Published : 21 Jun 2026, 09:17 PM
‘আমার বাবা আমার আয়না। সেই আয়নাটা দেখেই জীবনের বাকি পথটুকু চলছি-- বাবা দিবসে সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবীকে স্মরণ করে কথাগুলো বলছিলেন তার বড় মেয়ে সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী।
সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে বাবাকে হারালেও, বাবার স্মৃতি আর আদর্শ তার প্রাত্যহিক জীবনের অংশ বলে জানিয়েছেন ফাহমিদা।
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহের রোববার বাবা দিবস পালন করা হয়। এ দিনটি ঘিরে ফাহমিদা নবীর সঙ্গে কথা হয় গ্লিটজের। বাবাকে নিয়ে শৈশবের স্মৃতি, বাবার সঙ্গে কাটানো সময়, বাবার অভিমানসহ নানা কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশবের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ফাহমিদা নবী বলেন, “আব্বা যখন বাইরে থেকে স্কুটারে করে ফিরতেন, আমি আর সামিনা (মাহমুদুন্নবীর ছোট মেয়ে সংগীতশিল্পী সামিনা চৌধুরী) বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আব্বার একহাতে থাকত মিষ্টি, অন্যহাতে দই। অথবা একহাতে আম, অন্যহাতে লিচু। বা অন্য যা কিছুই আনুক, দুইটা করে জিনিস আনতেন। কারণ দুই বোনের কাউকে কম দেওয়া যাবে না। দুইজনের হাতেই দুইটা ব্যাগ দিতে হবে।”

ঈদের দিনের কথা বেশি মনে পড়ে বলে জানিয়েছেন ফাহমিদা। ঈদের আগের দিন পুরাতন পল্টন আর এলিফ্যান্ট রোডে রিকশায় করে ঘুরে বেড়াতেন তারা।
ফাহমিদা বলেন, "তখন তো জুতো কেনার জায়গা মানেই ছিল পুরানা পল্টন আর এলিফ্যান্ট রোড। আমার জুতার সাইজ সহজে পাওয়া যেত না। সেই জুতোর খোঁজে দেখা যেত ঈদের আগের দিন অনেক রাত পর্যন্ত আমরা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আব্বা আর আম্মা আমাদের দুজনকে কোলে নিয়ে বসতেন। চারজনে মিলে মাঝরাতের সেই ফুরফুরে বাতাসে গান ধরতাম। আব্বা গান শুরু করতেন, আর রাতের সেই হিমেল হাওয়ায় ঈদের আনন্দ যেন বহুগুণ বেড়ে যেত।"
ঈদের দিনের কথা জানিয়ে এই শিল্পী বলেন, "ঈদের দিন সকালবেলা আব্বা নিজে আমাদেরকে গোসল করিয়ে দিতেন। আর সেই গোসলের জন্য একটা বিশেষ বিদেশী সুগন্ধি সাবান কেনা হত। ওই সাবানটা শুধু ঈদের দিনের জন্যই তুলে রাখা হত, যাতে শরীর থেকে একটা দারুণ সুবাস ছড়ায়। আব্বা যখন ওটা দিয়ে গোসল করিয়ে দিতেন, সেই খুশির কথা আজ আর কোনো কিছুতে বোঝানো যাবে না। ওই আনন্দ, ওই অনুভূতি চিন্তাই করা যায় না!
"আব্বা অত্যন্ত সরল মনের মানুষ ছিলেন। ঈদের দিন আমাদের বাসায় অনেক মেহমান আসতেন, সারাক্ষণ মানুষ গিজগিজ করত। পুরো বাড়িটা যেন গান আর আড্ডায় এক প্রাণবন্ত রূপ নিত।"

মাহমুদুন্নবীর সন্তান হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাদের দুই বোনকে এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা কাঁধে নিয়ে বড় হতে হয়েছে বলে ভাষ্য ফাহমিদার।
এক বাড়ির পেয়ারা চুরির মজার ঘটনা মনে করে ফাহমিদা নবী বলেন, “আমি, সোমা (সামিনা চৌধুরী) আর আমাদের বান্ধবীরা একবার পেয়ারা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লাম। বাড়ির মালিক এসে বাকিদের কিছু না বলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাবার নাম কী? ‘মাহমুদুন্নবী’ শুনেই তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘মাহমুদুন্নবীর মেয়ে হয়ে চুরি কর!’ সেদিন ভীষণ দুঃখ লেগেছিল, আর আমরা সেদিনই বুঝতে পারলাম মাহমুদুন্নবীর মেয়ে হয়ে এটা, ওটা আমরা করতে পারব না।
“এর মানে হল সমাজ আমার বাবাকে একজন অত্যন্ত সম্মানিত মানুষ হিসেবে দেখত। আজীবন বাবার সেই সম্মানটুকুই আমরা মাথায় করে রক্ষা করে চলছি, কোনোদিন তা ভুলিনি। আমার বাবা আমার আয়না। সেই আয়নাটা দেখেই জীবনের বাকি পথটুকু চলছি।"
সংগীতের গম্ভীর ও মেলানকোলিক ধারার জন্য মাহমুদুন্নবী শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হলেও, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন ভীষণ আড্ডাপ্রিয় ও প্রাণবন্ত এক মানুষ।
ফাহমিদা নবী বলেন, "বাইরে থেকে দেখতে আব্বাকে হয়ত কিছুটা গম্ভীর প্রকৃতির মনে হত, কিন্তু আব্বা যেখানেই যেতেন সেখানকার আড্ডাটা এক নিমেষে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। আমার আব্বা যে শুধু গানই গাইতেন, তা কিন্তু না। তিনি অসম্ভব সুন্দর সুন্দর গল্প বলতে পারতেন। গল্প বলার ধরণটা এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, যে কেউই মুগ্ধ হয়ে শুনত।"
"বাবার এই যে রূপ—আড্ডায় আনন্দ দেওয়া আর গানে সবাইকে বুঁদ করে রাখা এই জিনিসগুলো তখন যেমন আমাদের গর্বিত করত, আজও ভীষণভাবে গর্বিত করে। বাবার এই প্রাণবন্ত আড্ডাগুলো আমি আজ বড্ড মিস করি।"

বাবার শেষ জীবনের আক্ষেপের কথা জানিয়ে ফাহমিদা বলেন, “আব্বা অনেক সুন্দর গান লিখতেন, সুর করতেন। কিন্তু কেমন জানি উনাকে একপাশ করে রাখা হয়েছিল। আমারও খুব শখ ছিল আব্বাকে দিয়ে নতুন গানের একটা সিডি বা অ্যালবাম করাব। কিন্তু আব্বা সেই সময়টাই পেলেন না, ১৯৯০ সালে তিনি চলে গেলেন।”
১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যান মাহমুদুন্নবী।
মাহমুদুন্নবীর গাওয়া কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি’, ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’, ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো আমার অজান্তে’, ‘ও গো মোর মধুমিতা’, ‘সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম’, ‘খোলা জানালার পাশে একা বসে আছি’, ‘ও মেয়ের নাম দেব কী’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কী হবে?’, ‘সুরের ভুবনে আমি আজও’সহ বহু গান।
‘দি রেইন’ সিনেমার ‘আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই’ গানের জন্য ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।