Published : 17 Jul 2026, 12:18 AM
আগের ঋণ থেকে বের হওয়ার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় আসা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল তাদের সফর শেষ করেছে। ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলেছে সংস্থাটি।
গত ১২ জুলাই সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে ঢাকায় আসে আইএমএফের প্রতিনিধি দল। সংস্থাটির মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার ১২ সদস্যের এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
বৃহস্পতিবার সফর শেষ করে ফিরে যাওয়ার আগে আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইভো ক্রজনার বলেন, “নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা র্নিধারণ, আকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে প্রতিশ্রুত সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলবে।”
চলতি অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নিয়ে একটি প্রক্ষেপণ দিয়ে সংস্থাটি বলছে, এবার বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
বাংলাদেশ ক্রমাগত রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির মত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “অর্থনীতিতে এই ধাক্কা এসেছে মূলত অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং খাতের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির চাপে আমদানি ভর্তুকি বেড়ে গেছে ও তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতেও ভূমিকা রেখেছে।
“অর্থনীতির এই চাপ বিদ্যমান থাকাকালে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে।”
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উন্নতি কীভাবে হতে পারে তারও একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে সংস্থাটি বলছে, “সংস্কার কার্যক্রমে গতি এনে রাজস্ব আদায় বাড়ান ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার সমাধান করতে পারলে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উন্নতি হতে পারে।”
ব্যাংকিং খাতে উচ্চ ঝুঁকির মাত্রা এখনো বেড়ে চলছে বলেও মনে করছে আইএমএফ।
ইভো ক্রজনার বলেন, “এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা এবং সরকারের সংস্কার অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করা। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারি নানা দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে আইএমএফ মিশন।”
আলোচনায় সরকারের ঋণ চাহিদার আকার, পরবর্তী সম্ভ্যাব্য ঋণ মঞ্জুরের মাপকাঠি কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয় বলেও তথ্য দেন ইভো ক্রজনার।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নেওয়া সম্ভ্যাব্য সংস্কার কার্যক্রমের বাস্তবায়নের দিকে আইএমএফ খেয়াল রাখবে বলেও বিবৃতিতে বলা হয়।
ইভো ক্রজনার বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক এবং মুদ্রাস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের চড়া দাম এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটার ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি ভর্তুকির ব্যয়ও বেড়েছে, যা দেশের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করে ফেলেছে।
“যদিও এই সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে শক্তিশালী প্রবাহ বেড়েছে, যার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। তারপরও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে।”
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের উপর বাড়তি চাপ কমিয়ে আনতে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেয় সংস্থাটি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুপারিশ দিয়ে ইভো ক্রজনার বলেন, “রাজস্ব সংগ্রহ বাড়িয়ে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। সংস্কারের ফলে সৃষ্ট চাপ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে সামাজিক সহায়তার কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করা উচিত।’”
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ভিত্তি তৈরিতে একটি কৌশল নির্ধারণেরও পরামর্শ দেন ক্রজনার। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাতকে সুশৃঙ্খলভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ২০২২ সালের শেষ দিকে আইএমএফের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তারা সংস্থাটির সঙ্গে ৪৭০ কোটি (৪.৭০ বিলিয়ন) ডলারের ঋণ চুক্তি করে। সেই ঋণের চার কিস্তির অর্থ পেয়েছে বাংলাদেশ পায়নি। পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তি এক সঙ্গে দেওয়ার কথা ছিল, তা নিয়ে আলোচনাও চলছিল।
এরই মধ্যে গেল ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে আইএমএফের ঋণ শর্ত নিয়ে সংস্থার সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। আগের ঋণ থেকে বেরিয়ে নতুন ঋণ নিতে আইএমএফকে প্রস্তাব দেয় সরকার। গত ৩ জুন আইএমএফ আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশের আবেদনের তথ্য দেয়।
নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।
তবে আইএমএফ কত অংকের ঋণ দেবে তা নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। সেই ঋণের শর্ত ঠিক করতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্র ও সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতেই প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল তারা।