Published : 19 Sep 2025, 08:42 PM
কোহিনূর আক্তার সুচন্দা, ফরিদা আক্তার পপি ববিতা ও গুলশান আরা আক্তার চম্পা–ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘তিন কন্যা’। অভিনয়ে নিজের শক্ত জমিন তৈরির পাশাপাশি সুচন্দাই একসময় ছোট দুই বোন ববিতা ও চম্পাকে নিয়ে আসেন চলচ্চিত্রে। দুই বোনের কাছে সুচন্দা হলেন মাথার ‘উপর ছায়া’, যে ছায়া জীবনভর ‘আগলে রেখেছে’ তাদের।
শুক্রবার সুচন্দার ৭৮তম জন্মবার্ষিকী ঘিরে তাকে নিয়ে এই উপলব্ধির কথা গ্লিটজকে বললেন চম্পা।
তিনি বলেন, “আপা (সুচন্দা) বনানীতে থাকেন, চারপাশে ছেলেমেয়ে ও নাতি–নাতনিদের নিয়ে যেন একটি ছোট বাগানের মত জীবনযাপন করছেন।”
বড় বোনকে নিয়ে নানা স্মৃতি, তিন বোনের একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, প্রকৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসা, আর চলচ্চিত্রের সুদিন–দুর্দিনের কথা উঠে এসেছে চম্পার স্মৃতিচারণায়।
বাংলা চলচ্চিত্রের এক সোনালি অধ্যায়ের অভিনেত্রী সুচন্দা। ষাটের দশকে 'কাগজের নৌকা' দিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রবেশ এই নায়িকার। তারপর কিংবদন্তী নির্মাতা জহির রায়হানের কালজয়ী সিনেমা 'জীবন থেকে নেয়া', 'নয়নতারা', 'বেহুলা' বা 'হাজার বছর ধরে'সহ বাংলার চলচ্চিত্রের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী তিনি। নির্মাণ করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্র।
এই তিন বোন নিয়ে ৪০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল সিনেমা ‘তিন কন্যা’। সেই থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘তিন কন্যা’ হিসেবে পরিচিত তারা। তবে এই তিন বোনই এখন অভিনয় থেকে বাস করেন দূরে।

সুচন্দার জন্মদিন নিয়ে চম্পা বলেন, “এবার আপার জন্মদিনটা তো খুব সুন্দর একটা দিনে পড়েছে। পরিকল্পনা হল শুক্রবার রাতে পরিবারের সবাই মিলে দিনটি উদযাপন করব। ববিতা আপা তো কানাডায়, আপাকে মিস করব।”
শৈশবের স্মৃতি নিয়ে চম্পা বলেন, তিনি যখন অনেক ছোট, তাদের মা মারা যান। বাবা অবশ্য বেঁচে ছিলেন।
“তাই আপার সেই সময়ের জন্মদিন নিয়ে একটা-দুইটা ছাড়া খুব বেশি স্মৃতি মনে পড়ে না। সুচন্দা আপার বিয়ের পর উনি যখন আলাদা থাকতেন সেটা শুধু জন্মদিন না, যে কোনো উৎসবে আমরা এক হতাম।
"আমাদের পরিবারটা এমনই, খুব একে অপরের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। আমাদের মধ্যে কখনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। আমরা ছয় ভাইবোন। ছোটবেলায় ভাই হোস্টেলে থাকতেন, বুয়েটে পড়াশোনা করতেন। আপা আলাদা থাকতেন। আমি, ববিতা আপা, গুলশান থাকতাম। বাবার বাড়ি ছিল গেন্ডারিয়ায়। কিন্তু আমরা কখনো অনুভব করতাম না আমরা দূরত্বের মধ্যে আছি। ছোট ছোট উপলক্ষ ঘিরে আমারা সবাই এক হয়ে যেতাম ”

চম্পা জানিয়েছেন, আগে তাদের প্রায়ই দেখাসাক্ষাৎ হত, ব্যস্ততায় এখন তা কমেছে।
“এখন দিন যাচ্ছে, জীবনযাত্রা পরিবর্তন হচ্ছে, রাস্তায় জ্যাম, ব্যস্ততা আগের মত কিছু নেই। সব কিছু পাল্টে গেছে। কিন্তু আমরা তিন বোনেরা কিন্তু দূরে নই। মুঠোফোনেই আমরা কাছাকাছি, একে অপরের সঙ্গে সব কিছু জানি। যেমন কার গাছে কয়টা ফুল ফুটল, সারাদিন কে কী করল, কে কী খাচ্ছে সব কিছু কিন্তু আমরা জানি। কয়টা মরিচ গাছ থেকে তুললো, কার কাজের লোকের সমস্যা সব আমরা জানি।”
অভিনেত্রী সুচন্দা গাছ লাগাতে বেশ পছন্দ করেন বলে জানিয়েছেন চম্পা। আরো বলেছেন তারা তিনবোনই প্রকৃতিপ্রেমী।
চম্পা বলেন, “সুচন্দা আপা প্রচুর গাছ লাগায়। উনার বারান্দা থেকে শুরু করে যেখানেই জায়গা পায় গাছ লাগায়। উনার গাছের সমারোহ রয়েছে। আপা বনানীতে থাকেন, চারপাশে তার ছেলেমেয়েরা, নাতি–নাতনি নিয়ে একটা সুন্দর বাগানের মত করে জীবনযাপন করছেন।”
স্মৃতিচারণে চম্পা বলেন, “আপার হাতের রান্না এত চমৎকার। আগে প্রায়ই সুচন্দা আপা আমাদের ডাকতেন ছুটির দিনে। বলতেন ‘সবাই আয়, আমার বাসায় আয়।’
“নব্বই দশকে বনানীতে উনার বাসার ভেতরে অনেক গাছপালা ছিল। একটা গাছের নিচে মাটির চুলা দিয়ে আপা রান্না করতেন। আর সেটা যে আমাদের কাছে কী বড় আকর্ষণ ছিল! মাটির চুলায় বসে বসে নানান রকম রান্না করতেন।
"আমরা চারদিকে ঘিরে বসতাম। গল্প করতাম আর খেতাম। আপা ওই গাছের নিচে বসে কলাপাতায় খাবার দিতেন। খাবার খাওয়ার যে আনন্দ আর স্বাদ, সেটা এখন খুব মিস করি।”

একবার বন্যার সময় নৌকায় করে বোনের বাসায় যাওয়ার গল্পও গ্লিটজের কাছে করেছেন চম্পা।
তিনি বলেন, “একবার ভয়াবহ বন্যা হল, সেসময় আমরা গুলশানের বাসা থেকে নৌকা করে আপার বনানীর বাসায় গিয়েছিলাম। সেই স্মৃতি মনে করে এখনো খুব হাসি পায়। যদিও সেই সময়টা কষ্টের ছিল, কিন্তু স্মৃতিকথায় ওই দিনটা সব থেকে বেশি মনে পড়ে।”
ছোট থেকেই দুই বোনকে ছায়ার মত আগলে রেখেছেন সুচন্দা, এখনো তাদের কাছে নানান সমস্যার সমাধান এই বড় আপা বলে ভাষ্য চম্পার।
“আমাদের মা নেই, বাবা নেই, উনি আমাদের মাথার উপর ছায়ার মত। আমাদের যে কোনো সমস্যায় এখনো উনার পরামর্শ নেওয়া হয়। ভালোমন্দ সব খবর, কোনটা করা উচিত, কোনটা করা যাবে না সব খোঁজ উনি রাখেন। আমাদের পরিবারের মাথা উনি। আমরা উনাকে খুব শ্রদ্ধা করি।”

চম্পা জানিয়েছেন সুযোগ পেলে এখনো তিন বোন মিলে তারা ঘুরতে বের হন।
“আমরা এখনো বেড়িয়ে পড়ি, তিন বোন মিলে। কিছুদিন পরপর এদিক–সেদিক ঘুরে বেড়াই। দেশের ভেতরে, দেশের বাইরে পরিবার মিলে ঘুরতে যাই। এখনো মাটির চুলায় রান্না হয়, ঢাকায় না হলেও দূরে কোথাও যাই সেখানে রান্না হয়। যদি কোথাও না যেতে পারি, ববিতা আপার ছাদে চলে যাই সেখানে গিয়ে রান্না করি।”
সুচন্দার কোন গুণটি নিজের মধ্যে ধারণ করতে চান প্রশ্নে চম্পা বলেন, “আপা খুব গোছানো, একদম টিপটপ। জিনিসপত্রে উনিশ থেকে বিশ হতে দেন না। আমরাও গোছানো, কিন্তু উনার মত এতটা না। উনার এই গুণটা নিতে ইচ্ছে করে।"

বড় বোনের বিশেষ একটি গুণের কথা জানিয়ে চম্পার ভাষ্য, "উনি খুব সুন্দর কল্পনা করতে পারেন। যখন প্রকৃতির সঙ্গে থাকেন তখন উনার সব কষ্ট–দুঃখ ধুয়ে যায়। একটা পাখি উড়ে গেলে সেটা যে কী সুন্দর করে উপভোগ করেন এটা দেখার মত। একটা মানুষ যখন খুব সহজে পজিটিভ দিকটা ধরতে পারেন সেটা শরীর, মন সব কিছুর জন্য ভীষণ ভালো। উনি একটা ফুল দেখে, পাখি দেখে সেটা নিয়ে মেতে থাকতে পারেন। গান লেখা, কবিতা ভাবা সব মুহূর্তেই তৈরি করে ফেলতে পারেন। আপার কলমের ছোঁয়া অনেক সুন্দর, উনি খুব গুছিয়ে কথা বলেন। প্রতিটা কথা খুব মিনিংফুল এবং গভীরতা অনেক। যেই গুণটা আমাদের মধ্যে নেই।”
তিন বোন একসঙ্গে হলে কী আলোচনা হয় জানতে চাইলে চম্পা গ্লিটজকে বলেন, “চলচ্চিত্রের কথা হয়। সুদিনের গল্প উঠে আসে, সুখের গল্প করি। দুর্দিনের জন্য আফসোসের কথাও উঠে আসে। সহশিল্পীদের যাদের অনেকে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের কথা উঠে, মন খারাপ হয়। স্মৃতিচারণ করি, তাদের নিয়ে গল্প করা হয়।
"আপাদের দেখি তাদের কথা মনে করে চোখ ছলছল করে উঠে। আপাদের সময়ের যারা এখনো আছেন, জীবিত আছেন, তাদেরকে সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না এই নিয়েও আফসোস করেন।”
দেশের গুণী শিল্পীদের মূল্যায়ন করা হয় না এই নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন চম্পা।
“মূল্যায়ন তো হয় না, হলে তো দেখতাম। আরও আগে থেকে বড় আপার মূল্যায়ন পাওয়া উচিত ছিল। এখনো সময় আছে। শুধু সুচন্দা আপা না, উনার সঙ্গে আরও যারা আছেন। পরিবারের সবার তো একটা আক্ষেপ থাকেই, উনার এই সম্মাননা দেখতে পারলে সবাই খুশি হতেন।”
চলচ্চিত্রে সুচন্দার অভিনীত প্রিয় সিনেমা নিয়ে চম্পা বলেন, এখনো চোখে যেসব সিনেমা ভাসে তা হলো ‘নয়নতারা’, ‘জীবন থেকে নেওয়া’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘বেহুলা’।”

জহির রায়হান নির্মিত ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়াও সুচন্দার অভিনীত সাড়া ফেলা আরও কিছু সিনেমার মধ্যে আছে ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘নয়নতারা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘দুই ভাই’, সুয়োরানী দুয়োরানী’, ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘জুলেখা’, ‘যোগ বিয়োগ’, ‘অপবাদ’, 'পরশমনি', 'মনের মত বউ', 'যে আগুনে পুড়ি', 'প্রতিশোধ', 'অশ্রু দিয়ে লেখা', 'জীবন সংগীত', 'ধীরে বহে মেঘনা' ।
১৯৬৮ সালে তিনি বিয়ে করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানকে।
বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন সুচন্দা।
জন্মদিনে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হুল্লোড়ে বয়স যেন কমে যায়: সুচন্দা