Published : 19 Sep 2025, 01:08 PM
আশি ছুঁই ছুঁই বয়সে এসেও ষাটের দশকের অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দার ব্যস্ততার শেষ নেই। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের জীবন থেকে নিজেকে দূরে রেখে রান্না করা, বাগান করা, ঘর গোছানোসহ সংসারের শতকাজের ব্যস্ততায় ডুবে থাকেন তিনি।
গ্লিটজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুচন্দা বলেছেন, তিনি ‘ভালো আছেন, আনন্দে আছেন’।
কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের অমর র্কীতি ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমার এই অভিনেত্রীর ৭৮তম জন্মবার্ষিকীর আগে তার সঙ্গে গ্লিটজের কথা হয় বুধবার রাতে।
কথার শুরুতেই তিনি শর্ত জুড়ে দিলেন, “জন্মবার্ষিকীর দিনটা যেহেতু মনে রেখেছ, এই দিনটা নিয়েই গল্প কর। অন্যদিন অন্যান্য সব কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলব।”
তাই বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রীর এবারের আলাপচারিতা সীমাবদ্ধ থেকেছে জন্মদিন ঘিরে। কীভাবে এখন জন্মদিন পালন করা হয়, ছেলেবেলায় এই দিনটিতে কী কী করা হত, সে সব নিয়ে মন খুলে বলেছেন সুচন্দা।
তার কথায়, এখনকার জন্মদিন বেশি আনন্দের, কারণ এখন এই আয়োজন করে তার নাতি-নাতনিরা। আর তাদের সংস্পর্শে এসে তারও ‘বয়স কমে যায়’।
১৯৪৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া সূচন্দার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়েছিলে কলেজে পড়ার সময়। সুভাস দত্তের 'কাগজের নৌকা' দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু।
জহির রায়হান নির্মিত ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছাড়াও তার অভিনীত সাড়া ফেলা আরও কিছু সিনেমার মধ্যে আছে ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘নয়নতারা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘দুই ভাই’, সুয়োরানী দুয়োরানী’, ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘জুলেখা’, ‘যোগ বিয়োগ’, ‘অপবাদ’, 'পরশমনি', 'মনের মত বউ', 'যে আগুনে পুড়ি', 'প্রতিশোধ', 'অশ্রু দিয়ে লেখা', 'জীবন সংগীত', 'ধীরে বহে মেঘনা' ।
১৯৬৮ সালে তিনি বিয়ে করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানকে।
কেবল অভিনয় শিল্পী হিসেবে নয়, নির্মাতা হিসেবেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন সুচন্দা। তার পরিচালনায় ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘হাজার বছর ধরে’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।
চল্লিশ বছরের বর্ণিল ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা সূচন্দা জানিয়েছিলেন ২০১৭ সালে।
তিনি বলেছিলেন, “অভিমানে, ক্ষোভে আর দুঃখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেকদিন থেকেই তো আমি অভিনয় করি না। যদিও টুকটাক কাজ করার ইচ্ছা ছিল, এখন ভাবছি করা যাবে না। অভিনয়ের পরিবেশ নেই। আমাদের অভিনয় করার মত গল্প আর চরিত্রই তো নেই।”
গ্লিটজ: জন্মদিনের শুভেচ্ছা
সুচন্দা: অনেক ধন্যবাদ, আমার জন্মদিন মনে রাখার জন্য। ৭৮ বছর হল। জীবন থেকে আরও একটা বছর চলে গেল। আমাকে এখনো সবাই ভুলে যায়নি, স্মরণ করা হচ্ছে, এটা আমার একটা প্রাপ্তি। আমাকে এই ভালোবাসা দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।
গ্লিটজ: আপনার শরীর এখন কেমন?
সুচন্দা: আমি ভালো আছি, আনন্দে আছি।
গ্লিটজ: ইদানিং আপনাকে ফোনে তেমন একটা পাওয়া যায় না।
সুচন্দা: আমি ফোনে খুব বেশি আসক্ত নই, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ফোন ধরি না। পরিবারের মানুষ, জরুরি ফোন ছাড়া আমাকে আসলে ফোনে পাওয়া যায় না। সত্যি কথা বলতে, ফোন ধরার সময় আমার হয় না, কাজে ব্যস্ত থাকি ভীষণ।
গ্লিটজ: এখন জন্মদিন কীভাবে কাটে?
সুচন্দা: জীবনে যতদিন বেঁচে আছি, প্রতি বছরই তো এই দিনটি আমার জীবনে আসে, আসবে। ঘটা করে বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন নিয়ে বিশাল আকারে অনুষ্ঠান করা, কেক কাটা, এটার পক্ষে আমি নই। কোনো দিনই ছিলাম না। বড় অনুষ্ঠান করে সবাইকে দাওয়াত করে জন্মদিন পালন আমি কখনো করিনি। কেক কাটতে আমার ভালো লাগে না।
তবে খাওয়া দাওয়া হইচই, গল্প আড্ডা এসব আমার ভালো লাগে। ছোটবেলা বা বিয়ের পর জন্মদিনটা একরকম ছিল। কিন্তু গেল কয়েক বছর ধরে আমার জন্মদিনটা অনেক অন্যরকম কাটে। যেদিন থেকে আমার নাতি নাতনিরা বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে তখন থেকে দিনটাকে অন্যভাবে রাঙিয়ে তোলে তারা। আমাকে ভীষণ ভালোবেসে এই দিনে তারা চমকে দেয়।
গ্লিটজ: অন্যরকমটা কেমন?
সুচন্দা: ছেলেমেয়ের ঘর মিলিয়ে ওরা (নাতি নাতনি) সংখ্যায় নয়জন। কয়েক বছর আগে তারা আমাকে প্রমিজ করিয়েছে এই দিনটা এলে তারা যা করবে সেটা আমাকে মেনে নিতে হবে। আমিও কথা দিয়েছিলাম। আর সেটাই মেনে চলি। এত চমৎকার আয়োজন ওরা করে, আমাকে ওরা কিছু জানায় না। সব কিছু সারপ্রাইজ রাখে। আমি কোন কাপড় পরব, কোন জায়গায় আয়োজন হবে। কার মা আমার জন্য কী রান্না করে আনবে সব তারা ঠিক করে দেয়।
ছবি আঁকে, গল্প লিখে, নাটক তৈরি করে অভিনয় করে দেখায়। লটারি বানায়। যার ভাগ্যে যেটা ওঠে তাকে সেটা অভিনয় করে দেখাতে হয়। এই দিনটায় আমি ওদের মত ছোট হয়ে যাই। অনেক আনন্দে, মজা করে কাটে। আমার মনে হয় না আমার ৭৮ বছর বয়স হয়ে গেছে।
গ্লিটজ: ঘরোয়া আয়োজনে কোনো বিশেষ স্মৃতি আসে?
সুচন্দা: সেদিন আমাকে নিয়ে একটা আসর বসে। আমি ছোটবেলায় কী কী করেছি, কোথায় কোন দুষ্টমি করেছি, কী খেতে ভালোবাসতাম। জন্মদিন কীভাবে পালন করতাম সেসব গল্প তাদের সঙ্গে আমার করতে হয়। শুধু জন্মদিন না, আমার জীবনের ছোট ছোট ঘটনা তারা শুনতে চায়। বেশ উপভোগ করে শুনে। আমারও গল্প করতে ভালো লাগে। আমার মেয়ের ঘরের একটা নাতি আছে। খুব ভালো নাচ করে, ভালো লিখে, ভালো অভিনয় করে। একবার তো আমার তিন নাতনি চলচ্চিত্রের 'তিন কন্য' সেজেছে।
একজন হয়েছে সুচন্দা, একজন ববিতা, একজন চম্পা। একদম আমাদের কপি করে এত সুন্দর চিত্রনাট্য লিখেছে। 'রাস্তায় গাড়ি দেরি হলে আমরা কী করি, দুইজন চলে এসেছে একজন এখনো আসেনি কেন' সব অভিনয় করে দেখালো। আমি হতবাক হয়ে গেছি এটা কীভাবে করল। সবাই তখন বলে তাদের রক্তে তো অভিনয় মিশে আছে।

গ্লিটজ: এখনকার জন্মদিন কী আগের চেয়ে বেশি আনন্দময়?
সুচন্দা: হ্যাঁ অনেক বেশি। আমি অনেকটা বাচ্চা হয়ে যাই। ওদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাই। এখন এসে মনে হয় আমার ছেলেমেয়ের প্রতি যে ভালোবাসা সেটা অনেকটা কমে গিয়ে নাতি নাতনিদের মধ্যে চলে গেছে। তাদেরকে আমি এতটা ভালোবাসি।
গ্লিটজ: ছোটবেলার জন্মদিন কেমন ছিল?
সুচন্দা: আমার ডাকনাম ছিল 'চাটনী', দাদার দেওয়া নাম। বাবা, মা সবাই এই নামেই ডাকত। ছোট ছিলাম যখন মা সুন্দর সুন্দর খাবার রান্না করতেন। মা পছন্দ করে নতুন জামা কিনে দিতেন প্রত্যেক জন্মদিনে। সেটা পরে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো হত। পারিবারিকভাবে আয়োজন হত। তখন তো কেক কাটা, এইসব আধুনিকতা ছিল না। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই জন্মদিন আমার ভিন্ন ভিন্ন ছিল, সেটা কর্মক্ষেত্রে, কখনো দেশের বাইরে। সবসময় আমার জন্মদিন খুব আনন্দময় সময় নিয়ে আমি কাটিয়েছি। সব স্মৃতিই এখন মধুর।
গ্লিটজ: এখন সময় কীভাবে কাটে?
সুচন্দা: আমার এই ইতিহাস জানতে চেও না (হাসি)। জিজ্ঞেস কর অবসর সময় কতটুকু পান? মানে এত বেশি ব্যস্ত থাকি যে অবসর সময় পাই না। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত ১২টা পর্যন্ত নিরন্তর ব্যস্ত থাকি। গাছ, বাগান করা, রান্না করা, ঘর গুছানো নিজের কাজ নিজে করাই পছন্দ করি। সারাক্ষণ কাজের মধ্যে থাকি।