Published : 15 May 2026, 01:24 AM
উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে বছর পার করা সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় সংকুচিত হলেও আগামী বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণে তাদের জন্য সুখবর না থাকার আভাস মিলেছে; তাদের স্বস্তি দিতে আগামী করবর্ষে এ সীমা না বাড়ানোর পথেই হাঁটতে যাচ্ছে নতুন সরকার।
বরাবরের মত বাজেটের আগে এ বিষয়ে বিভিন্ন দিক থেকে দাবি তোলা হলেও বাজেট বিষয়ক সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে তা অপরিবর্তিত রাখার কথাই আলোচনা হয়েছে।
এর অর্থ ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারণ করা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই থাকছে। নারী করদাতাদের এ সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার, প্রতিবন্ধীদের ৫ লাখ এবং গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের এ বৈঠকে এ সীমা না বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) ক্ষেত্রে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।
উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনতে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর এ প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে এনবিআর; যা আগামী অর্থবছরের বাজেট রাখার পরিকল্পনা তাদের। ভ্যাটের এ নিয়মে প্রতিমাসে ‘সামান্য পরিমাণ’ ভ্যাট দিতে হবে বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন।
বাজেট বিষয়ক এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কী নির্দেশনা দিয়েছেন-এমন প্রশ্নে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, “প্রধানত ফোকাস ছিল শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে সুবিধা দেওয়া, কর্মসংস্থান বাড়ানো। সাধারণ মানুষের জনজীবনে যাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পড়ে।
“একটা একটা করে স্যার প্রত্যেকটা প্রস্তাব দেখেছেন এবং মতামত দিয়েছেন। ৮ ঘণ্টা মিটিং হয়েছে টানা। একদম ১০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত।”
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষের কর প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ বৈঠক হয়। এতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


রাষ্ট্রের ওপর ‘ওনারশিপ’ তৈরির তাগিদ
মূল্যস্ফীতির চাপ আর অর্থনীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবিতে সায় দিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো হলেও সার্বিকভাবে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়েছিল।
দুই দশক পর ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মধ্যে এবার বাজেট করতে যাওয়া বিএনপি সরকারের সামনেও একই দাবি জানিয়েছে এফবিসিসিআইসহ একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠন। তবে বিপুল ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানোর চাপে থাকা সরকার আয়মুক্ত করসীমা বাড়ানোর পথে যাবে না বলেই সভায় আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সামান্য হলেও কর দেওয়ার মাধ্যমে যাতে রাষ্ট্রের প্রতি একজন নাগরিকের ‘ওনারশিপ’ তৈরি হয় সেজন্য প্রধানমন্ত্রী কিছু ক্ষেত্রে সামান্য করারোপের নির্দেশনা দিয়েছেন। যে কারণে করমুক্ত আয়সীমা আগের মত থাকার আভাসই মিলেছে।
একই সঙ্গে এনবিআরের ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালুর উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার সবুজ সংকেত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কথা হলো, একদম গরিব থেকে সবাই দেশটাকে ভালোবাসে- তারাই কর দেয়। তো বছরে ৫ কিংবা ৫০০ টাকা দিক, দিয়ে সে ওনারশিপটা (রাষ্ট্রের) নিক।”
মাসিক ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মত এ ভ্যাট হতে পারে বলে ওই কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন।
এছাড়া ব্যাংকে ব্যবসায়িক লেনদেন করার ক্ষেত্রে ভ্যাটের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হতে পারে আসছে বাজেটে- যা অনলাইনে করার বিষয়েও ব্ঠৈকে আলোচনা হয়।
এখন বছরে কোনো সময় ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ বা ঋণের টাকার পরিমাণ ৩ লাখ টাকা ছাড়ালে ১৫০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়। ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত তা আবগারি শুল্কের আওতায় না আনার বিষয়েও সরকারপ্রধানের সায় মেলার কথা বলেন আরেক কর্মকর্তা।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব ছিল এনবিআরের তরফে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সায় না মেলার তথ্য দিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।
বিভিন্ন পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট করার প্রস্তাব ছিল এনবিআরের তরফে; সেখানেও প্রধানমন্ত্রী দ্বিমত করেছেন। এ পরিমাণ ভ্যাট দিয়ে পরে তা থেকে রেয়াত পাওয়ার সুযোগের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানো হলেও তার সায় মেলেনি বলে এ কর্মকর্তার ভাষ্য।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রধামন্ত্রীর ভাষ্য হল- রিবেট বলেন আর যাই বলেন, শেষ পর্যন্ততো গ্রাহকের উপর যায় না টাকাটা? অবশ্যই গ্রাহকের উপরে। তো ভ্যাট ৫ শতাংশের জায়গায় ১৫ শতাংশ হলে গ্রাহকের খরচ বাড়বেই। গ্রাহক কার কাছ থেকে রিবেট নেবে?”
‘জনজীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া যেন না পড়ে’
বৈঠকে সরকারের তরফে নির্দেশনার বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জনগণের জীবনযাত্রাকে সহজ করার কথাই বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
“৬ লাখ কোটি, ৮ লাখ কোটি টাকা এসব হিসাব সব ভুলে যান। তার কথাটা হল- মানুষের লাইফটাকে ইজি করেন। আর বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায়, কর্মসংস্থান বাড়ানো যাবে সেগুলো প্ল্যান করেন আপনারা। একদম মোটোটা স্পষ্ট।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, এজন্য রপ্তানি ও উৎপাদন শিল্পের যতধরনের সুবিধা দরকার সেগুলো পরিকল্পনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এজন্য যেসব পণ্যের দেশে উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোর ট্যারিফ লাইনে (পণ্যের আমদানি নির্দেশক কোড) বাড়তি শুল্ক বসানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বৈঠকে বলে তুলে ধরেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তরফে রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও কর অব্যাহতি কমানোর যে চাপ রয়েছে তা ‘মাথায় না নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ’ দেওয়ার নির্দেশনা এসেছে এ বৈঠক থেকে।

আরও যেসব আলোচনা
এ বৈঠকে বাজেটে নিত্যপণ্যের স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে- ধান, ধানের কুড়া, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মটরশুঁটি, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, আটা, মোটা আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, কালো গোলমরিচ, দারুচিনি, বাদাম, লবঙ্গ, খেজুর, ক্যাসিয়া পাতা, কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের ফল।
এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এমন শঙ্কা থাকায় তা আরও পর্যালোচনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে বর্তমানে কোনো আয়কর দিতে না হলেও আগামী অর্থবছর থেকে এক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর বসানোর কথা বলে এনবিআর।
সেক্ষেত্রে ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত রেখে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি হলে অগ্রিম আয়কর দুই হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতি বছর ১০ হাজার টাকা আদায়ের পরিকল্পনার কথা বৈঠকে আলোচনা করা হয়।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোটরসাইকেলের ‘এই করহার অনেক বেশি’ মন্তব্য করে তা ১১১ থেকে ১২৫ সিসিতে এক হাজার, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত তিন হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে প্রতি বছর পাঁচ হাজার টাকা কর নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন।
বর্তমানে সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার, জিপ, এমনকি বাস-ট্রাক-পিকআপের মতো বাহন থেকে অগ্রিম আয়কর আদায় করে কর আদায়কারী সংস্থাটি।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে হলে পাঁচ হাজার, পৌরসভায় হলে দুই হাজার ও ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রতি বছর এক হাজার টাকা কর দেওয়ার প্রস্তাব দেয় এনবিআর।
সেক্ষেত্রে 'সরাসরি কোন করহার নির্ধারণ না করে' এই হার কমিয়ে আনার কথা বলেছেন তারেক রহমান।
অপরদিকে এনবিআরের সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে সায় মেলে প্রধানমন্ত্রীর।
এছাড়া দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হার্টের রিং, ডায়ালাইসিসের টিউবের পাশাপাশি ঝুট ব্যবসায়ীদের ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাবে 'সন্তোষ' প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
ধনীদেরও আগের চেয়ে তুলনামূলক বেশি কর দেওয়ার প্রস্তাব দেয় এনবিআর। বর্তমানে একজন করদাতার সাকূল্যে পরিসম্পদের মূল্য চার কোটি টাকা পর্যন্ত কোনো সারচার্জ দিতে হয় না। চার কোটি টাকা অতিক্রম করলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা আছে আয়কর আইনে।
তবে আগামী বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটির বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় কর আদায়ের এ সংস্থা।
দশ কোটির বেশি তবে ২০ কোটি কম হলে এক শতাংশ, ২০ কোটির বেশি অথচ ৫০ কোটির কম হলে এক দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে দুই শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তারা। তবে এই সম্পদ কর কোনভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না।
রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই রপ্তানি প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। আগামী বাজেটে তা ২০ শতাংশ নির্ধারণের পথে হাঁটছে সরকার।
আরও পড়ুন-