Published : 12 May 2026, 04:49 PM
‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’ মানে দেশ-বিদেশের তারকাদের সরব উপস্থিতি আর তাদের ঝলমলে ছবি। এই উৎসবে গেল ৫০ বছর ধরে তারকাদের ছবি তুলছেন ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার রিচার্ড ব্লানশার্ড।
১৯৭৬ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি প্রথম কান উৎসবে যান। সেবার মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মাদ আলি ও আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ছবি তুলছিলেন তিনি।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন কানে তার ছবি তোলার নানা অভিজ্ঞতার কথা।
ব্লানশার্ড জানিয়েছেন, মুহাম্মাদ আলি ‘দারুণ একজন মানুষ’ ছিলেন যিনি ছবি তুলতে কখনই বাধা দিতেন না। তার সঙ্গের লোকজন অবশ্য ‘মাফিয়া’র মত আচরণ করত বলে মন্তব্য করেন এই ফটোগ্রাফার।
ব্লানশার্ড বলেন, “ফটোগ্রাফির মূল বিষয় হচ্ছে গল্প বলা ও ওই মুহূর্তটাকে ধরে রাখা। একই সঙ্গে, যার ছবি তুলছেন তাকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা যেন তিনি বুঝতেও না পারেন ছবিটার মাধ্যমে আপনি কী বলতে চাচ্ছেন।”
ব্লানশার্ড যোগ করেন, নিজেদের অভিনীত সিনেমার প্রচার চালাতে কিংবা ভবিষ্যত কোনো প্রজেক্টের জন্য তহবিল জোগাড় করতে তারকারা সাধারণত এই উৎসবে আসেন। আলি ওই সময় মিনি সিরিজ ‘ফ্রিডম রোড’ তৈরির জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কান উৎসবে যোগ দেন। আলির ছবি তোলার দায়িত্ব পড়ে ব্লানশার্ডের ওপর।

ওই সময় পরিবেশক ও প্রযোজকদের কাছ থেকে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টায় ছিলেন আলি। ব্লানশার্ড বলেন, “তিনি যেখানেই গিয়েছেন, আমি সঙ্গে গিয়েছি। একবার হঠাৎ আলির ড্রিংক করতে ইচ্ছা হল, যে কারণে আমরা কার্লটন হোটেলের বারান্দায় একটা টেবিলে বসলাম। দুই মিনিটের মধ্যে জায়গাটাতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেল। এতোকিছুর মধ্যেও দেখলাম আলি এতটুকু বিচলিত হলেন না।”
ব্লানশার্ড ছয় বছর বয়স থেকে ক্যামেরা ব্যবহার করা শুরু করেন। ১১ বছর বয়সে আট এমএম ফিল্ম শুট করা শুরু করেন। ক্যামেরায় তোলা ছবি পরে তিনি তার বাবার ফার্মসিতে ডেভেলপ করতেন।
কোডাক কোম্পানির মোশন পিকচার বিভাগে তিনি প্রথম চাকরি পান ও সেখানেই সিনেমার ফুটেজ নিয়ে কাজ করা শেখেন বলে জানিয়েছেন। সেখান থেকে তিনি সহকারী হিসেবে স্টিল ফটোগ্রাফি শুরু করেন ও ডার্করুমে ছবি প্রিন্ট করার কাজ করা শুরু করেন।
কানের ব্লানশার্ডের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার ও জিন কেলির ছবি তোলা। ব্লানশার্ডের অন্যতম প্রিয় দুই তারকা কানে গিয়েছিলেন তাদের নতুন সিনেমা ‘দ্যাটস এন্টারটেইনমেন্ট পার্ট টু’র প্রচারণা চালাতে।
ছবি তোলা শেষে নেগেটিভ প্রিন্ট করার সময় বিদ্যুত চলে গিয়েছিল স্টুডিওর। ব্লানশার্ড বলেন, “বিদ্যুৎ ছিল না। বাগানের কাজ করার সময় মালি বিদ্যুতের তার কেটে ফেলেছিল। এতো বিব্রত হয়েছিলাম, মনে হচ্ছিল পাতালে চলে যাই!”

কানের আরও মজার কাহিনী তুলে ধরতে যেয়ে দুই অ্যাকশন মেগাস্টার আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ও সিলভেস্টার স্ট্যালোনের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আর্নল্ড ও স্লাই (স্ট্যালোন) দুইজনই কান উৎসবে আসতে পছন্দ করতেন। কান উৎসবও তাদের উপস্থিতি পছন্দ করত। তারা সারাক্ষণ একে অপরকে পেছনে ফেলতে নানা ধরনের খেলায় ব্যস্ত থাকতেন।
“হোটেল ডু কাপ-ইদেন-রকে সেবার সব বিখ্যাত পরিচালকেরা জাহির হয়েছিলেন। জেমস ক্যামেরন, এড্রিয়ান লাইন, অ্যালান পারকার, জর্জ পি. কস্টামোস ও অ্যালান মারশালের মতো পরিচালক যাদের সঙ্গে ওই দুইজন হয় কাজ করেছেন বা কাজ করতে চাচ্ছেন। আমরা কয়েকজন মিলে আর্নল্ড ও স্লাইকে বললাম তাদের সামনে নাচতে।
“এর কিছুক্ষণ পরই স্লাই কার্লটন হোটেলে ফিরে যেতে চাইলেন। উনি একটা লিমোতে চড়ে হোটেলে ফিরে গেলেন। হোটেলে পৌঁছে গাড়ি থেকে বের হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেখানে কয়েকশো মানুষ জমা হয়ে যায় ও চিৎকার করতে থাকে। ভয় পেয়ে স্লাই লিমোর ছাদে উঠে পড়েন। তাকে শেষ পর্যন্ত হোটলের রান্না ঘর দিয়ে লুকিয়ে ঢোকানো হয়।”
ব্লানশার্ডের কথায়, টানা কয়েক বছর ধরে তারকাদের ছবি তুলতে পছন্দ করেন তিনি। এতে তাদের কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে সেটা ধরা পড়ে। ‘এড উড’ সিনেমার সময় তিনি প্রথম জনি ডেপের ছবি তোলেন বলে জানিয়েছেন।
ডেপের চেহারা ও উপস্থিতির পরিবর্তন ধরা পড়েছে ব্লানশার্ডের চোখে। তিনি বলেন, “সবসময়ই তার দিকে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকাতাম। এবং তিনি সবসময়ই সহজাতভাবে ‘কুল’। একই সঙ্গে তিনি খুবই ‘চার্মিং’ ও ধীরস্থির।”
১৯৮৭ সালে কান উৎসবে যোগ দেন রাজা তৃতীয় চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানা।

ব্লানশার্ড সেই প্রসঙ্গে বলেন, “যখন আমি ওই সময়ে তোলা ছবিগুলো এখন দেখি, একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে, চার্লস ও ডায়ানার সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থায় ছিল না।”
কানের অভিজ্ঞতা ও ছবিগুলো নিয়ে নতুন একটি বই বের করেছেন ব্লানশার্ড। ‘কান আনকাট: দ্য গোল্ডেন ইয়ার্স’ নামের বইটিতে ওই সময়ে তোলা সাদা-কালো ছবিগুলো দিয়ে কানের অনন্য জগত ও অনুভবের সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তিনি।
ব্লানশার্ড বলেন, “আমার জন্য এটা বিশেষ একটা সময় ছিল। এমন একটা সময় যখন কান উৎসব, তারকা ও সেলিব্রিটিরা সব এক হয়ে যেতেন। এমন একটা অভিজ্ঞতা যা আমি কখনও ভুলব না।”
ফ্রান্সে মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’।
নতুন সিনেমার প্রদর্শনী, নতুন চিত্রনাট্য-বিনিয়োগকারীর খোঁজ, পরিবেশকদের প্রকল্প যাচাই-বাছাই, তারকাদের চোখ ধাঁধানো ফ্যাশন-সবকিছুর সমন্বয়ে উৎসব হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র জগতের এক মহামিলন। ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব চলবে আগামী ২৩ মে পর্যন্ত। ওইদিন পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।