Published : 04 Nov 2025, 09:08 PM
‘অযান্ত্রিক’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’ বা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এমন সব অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে অমর হয়ে আছেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক। তার হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র অনেকখানি জীবনবোধ শিখেছে।
ঋত্বিক ঘটকের জন্ম পুরান ঢাকায় ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। মঙ্গলবার বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রতিভার জন্মশতবর্ষ। ঢাকায় জন্ম নিলেও এই নির্মাতার যৌবনের অনেকটা সময় কেটেছে রাজশাহীতে। তবে দেশভাগের কারণে ঠাঁই হয় কলকাতায়।
ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা চলে যান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। দেশভাগের সেই বেদনা কখনো ভুলতে পারেননি তিনি। বিশেষ করে পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারে হৃষিকেষ লেনে তাদের বাসস্থানের কথা তিনি ভুলতে পারেননি কখনো। কলকাতাকে তিনি দেখেছেন ‘বাঙাল’ ও ‘উদ্বাস্তু’র চোখ দিয়ে।

ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টিকর্মে ফিরে ফিরে এসেছে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বাস্তুহারা মানুষের অসহনীয় কষ্টের দৃশ্য।
১৯৪৮ সালে তিনি লিখেন তার প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। মঞ্চ নাটকে তিনি ছিলেন বেশ সক্রিয়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সদস্য ছিলেন। সে সময় নাটক লিখতেন, অভিনয় এবং পরিচালনাও করতেন। গোগল এবং ব্রেশটের রচনাবলী বাংলায় অনুবাদ করেন তিনি।
নাটকের সূত্রেই ১৯৫১ সালে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। নিমাই ঘোষ পরিচালিত ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে সহকারী পরিচালকের কাজ করেছিলেন। সিনেমাটিতে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৫২ সালে ‘নাগরিক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর তার পরিচালিত ‘অযান্ত্রিক’ ও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্বের সিনেমা ‘অযান্ত্রিক’

সুবোধ ঘোষের লেখা ‘অযান্ত্রিক’ সিনেমায় ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমল আর তার পুরনো ঝক্করমার্কা গাড়ির মধ্যকার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন।
বিমল একটি ছোট প্রাদেশিক শহরে ট্যাক্সি চালক। তিনি একা থাকেন। এই ট্যাক্সি (একটি পুরানো ১৯২০ সালের শেভ্রোলে জালোপি যার নাম তিনি জগদ্দল রেখেছিলেন) বিমলের একমাত্র সঙ্গী। যদিও গাড়ির অবস্থা খুব বিমর্ষ তবুও এটি বিমলের চোখের মণি। পরিচালকের মুন্সীয়ানায় এক সময় গাড়িটিকে মনে হতে থাকে মানবিক সত্তাবিশিষ্ট। সম্পূর্ণ নতুন এক দুঃখবোধের জন্ম হয় সিনেমাটি দেখলে। যন্ত্র সভ্যতায় নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গী হিসেবে যন্ত্রকেই মনে হতে থাকে অনেক মানবিক। এই সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষভাবে প্রশংসা কুড়ায়।
শিশুতোষ ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’

শিবরাম চক্রবর্তির লেখা বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমাটি তৈরি করেন ঋত্বিক ঘটক। তবে তিনি কাহিনিতে যোগ করেন নতুন মাত্রা। হাস্যরস থেকে অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম হয় গভীর উপলব্ধির।
সিনেমার মূল চরিত্র কিশোর কাঞ্চন, একদিন বাবার রোষ থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে পালিয়ে পৌঁছে যায় কলকাতায়। এরপর কাঞ্চন তার বিস্ময়ভরা চোখে নগর কলকাতার জটিলতা প্রত্যক্ষ করে।
গ্রামের সরল দৃষ্টিতে এই নগরজীবন তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন ঠেকেছিল। চেনা নেই, জানা নেই নতুন শহরের গাড়ি, বাড়ি, ইলেকট্রিক বাতি দেখে কাঞ্চন শুধু অবাক হয় আর চেয়ে চেয়ে দেখে৷ উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কলকাতার পথেঘাটে হরেক মানুষ আর নানা ঘটনার সম্মুখীন হয়। এই সিনেমা দিয়ে ঋত্বিক ঘটক মমতাহীন কলকাতা শহরকে দেখিয়েছেন।
জীবন সংগ্রামের সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’

১৯৬০ সালে মুক্তি পায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমাটি।
পূর্ববঙ্গের এক স্কুল শিক্ষকের পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে আসে কলকাতায়। সে পরিবারের বড় মেয়ে নীতার সামান্য চাকরির টাকায় চলে পুরো সংসার। চরম দারিদ্র্য কীভাবে মানুষের মনুষ্যত্বকেও খর্ব করে ফেলে তার করুণ দলিল ‘মেঘে ঢাকা তারা’।
সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় নীতা হেঁটে বাড়ি ফিরছে অনেক দূর থেকে। রাস্তায় ছিঁড়ে যায় তার পুরনো চটি জুতো। এই একটি দৃশ্যের মাধ্যমেই পরিচালক ইঙ্গিত দেন তার কঠোর জীবন সংগ্রামের। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র নীতার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেন সুপ্রিয়া দেবী।
নদীর তীরবর্তী মানুষের গল্প ‘তিতাস একটি নদীর নাম’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঋত্বিক ঘটক তার জন্মভূমিতে আসেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। অদ্বৈত মল্লবর্মণের চিরায়ত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে তার পরিচালনায় নির্মিত হয় এক অসাধারণ চলচ্চিত্র। তিতাস নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবন, প্রেম, লোকজ ঐতিহ্য সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয় সিনেমায়।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র, কবরী, ফখরুল হাসান বৈরাগী, গোলাম মুস্তাফা, কাদের মিয়া, রওশন জামিল, সিরাজুল ইসলাম, রোজী আফসারী, রানী সরকার, ঋত্বিক ঘটক, আবুল হায়াত, খলিলসহ অনেকে।
সিনিমার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান। চিত্রগ্রাহক ছিলেন খ্যাতিমান বেবী ইসলাম।
এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই চলচ্চিত্রটি আমাদের অমূল্য সম্পদ।
শুধু নির্মাণে নয় শিশুতোষ ‘হীরের প্রজাপতি’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাহিনিকার হিসেবে প্রশংসিত হন। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার ঋত্বিক ঘটককে পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে।
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিক ঘটকের শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যেন খুঁজে ফিরেছেন নিজেকেই। আত্ম-উপলব্ধি ও আত্মবিশ্লেষণের নির্মোহ শিল্পরূপ এই ছবি। এই চলচ্চিত্রের কাহিনীকার হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
ঋত্বিক ঘটক বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে ‘দ্য লাইফ অফ দ্য আদিবাসিজ’, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’, ‘ফিয়ার’, ‘রঁদেভু’, ‘আমার লেনিন’, ‘পুরুলিয়ার ছৌ’, ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই মহান বাঙালি চলচ্চিত্রকার মৃত্যুবরণ করেন।