Published : 20 Jul 2025, 12:31 PM
টেলিভিশনের যে সময়কে স্বর্ণযুগের ভেতরে ধরা হয়, সেই সময়ের একজন অভিনেত্রী আফসানা মিমি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চারটি নাটকে কাজ করেছেন। যে চারটি কাজই মিমিকে এনে দেয় দর্শকপ্রিয়তা।
সেইসাথে অভিনেত্রীকে এক অনন্য অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়েছিল 'কোথাও কেউ নেই', 'নক্ষত্রের রাত', 'সবুজ সাথী', এবং 'অদেখা ভুবন' নামের নাটকগুলো।
লেখক-নির্মাতার হুমায়ূন প্রয়াণ দিবস ঊনিশে জুলাইয়ে গ্লিটজের সঙ্গে আলাপে মিমি বলেছেন, এই পরিচালক ছিলেন এমন এক কারিগর, যিনি মানুষের ভেতরটা স্পর্শ করতে পারতেন।
এক কথায় হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কিছু বলতে চাইলে কি বলা যায় জানতে চাইলে মিমি বলেন, "উনাকে নিয়ে এক লাইনে বলতে চাইলে বলব, ভীষণ দরকার ছিল হুমায়ূন ভাইয়ের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাটা।"
কালজয়ী নাটক 'কোথাও কেউ নেই' এর বকুল চরিত্র দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে মিমির কাজ শুরু।
তবে কাজ শুরুর বহু আগেই হুমায়ূনের নাটকের দর্শক ছিলেন মিমি।
তিনি বলেন,"দর্শক হিসেবে আমি উনার প্রথম নাটক দেখি 'এইসব দিনরাত্রি', তারপরে দেখেছি 'বহুব্রীহি' ও 'অয়োময়'। এরপর উনার সঙ্গে আমার কাজের সুযোগ হয়েছিল। উনার সঙ্গে আমি চারটা কাজ করেছি। উনি একজন মানুষ ছিলেন, যিনি মানুষের কলিজায় হাত দিতে পারতেন। "
হুমায়ূনের সঙ্গে চারটি কাজের পর আর কাজ করা হয়নি মিমির। এর পেছনে অভিনয় থেকে মিমির বিরতি এবং হুমায়ূনের পৃথিবী থেকে প্রস্থান নেওয়া, এই দুইটি কারণ কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
যে অপূর্ণতার বেদনাও আজও মিমির মনে বাজে।

‘আবেগ প্রকাশে দ্বিধা ছিল না’
এই কথাসাহিত্যিককে নিয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণও আছে অভিনেত্রীর। শুটিংয়ের সময় সামনে থেকে দেখা হুমায়ূন কেমন ছিলেন সেই স্মৃতিচারণও উঠে এসেছে মিমির কথায়।
হুমায়ূন আহমেদকে মিমি বর্ণনা করেছেন ‘অদ্ভুত মানুষ’ হিসেবে।
“তিনি প্রচণ্ড আবেগ প্রবণ ছিলেন এবং আবেগ প্রকাশে উনি কোথাও দ্বিধা করতেন না। হুমায়ূন ভাই তেমন মানুষ, যিনি মনিটরের সামনে বসে নিজের নির্দেশনা দেওয়া দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজেই কাঁদতেন।"
হাস্যরসের জগতেও হুমায়ূনকে ‘অনন্য’ বলে মন্তব্য করেন মিমি।
"একদিন আমি শুটিং সেটে গিয়ে দেখি উনি কাপড়ের একটা এক্সট্রা হাত লাগিয়ে বসে আছেন। আমি সেটে ঢুকতেই তিনি বলেন, 'মিনি আসো দেখে যাও কি করেছি, বলো এটা কী?' আমি বললাম, 'এক্সটা হাত লাগিয়ে কী করছেন?' উনি বললেন, 'সবাই এসে হাত ধরতে চায়, দুইটা হাতে আর হচ্ছে না। তাই আরেকটা হাত লাগিয়ে নিলাম।' এমন অনেক সূক্ষ্ম দুষ্টুমি উনার ছিল।"
অন্যদিকে শুটিং ইউনিটের মানুষদের প্রতি হুমায়ূনের যত্ন ভালোবাসার কথাও মিমির স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
"উনার কিছু মিষ্টি ব্যাপার ছিল, সেটা হল ইউনিটের ৭০ বা ৭৫ জন মানুষ রয়েছে, ‘সবুজ সাথী’ শুটিংয়ের সময় আউটডোরে আমরা গাছের নিচে বসে খেতাম। মাছ রান্না হয়েছে। হুমায়ূন ভাই গাছের তলায় বসে মাছের মাথা গুণতেন, গুণে নাম ধরে ধরে ভাগ করে দিতেন। আজকে এরা খাবে মাথা, কালকে খাবে তারা এমন করে। মাছের সেই আট দশটা মাথা ইউনিটের সবাইকে ভাগ করে খাওয়াতেন। কারণ মাছের মাথা খেতে সবার ইচ্ছা করে।"

তবে মিমি কেবল হুমায়ূনের প্রতি কেবল মুগ্ধতাই প্রকাশ করেননি, নির্মাতার প্রতি বেশ কিছু পর্যালোচনাও আছে এই অভিনেত্রীর।
মিমি বলেন, "হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে যে আমার শুধু মুগ্ধতা বা ভালোবাসা আছে ব্যাপারটা তা না, উনাকে নিয়ে আমার দুইটা শক্ত অবজার্ভেশনও আছে। উনাকে নিয়ে একটা দুঃখ রয়ে গেছে, তা হল উনি কী শেষের দিকে অনেক বেশি লিখতে গিয়ে উনার লেখার মজা কিছুটা কমে গিয়েছে। একটা সময়ে শুধু ফরমায়েশি লেখা লিখতে গিয়ে কী উনি লেখার মজা কমিয়ে ফেললেন।
"আরেকটা হচ্ছে উনার এত অসাধারণ অসাধারণ সব কাজ। উনার উচিত ছিল বিভিন্ন মানুষকে ডিরেকশন দিতে দেওয়া। আমি বিশেষত সিনেমাগুলোর কথা বলছি। উনি অন্যদের দিয়ে সেগুলো পরিচালনা করালে বেশ ভালো হত। উনার পাশাপাশি।"
মিমি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে আফসানা মিমি তার কাছে এই 'আবেদনটুকু' রাখতেন।
"উনি বেঁচে থাকলে আমি মতামত হিসেবে উনাকে গিয়ে অন্যদের দিয়ে পরিচালনা করার এই কথাটা জানাতাম। উনি হয়ত আমার কথার সঙ্গে একমত হতেন না, কিন্তু আমি সেটা ছোট মানুষ হয়েও বলতাম। তাহলে উনার কাজগুলো আরও বেঁচে থাকত, আরও অনেক কাজ দেখা যেত।"
“পরিবারের মানুষদের জন্য চর্চাটা কমছে”
হুমায়ূন চর্চা যথেষ্ঠ হচ্ছে কী না প্রশ্নে মিমি বলেন, “আমার স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু বুঝি, সেটা হচ্ছে পরিবারের মানুষদের জন্য চর্চাটা কমছে। আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, যদি আমার স্বল্প জ্ঞানে এই কথা দিয়ে কোথাও আমি কাউকে আহত করে থাকি। কিন্তু আমার মনে হয় এই চর্চাটা কমছে পরিবারের জন্য।
"উনার লেখাগুলোর দায়িত্বে কে বা কারা সেটা কিন্তু আমার আলোচনার বিষয় না। হুমায়ূন আহমেদ একজন বিশাল লেখার সাম্রাজ্য। সেই লেখক সাম্রাজ্য নিয়ে কাজ কেবলমাত্র তার পরিবারের মানুষরাই করবেন, সেটি কিন্তু ঠিক নয়। একজন মানুষ যখন বিখ্যাত হয়ে উঠেন তখন তিনি একটা রাষ্ট্রের বা একটা জনগোষ্ঠীর আদরের মানুষ বা প্রিয়জন হয়ে ওঠেন। পাঠকদের ও দর্শকদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত মানুষদের উপরে কিন্তু শুধুমাত্র পরিবারের মানুষদেরই অধিকার থাকে না।"
মিমির মতে, এখনো অনেক নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী আছেন যারা হুমায়ূনের গল্প নিয়ে ‘মানসম্মত কাজ করতে পারেন’। প্রয়োজন কেবল পরিবার ও শিল্পীদের মধ্যে একটি যৌথ বোঝাপড়া।

মিমি বলেন, "আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো উনার লেখার ওপরে কাজ করার অনেক মানুষ আছেন। তাই উনার লেখা নিয়ে কাজ করার জন্য খোলা একটা জায়গা দরকার। উনার পরিবার পছন্দ করে নিতে পারেন যে, তারা ভালো পরিচালক, ভালো শিল্পীর হাত ধরে কাজগুলো করাবেন, এলোমেলো কাজ উনারা চান না। একটা স্ট্যান্ডার্ড রেমুনারেশন তারা চান, তবে সেটা যদি আবার আকাশ ছোঁয়া হয় তাহলে সেটাও সম্ভব না।"
এ বিষয়ে জটিলতা কাটিয়ে উঠা দরকার বলে মনে করেন মিমি।
তিনি বলেন, "আমি কিন্তু হুমায়ূন ভাইয়ের লেখা নিতে সরাসরি তাদের পরিবারে কখনো কারো কাছে কিছু চাইনি। তাই কোন কারণে হুমায়ূনের কাজগুলো হচ্ছে না তা আমি জানি না। তবে উনার গল্প বা উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যেমন জটিলতা তৈরি হয়েছে তেমনই আবার কাজও হয়েছে। যেমন অমিতাভ রেজা চৌধুরী হুমায়ূন আহমেদের 'পেন্সিলে আঁকা পরী' সিনেমার জন্য অনুদান নিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি আবার জয়া আহসান 'দেবী' সিনেমাটি সফলভাবে করেছেন। দুই ধরনের চিত্রই আছে। তবে জটিলতা কোথায় সেটা খুঁজে বের করা দরকার এবং সেটা কাটিয়ে উঠে এই চর্চাটা বাড়ানো উচিত।"
লেখক হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আফসানা মিমির ভালোবাসা আজও আগের মতই ‘অটুট’ বলে ভাষ্য এই অভিনেত্রীর।
“উনার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ আমার খুব প্রিয়। কয়েক বছর আগে সেই পুরনো কাভারসহ বইটা আবার প্রকাশ হলে আমি যত্ন করে রেখে দিই। কারণ বইয়ের কাভারের সঙ্গেও একটা প্রেম থাকে, ঠিক যেমন লেখকের সঙ্গেও।”
হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আফসোস প্রকাশ করে মিমি বলেন,"হুমায়ূন ভাই কেন দীর্ঘজীবী হলেন না? আর উনার সাথে যদি আরও কাজ করতে পারতাম এই আফসোস থেকে যাবে।"
আশি থেকে নব্বইয়ের প্রজন্মের কাছে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন গল্পের জাদুকর৷ ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ থেকে শুরু করে ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’-এর মত জনপ্রিয় নাটক নির্মিত হয় তার গল্পেই।
১৯৯২ সালের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমাটির গল্পকারও তিনিই। এই সিনেমার মাধ্যমেই সেরা গল্পকারের জাতীয় চলচ্চিত্রকারের সম্মান অর্জন করেন হুমায়ূন আহমেদ।
১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদ নির্মীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেছেন আরও সাতটি সিনেমা। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ তার সৃষ্টি।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান হুমায়ূন আহমেদ।