Published : 07 Apr 2026, 06:16 PM
সুষম খাদ্যাভ্যাসের অর্থ হল সঠিক অনুপাতে বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়া, যেটি শরীরের প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টি সরবরাহ করবে|
আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরনের জন্য সঠিক পরিমাণে সঠিক ধরনের খাবার খাওয়া প্রয়োজন| কারণ একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সকল ধরনের অপুষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন অসংক্রমণ রোগ এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে থাকে|
আর স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্যের জন্য ৬টি প্রধান খাদ্য-গোষ্ঠী থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার বেছে নিতে হবে।
কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেইট
কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা শরীরের প্রাথমিক শক্তির উৎস| খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেইটের উৎস হিসেবে জটিল শর্করাকে বেছে নেয়া উচিত| স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা ভাবলে বেশিরভাগের মাথায় আসে ফল, শাকসবজি, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং আঁশের কথা।
তবে অনেকেই জানেন না আস্ত শস্যতেও এই উপকারী যৌগগুলো আছে|
পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে আস্ত শস্য খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে| কারণ আস্ত শস্য দানায় ভিটামিন ই, সেলেনিয়াম এবং ফাইটিক অ্যাসিডের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে যা ওজন নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে আর ডায়াবেটিস এবং নিদিষ্ট কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে বলে প্রমাণিত।

এজন্য খাদ্যতালিকায় সাদা চালের পরিবর্তে রাখা যেতে পারে বাদামি বা লাল চাল ও আটা, ওটস, বাদামি চিড়া, খই, কুইনোয়া, কাউন ইত্যাদি|
মনে রাখা উচিত- সমস্ত শস্যই আস্ত শস্য হিসেবে আসে তবে মিলিং প্রসেসিং পর যদি বেশি পরিশোধিত হয় তাহলে সেটা আস্ত শস্যের গুণাগুণ হারিয়ে ফেলে|
প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ক্যালরির ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ শর্করা থেকে আসা উচিত| ১০ বছরের বেশি বয়সিদের সকলেরই প্রতিদিন খাবারে কমপক্ষে ২৫ গ্রাম আঁশ বা আঁশ-ধর্মী খাবার রাখা উচিত|
আর ১০ বছরের কম বয়সেদের ১৫ থেকে ২১ গ্রাম আঁশ বা আঁশ ধরনের খাবার রাখা উচিত|
প্রোটিন
প্রোটিন দেহের প্রায় সবকিছুর-ই ভিত্তি| এটি কোষ তৈরি এবং মেরামত করতে সাহায্য করে| এছাড়া পেশি, হাড়, অঙ্গ, ত্বক এবং নখ সুস্থ রাখতে প্রোটিনের প্রয়োজন|
প্রোটিনযুক্ত খাবারগুলোতে আয়রন বা লৌহ, ভিটাবিন বি, জিঙ্ক এবং খনিজ পদার্থ থাকে|
প্রোটিনযুক্ত খাবারের উৎস হল- ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, সয়া, পনির, টোফু, বাদাম, মটরশুঁটি ইত্যাদি|
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অবশ্যই চর্বিহীন মাংস বেছে নিতে হবে| সবসময় তাজা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং বেশি করে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। তৈলাক্ত মাছ সপ্তাহে দুদিন খাওয়ার চেষ্টা করুন|
ছোট মাছে ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন থাকে আর তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস আছে যা মস্তিষ্ক বিকাশে ও শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে|

এছাড়া বিভিন্ন প্রকার ডাল, মটরশুঁটি, শিম খাওয়া উপকারী| এগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই চর্বির পরিমাণ কম এবং আঁশ, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ আছে|
আরও খেতে হবে বিভিন্ন প্রকার বাদাম, বীজ| এগুলোতে ভালো ভিটামিন, খনিজ থাকে। তবে চর্বির পরিমাণও থাকে বেশি| তাই পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে|
স্ন্যাকস বা নাস্তা হিসেবে এক মুঠো (২৮ গ্রাম) চিনাবাদাম খাওয়া উপকারী।
উদ্ভিজ্জ এবং প্রাণিজ প্রোটিনের সংমিশ্রণ খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে| এতে পুষ্টিশোষণ ভালো হয়|
বয়স অনুযায়ী প্রোটিনের চাহিদা: বয়স, ওজন এবং শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে প্রোটিন বা আমিষজাতীয় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কেমন হবে।
এক থেকে তিন বছর- প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১.২ গ্রাম, চার থেকে ছয় বছর দৈনিক ১ গ্রাম, কিশোর-কিশোরী (১৪ থেকে ১৮ বছর) ছেলেদের ৫২ গ্রাম আর মেয়েদের ৪৬ গ্রাম, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন শরীরের প্রতি কেজি ওজন অনুযায়ী ০.৮ গ্রাম|
অর্থাৎ ব্যক্তির ওজন ৭০ কেজি হলে দিনে ৫৫ থেকে ৫৬ গ্রাম যথেষ্ট| বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরের প্রতি কেজিতে এক থেকে দেড় গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন|
স্বাস্থ্যকর তেল ও চর্বি
তেল এমন একটি উপাদান যা আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বেশিরভাগ অংশেই থাকে| তাই তেলে কী কী আছে সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ|
সমস্ত রান্নার তেলে চর্বি থাকে এবং সাধারণত স্যাচুরেইটেড এবং আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটের মিশ্রণ থাকে|
স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটের মধ্যে রয়েছে পলিআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট, মনোআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট|
অস্বাস্থ্যকর তেলগুলোতে ট্রান্সফ্যাট এবং স্যাচুরেইটেড ফ্যাট বেশি থাকে| এজন্য স্বাস্থ্যকর তেল নির্বাচন করা উচিত|
পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ধরন দুটি। একটি ওমেগা-থ্রি বং অপরটি ওমেগা-৬| এগুলো মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং কোষের বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ|

ওমেগা থ্রি ফ্যাট হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়| এটি ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা-কমাতে, ধমনী শক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা কমাতে সাহায্য করে|
চর্বিযুক্ত মাছগুলো, যেমন- ইলিশ, পাঙ্গাশ, রুই, আখরোট ক্যানোলা-তেল ইত্যাদি ওমেগা-থ্রি রয়েছে|
ওমেগা-৬ ফ্যাট মোট কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদকে সুস্থ রাখে| এছাড়া খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল’য়ের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে|
ওমেগা -৬ খাদ্যের উৎস হল- উদ্ভিজ্জ তেল, যেমন- ভুট্রার তেল, সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, অ্যাভোকাডো তেল ইত্যাদি| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দৈনিক ৪ চামচ তেলের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে|
একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তেলের পরিমাণ: একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিদিন তেলের পরিমাণ তিন থেকে চার চা-চামচের বেশি হওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ দিনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলিলিটার তেলই যথেষ্ট|
সেই হিসেবে একজন সুস্থ মানুষের জন্য সপ্তাহে ১০৫ থেকে ১৪০ মিলিলিটার এবং মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার তেল নিরাপদ|
চার জন পরিবারের ক্ষেত্রে মাসে মোটামোটি দুই লিটারের বেশি তেল ব্যবহার না করাই ভালো| আর শিশু কিশোরদের ক্ষেত্রে একটু বেশি হতে পারে|
আরও জানতে হবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সম্পর্কে| এটি অতিরিক্ত গ্রহণ করলে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়|
পুরুষদের গড়ে দৈনিক ৩০ গ্রামের বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাওয়া উচিত নয়| আর নারীদের ২০ গ্রামের বেশি নয়| শিশুদের আরও কম|
স্যাচুরেটেড ফ্যাট যুক্ত খাবার হল- চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, সসেজ, ক্রিম, কেক, বিস্কিট, হার্ড পনির ইত্যাদি|
ফল ও শাকসবজি
আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজের ভালো উৎস। ১০ বছরের বেশি বয়সিদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি গ্রহণ করা উচিত|
আর ১০ বছরের কম বয়সিদের ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি রাখা উচিত|
কারণ ফল ও শাকসবজির বিভিন্ন রংয়ের রঞ্জক পদার্থ রয়েছে, এগুলো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে|

এজন্য খাবারে ৮০ গ্রাম তাজা, হিয়ায়িত, টিনজাত ফল ও ৩০ গ্রাম শুকনা অবস্থায় গ্রহণ করা উপকারী।
পাশাপাশি ১৫০ মিলি গ্রামের ফলের রস বা স্মুদি দিনে এক গ্লাস গ্রহণ করতে পারেন| ফলের রসে আঁশ কম থাকে এবং চিনিযুক্ত করলে দাঁতের ক্ষতি করতে পারে|
তাই অতিরিক্ত ফলের রসের পরিবর্তে আস্ত ফল খেতে হবে।
পানি
খাদ্য পরিপাক, পরিশোষণ, পরিবহন, বর্জ্য পদার্থ দূরীকরণ এবং দৈহিক তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষায় পানি জরুরি| এতোসব মৌলিক ক্রিয়া সম্পাদনের কারণেই পানির অপর নাম জীবন বলা হয়|
মানবদেহের মোট ওজনের ৭০ শতাংশ পানি| আবহাওয়া, কাজের ধরন, বয়স, ওজন ইত্যাদির ভিন্নতায় পানির দৈনিক চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হয়|
পানি পানের হিসাব: জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা ২০২০ অনুযায়ী একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন দেড় থেকে সাড়ে তিন লিটার বা প্রায় ৬ থেকে ১৪ গ্লাস নিরাপদ পানি পান করা প্রয়োজন|
প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ৪০ মিলিলিটার করে প্রয়োজন হয়|
একটি উদাহারণ দেওয়া যাক- ৬০ কেজি ওজনের ব্যক্তির দৈনিক পানির চাহিদা (৬০×৪০= ২৪০০ মিলিলিটার বা ২.৪ লিটার)|

মনে রাখতে হবে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, খেলোয়ার, অধিক শারীরিক পরিশ্রম করা ব্যক্তির পানির চাহিদা বাড়বে|
আবার কিডনি বা বৃক্কের জটিলতা থাকলে পানির চাহিদা কমবে|
খাওয়ার সময় পানি পান করা ভালো নয়| খাওয়ার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে বা পরে পানি পান ভালো|
একেবারে বেশি পানি পান করা যাবে না। এতে কোষে পানি ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বড় বিপদ হতে পারে|
লেখক পরিচিতি: পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, বিরামপুর,দিনাজপুর।
আরও পড়ুন
ওজনে নয়, মনোযোগ দিতে হবে সুস্থতায়