড়ছে, কাছে এসে গেলে গানটা গমগম করছে। তারপর চলে যেতে যেতে গানটাও কমে যেতে শুরু করল। এভাবে আমাদের গানটা শেখানো হয়েছিল। সেখান থেকে এই সুরটা নেওয়া। কলকাতাতেও তো ওসিবিসা এসেছিল।
“ওরা তো আফ্রিকান গানের চলন আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তবে সুরটা পুরোটা কিন্তু নেওয়া যাবে না। গানের কথা বুঝে বুঝে সুরগুলো বসাতে হবে।

কবিতার দিকে তাকিয়ে সুর করা। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা লেখাতেও এই সুরটা ব্যবহার করেছিলাম- 'চলো হে, চলো হে, লড়াইয়ের দিকে যাই।' একটা গান থেকে আরেকটা গান চলে আসছে। একটা থেকে আরেকটা হয়-এর রাস্তাটাই সব। আমার গান থিয়েটার ছাড়া হবে না। এই গানে হেরে যাওয়ার পর আবারও লড়াইয়ের ডাক দেওয়া হচ্ছে। এই পুরো মুডটা গানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এটা কিন্তু স্বরলিপিতে তোলা যাবে না। গোটা গানটার মধ্যে দিয়ে একটা সিনেমা দেখতে পাওয়া যাবে। এটা হত না, যদি আমি কঙ্গো নদীর সিনটা নিয়ে আসতাম। সেটা অভ্যত্থানের ডাক হয়ে উঠত না। এটাকে আমি বলি দিবাকে নিশা করা।“
'আমি এত বয়সে গাছকে বলছি'...
'আমি এত বয়সে গাছকে বলছি' শিরোনামের গদ্যকবিতাকে গান করেছেন প্রতুল।
এটি গান হয়ে ওঠার গল্পে প্রতুল বলেন, “একবার একটা অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি চলছে। সেই অনুষ্ঠানে কবিতা সিংহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসেছিলেন, অরুণ মিত্রও এসেছিলেন। সকলের কবিতাই কেউ না কেউ আবৃত্তি করবেন ঠিক হয়েছে। শুধু অরুণ মিত্রের কবিতা কে পড়বেন, তা ঠিক হচ্ছে না। গদ্যের মতো তো! একজন আমাকে এসে বললেন, প্রতুলবাবু এটা পড়ে দেবেন। অরুণ মিত্র আসছেন, ওঁর কবিতা কেউ পড়তে চাইছেন না। তো আমি পড়লাম। আমার মতো করে। তার মধ্যে আবৃত্তির যে তথাকথিত ধরন, তা একেবারেই ছিল না। সেটা শুনে অরুণ মিত্র আমাকে ডাকলেন। বললেন, আমি একটু ভয়েই ছিলাম যে, আমার কবিতা কীভাবে পড়া হবে! আপনি আমার ওয়েভলেংথ কী করে বুঝলেন বলুন তো?
“আমাকে সেদিনই বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে বললেন। এদিকে আমি ওঁর বইটই সেভাবে কিছু পড়িনি। অমন স্কলার একজন মানুষ, তাঁর কাছে বইপত্র না পড়ে যাব কী করে? তো, আমি আর যাইনি। পরে আবার এক আবৃত্তির অনুষ্ঠানে দেখা। বললেন, আজকে আপনি কার কবিতা পড়ছেন? আমি বললাম, আমি তো আজ গান গাইব। উনি অবাক হয়ে বললেন, গান গাইবেন! এবার আবার বইমেলায় দেখা। উনি আমায় বললেন, তুমি তো আর এলেই না! আমি বললাম, যাইনি বটে, তবে আপনার একটি কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছি। উনি আরও অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আমার কবিতা! গান! কোন কবিতা? আমি বললাম, 'নিসর্গের বুকে'। শুনে তো উনি প্রায় হতবাক। তখন ওঁর প্রায় আশি বছর বয়স। উনি হাঁটছেন। পাশে মিহির চক্রবর্তী, আর আমি। আমি গান ধরলাম, আমি এত বয়সে গাছকে বলছি...।
“অরুণদার চোখ তখন বিস্ফারিত। বললেন, মিহির তুমি প্রতুলকে নিয়ে শিগগির বাড়িতে এসো। আমি এটা রেকর্ড করে নেব। নইলে তো আর শুনতে পাব না!”
‘ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে’
দশ বছরের এক ক্ষুদে গুরুর কাছে চল্লিশ বছরের প্রতুল তার বহুল আলোচিত ‘ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে’ গানের সুরের আঁধার পেয়েছিলেন। এই গানে ভারতীয় সংগীত এবং পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন শিল্পী।
“আমাদের বাড়িতে বছর দশেকের এক মেয়ে আসত, জানো, সামনের ঝুপড়িতে থাকত। তার নাম নমিতা দলুই। আমি ওকে একটু পড়াশোনা শেখাতাম। তখন রাশিয়ান গান শিখে এসেছি, বাড়িতে গুনগুন করছি। একদিন দেখি, ও আমার সঙ্গে গাইতে শুরু করেছে। ওর গলায় গান ছিল। একদিন খেয়াল করলাম, ও নিজে একটা গান গাইছে। কথাগুলো ছিল এরকম, ডিঙ্গা বরণ করে মা সনেকা, তরী বরণ করে গো/টাকা লিব, পয়সা লিব, লিব কুচিকান শাড়ি গো। এটা চাঁদ সদাগরের ডিঙ্গা বরণে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের গান। পরে শুনলাম, এটা একটা যাত্রায় ও শুনেছে।

“তো আমি বললাম, তুই আমাকে গানটা শিখিয়ে দিবি? সে রাজি হল। শিখতে বসা হল। মোড়ায় মুখোমুখি বসলাম। দশ বছরের গুরু আর চল্লিশ বছরের শিষ্য। ও আমাকে শেখাল। শিখে আমি গাইলাম। শুনে সোজা বলে দিল, হচ্ছে না। আবার আমি জানতে চাইলাম, সুরটা কি হচ্ছে? বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে বাকি গানটা শেখা। বলল, আর তো জানি না। আমি তখন নতুন একটা গান তৈরি করলাম। লোকগানের আধারে অন্য একটা গান হয়ে উঠল। আমার অজান্তেই আমি গানটিকে আন্তর্জাতিকতা দিয়ে ফেললাম। দেখবে, 'পুবের আকাশ' যেখান থেকে শুরু হচ্ছে, সেখানে একটা ওয়েস্টার্ন ছাপ এসে পড়ল। ফলত, ভারতীয় সংগীত আর ওয়েস্টার্নের একটা মেলবন্ধন ঘটে গেল। গানের মাত্রাই বদলে গেল।“
‘আমি বাংলায় গান গাই’
অফিসের একটি প্রতিবেদন লিখতে বসে হঠাৎ করে প্রতুলের মাথায় খেলে গেল ‘আমি বাংলায় গান গাই, বাংলার গান গাই’। গানের ভাবনা আগেই ছিল মাথায়।
প্রতুলের ভাষ্য, “বাংলায় গান গাই, বাংলার গান গাই, বাংলাকে ভালোবাসি- বিভক্তির ক্ষমতা এখানে প্রকাশ পাচ্ছে।“
সেটা ১৪০০ সালের পয়লা বৈশাখ। শতককে স্বাগত জানানো হচ্ছে। কফি হাউসের একটা অনুষ্ঠানে আমার গাওয়ার কথা ছিল। তো আমি অফিসের কাজ নিয়েই বসেছিলাম। একটা রিপোর্ট লিখতে হচ্ছিল। সেটা করতে করতেই মাথার মধ্যে গানের বিষয়টিও চলছিল। একটা জায়গায় কথাগুলো লিখছিলাম। অনেকটা সেই রামপ্রসাদের মতো আর কী! প্রথম লাইনটা এল, আমি বাংলায় গান গাই, বাংলার গান গাই। একটা জিনিস আমায় এই গানটা লিখতে সাহায্য করেছিল।
“নেহরুর কোনও লেখায় পড়েছিলাম, হি ড্রেমট ইন ইংলিশ। এই কথাটা আমাকে তাড়িত করেছিল। স্পোকের বদলে বলা হচ্ছে 'ড্রেমট'। ওই একটা সতো পেলাম, যেটা থেকে জন্ম নিল আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন। সবকিছুই বাংলায় করি, এইভাবেই গানটা এবার এগিয়ে গেল। হয়তো ওই লাইনটা না পড়লে গানটা এভাবে হত না। লাইনটা এই গানের ক্ষেত্রে, বলতে পারি, বেশ উৎকৃষ্ট সারের কাজ করেছিল। বাংলায় গান গাই, বাংলার গান গাই, বাংলাকে ভালোবাসি- বিভক্তির ক্ষমতা এখানে প্রকাশ পাচ্ছে। এই হচ্ছে 'বাংলায় গান গাই' গানটার জন্মকথা।“
আরও পড়ুন-
তিনি ছিলেন 'অনন্য পারফর্মার': প্রতুল স্মরণে সহশিল্পীরা
'আমি বাংলায় গান গাই' গানের শিল্পী প্রতুলের প্রয়াণ
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার
ভালো নেই প্রতুল মুখোপাধ্যায়, চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে