Published : 13 Jun 2026, 01:24 AM
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী আশার সঞ্চার করলেও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েই গিয়েছিল; যেগুলো এল অর্থমন্ত্রীর বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে।
আগের দিন বৃহস্পতিবার সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা দেওয়া আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরদিন শুক্রবার সেসব প্রশ্নের জবাবে শোনালেন পুরনো ধাঁচের কথাই; সঙ্গে থাকা সরকারের অন্যান্য দায়িত্বশীলও হাঁটলেন একই পথে।
এসব কথোপকথনের ফাঁকে আবারও তিনি আশার কথাই শোনালেন। বললেন, ঘুরে দাঁড়াবে অর্থনীতি। এজন্য সময় দিতে হবে আরও দুই বছর। বাজেট ব্যবস্থা বদলানোর কথাও বললেন তিনি।
দেশের ‘অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট প্রণয়নের’ ক্ষেত্রে আগের প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে নতুন সরকারের চেষ্টা থাকার কথাও বলেছেন প্রথমবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আমির খসরু।
সমাজের সবাইকে সহায়তার কথা মাথায় রেখে বাজেট করার কথা তুলে ধরে তার দাবি, সীমিত সম্পদ আর অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো একটি বাজেট করেছেন তিনি।
তবে সঞ্চয়পত্রে কর বসিয়ে মধ্যবিত্তকে চাপে রাখার প্রশ্নে কিংবা আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার প্রশ্নে সরকারের তরফে দেখা গেল চিরচেনা অস্বীকার করার প্রবণতা।
এছাড়া নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন শুরুর মাধ্যমে সরকারি চাকুরেদের আয় বাড়লেও দুর্নীতি কমে আসবে কি না এমন প্রশ্নেও শক্তভাবে দুর্নীতি রোধের কথা বললেন না তিনি; বিপরীতে মিলল ধারণামূলক কথা।
ব্যাংকিং খাতের দুর্দশা বা জ্বালানি খাতের প্রধানতম সমস্যা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ না কমিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রশ্নে দেখা মিলল দায় চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
পুরনো এসব সংকট কাটাতে সরকারের তরফে জোরালো অবস্থান জানান দিতে না পারার বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে লক্ষ্যণীয় হলেও বছর কয়েক ধরে মূল্যস্ফীতির ধকলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মানুষকে স্বস্তি দিতে নীতি বাস্তবায়নের ওপর ‘ভরসা’ রাখার পুরনো কথাই বললেন চান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু, যিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।

তবুও আশাবাদী খসরু
এক্ষেত্রে ‘যদি’র ওপর ভরসা রাখলেও বিশাল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনেও বাজেট বক্তৃতার মত আশার কথাই শোনালেন তিনি। প্রস্তাবিত এ ব্যয় শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। টাকার এ অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৩.৭৩ শতাংশের সমান।
সংকটময় সময়েও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্খা বাদ দেননি প্রথমবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আমির খসরু। ১৯ বছর পর বিএনপি সরকারের এ বাজেটে তিনি সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার আশা রাখছেন। এ জন্য বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা, যা ইতোমধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির সোপানে আবারও উঠতে গিয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি রাজস্ব আহরণেও উচ্চাভিলাষ দেখিয়েছেন। বিশাল অঙ্কের ব্যয়ের অর্থ জোগানে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
এ অঙ্ক শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৮ শতাংশ বেশি। এরপরও ঘাটতির ২ লাখ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান। ঘাটতির এই অনুপাত গত বাজেটের সমান। বড় অঙ্কের এ ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ও দেশি ব্যাংক ঋণের ওপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে। তবে তিনি দেশি ব্যাংক নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন সংবাদ সম্মেলনে।
আর সাধারণের জীবনযাত্রাকের জেরবার করে ফেলা মূল্যস্ফীতিকে সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যের কথা বলেছেন তিনি। সবশেষ মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি চলে গেছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ভরসা রাখছেন এক সময়ের ব্যবসায়ী নেতা আমির খসরু। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি। তবে কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়বে বাজেটে ঠিকঠাক সেই দিশা দেখাননি তিনি।
যে কারণে বাজেটের পরদিন শুক্রবার বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে প্রশ্নও করা হল অর্থমন্ত্রীকে। সেখানেও সরাসরি উত্তর এল না; গতানুগতিকভাবে তিনি ব্যবসাবান্ধব বাজেট করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির 'চাহিদা' তৈরির অনুমানভিত্তিক কথা বললেন।
রাজস্ব আহরণের অসম্ভব লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নে সেই পুরনো ‘ডিজিটালাইজেশনকে’ কার্যকর করার কথা শোনালেন; সঙ্গে দুর্নীতি রোধ করা গেলে আর খুচরা ব্যবসায়ীদের করজালের মধ্যে আনা গেলে তিনি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী যখন কথা বলছিলেন, তখন তার ডান পাশে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বামপাশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
অন্যদের মধ্যে ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
সরকারি কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।

‘মূল দর্শন’ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনগণের আর্থিক পুনরুদ্ধার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই এই বাজেটের মূল দর্শন।“
অর্থাৎ আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্বিগুণ করার কথা বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ১০ জুন বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, সাময়িক হিসাবে শেষ হতে যাওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন ডলার।
‘কিছু মানুষের অর্থনীতি নয়, সবার জন্য এ বাজেট’
সরকার ক্ষমতায় আসার মাস চারেকের মধ্যে ব্যবসাবান্ধব উচ্চাভিলাষী এ বাজেট নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সবার জন্য ‘ইনক্লুসিভ’ বাজেট করতে হয়েছে। গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে, একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
“কিন্তু আমরা আমাদের অর্থনীতির ভাবনায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। সেই ভাবনা থেকে সীমিত সম্পদের মধ্যে সবার জন্যই এই বাজেট দেওয়া হয়েছে।”
তবে বিশাল ব্যয়ের ফর্দ মেটাতে গিয়ে তিনি আয় বাড়াতে গিয়ে একলাফেই এনবিআরের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ রাজস্ব বাড়ানোর যে লক্ষ্য নিয়েছেন তা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বৃহস্পতিবার বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এনবিআরের বর্তমান সক্ষমতায় এ লক্ষ্য অর্জন করাটা খুবই কঠিন।

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শুক্রবার সিপিডির পর্যালোচনাতেও প্রতিষ্ঠানটির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান একই রকম বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। বলেন, “দুর্বলভিত্তিটার ওপর আগামী বাজেটের প্রাক্কলনগুলো করা হয়েছে। এখানে বাজেট বাস্তবায়নের শৃঙ্খলাটা দেখা যাবে না।”
তবে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের মধ্যেও রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্য পূরণে এনবিআরের ওপরই ভরসা রাখতে চান অর্থমন্ত্রী।
একই সঙ্গে করছাড়ের এ বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্য পূরণে খুচরা বিক্রেতাদের করজালে নিয়ে আসতে পারার উদ্যোগ নিয়ে আশা দেখছেন তিনি।
তবে বড় ব্যবসায়ীদের ছাড় দিয়ে ছোটদের বেছে নিলেন কেন- সেই প্রশ্ন রাখার সুযোগ মেলার আগেই সম্মেলন শেষ করেন তিনি।
এনবিআরের সক্ষমতা না বাড়ালে ‘কিন্তু যদি’ এর ওপর ভর করে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব সংগ্রহ করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে এনবিআর যেখানে আছে এনবিআরের কিছু সংস্কার নিয়ে যে বিষয়টা সেটার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
“একটা হচ্ছে নীতি আরেকটা বাস্তবায়ন। এবং এইটা নীতি প্রণয়ন বডিতে কারা কারা কীভাবে থাকবে, সেটাও আমি আমার বক্তব্যে বলেছি এবং যোগ্য ব্যক্তি এখানে আসবে।”
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এ বাজেটকে দেখছে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে, বাজেট বক্তব্যের পরতে পরতে সেটির ইঙ্গিতও মিলেছে।
তবে যেসব কর ছাড় দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন খাতের শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে সেজন্য বিনিয়োগের যে পরিবেশ নিশ্চিত করা, ঋণের হার কমানো, ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটানো বা করপোরেট করহার কমানোর মত বিষয়গুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে বাজেটে।

শিল্পে গ্যাস মিলবে? কর্মসংস্থান হবে তো?
হাজারো করছাড় মিললেও শেষতক শিল্পে গ্যাস সরবরাহ না করা গেলে কাঙ্খিত উৎপাদন মিলবে না। ইরান যুদ্ধকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা না থামায় সেই শঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে। পাশাপাশি বেশি মূল্যে জ্বালানি আমদানির চাপও তৈরি হচ্ছে। এসব প্রশ্ন আসছে বাজেটের আগে-পরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রভাব।
এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী টুকু অতীত সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, “বিগত সরকার বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে টোটালি ইম্পোর্ট বেস করে ফেলছিল। তার ফলে গত ১৭ বছর বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয় দেখেছি আমরা।
“কিন্তু আমাদের ল্যান্ডে যেসব জায়গায় গ্যাস পাওয়া যাবে এইসব জায়গায় এক্সপ্লোর করার জন্য কিছু করে নাই।”
দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমুদ্র ও স্থলে গ্যাস কূপ খননের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবারাহ ধরে রাখতে আড়াই বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, দেশের তেলের মজুদ স্থিতিশীল রয়েছে।
বিদ্যুতের দামের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ভুর্তকির ফলে লোকসান হচ্ছে, যাতে ভারসাম্য রাখা কঠিন হচ্ছে।
এতসব সংকটের মধ্যে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে আগের ধারাবাহিকতায় সৌরবিদ্যুতের উৎসের দিকে যাওয়ার কথা বলেন জ্বালানিমন্ত্রী।
২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশায় বাজেটে সৌরবিদ্যুতের সব উপকরণের আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
তার বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা থাকলেও আগামী অর্থবছরে কীভাবে কাঙ্খিত উৎপাদন মিলবে, শিল্পগুলো জ্বালানি পাবে কিনা বা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য আদৌও কীভাবে মিলবে সেই সমীকরণ মেলেনি।
এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মসংস্থানের বিষয়টিও খোলাশা হয়নি। বাজেটে কোন খাত থেকে কীভাবে কত কর্মসংস্থান হবে এবং তা কতদিনে হবে- এমন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলেন একজন সাংবাদিক।
জবাবে অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতে কর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন খাত নিয়ে এরকম তথ্য বাজেট বক্তৃতায় দেওয়ার কথা তুলে ধরে বলেন, “যদি তার বিপরীতে সংখ্যা বলেন, সংখ্যা দেওয়া সম্ভব না। কারণ কোথাও বেশি হবে কোথাও কম হবে।
“তো আশা করি ওভারঅল যে যে প্রেডিকশনটা করেছি কর্মসংস্থানের সেটা এবং কর্মসংস্থান তো 'চাহিদা ক্রিয়েট করতে হবে'। দেশে বিদেশে চাহিদা আমাকে ক্রিয়েট করতে হব। এজন্য আমরা বিনিয়োগের উপর বিশদ কাজ করতেছি।“
তিনি এক্ষেত্রে করছাড় দিয়ে এবং আইনি বাধ্যবাধকতার বেড়াজাল কিছুটা কমিয়ে এনে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বাজেটেই। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান হবে- এমন চিন্তা সরকারের।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে আমির খসরু বলেন, “আমাদের যে কর্মসংস্থানের যে প্রকল্পগুলো হচ্ছে দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত। এতদিন যেটা হয় নাই। আপনারা দেখবেন শিক্ষার ক্ষেত্রে যে বড় বরাদ্দ দিয়েছি তার মূল কারণ হচ্ছে কিন্তু দক্ষতা উন্নয়ন, দক্ষতা।”
বিএনপি সরকার এসব জায়গায় উন্নতি ঘটাতে কাজ করছে বলে তিনি তুলে ধরেন।

ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে?
ইসলামী ব্যাংক ও সমন্বিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর বাইরেও অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকে গিয়ে আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ার তথ্য আসছে বিভিন্ন খবরে।
এর সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর তরফে নানামুখী বক্তব্য আসছে।
সংবাদ সম্মেলনে সমন্বিত ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও অন্য ব্যাংক থেকে টাকা না পাওয়া বিষয়ক প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। ‘ঋণখেলাপি গভর্নর রেখে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো যাবে না’- বাজারে এমন কথা চাওর থাকার কথাও বলেন তিনি।
জবাবে গভর্নর বলেন, “একটা প্রতিষ্ঠানে যেখানে আমি ইনভলভ ছিলাম সেটা হচ্ছে যে একটা গ্রিন ফ্যাক্টরি। লিড সার্টিফায়েড গ্রিন ফ্যাক্টরি। দুইটা দুই ধরনের। একটা হচ্ছে ওভারডিউ হয়, ডিলে হয়- সেটা এক জিনিস। আরেকটা হচ্ছে খেলাপি। এনপিএল হয়ে যায়।
“তো আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য এক্সপোর্ট বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরির এক মাসের জন্য বেতন বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি ব্যাংকের কাছে এক টাকা ঋণ মৌকুফ চায় নাই।”
তাহলে কী হয়েছিল? সেটিও তুলে ধরেন গভর্নর। বলেন, “শুধুমাত্র যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে, সেই ফ্যাক্টরিটার প্রথম লোন স্যাংশন ছিল এফএসএসপি প্রজেক্টের আন্ডারে। যেখানে সুদের হার ছিল ৪ শতাংশ।
“তো ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরে ব্যাংক জানায় যে ওই ফান্ডটা শেষ হয়ে গেছে। আপনাদেরকে এখন ৯ থেকে ১১ শতাংশ সুদ দিতে হবে। সো স্বাভাবিকভাবে রিপেমেন্ট আগের প্রজেকশন অনুসারে হয় নাই। সেটা ডিলে হয়েছে এবং সেখানে কোভিড ছিল। অন্যান্য প্রবলেম ছিল।"
তার ভাষ্য, “তবে এটা নিশ্চিত থাকেন যে আমরা কখনো এক পয়সা, এক টাকার ঋণ উঠাই নাই, ঋণ নেইও নাই এবং সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০০ কোটি টাকার উপরে ব্যাংকে পরিশোধও করে দিছে। সো আমরা আসলে বলতে বলতে একটা মিথ্যা কথাকে সত্য, অনেক সময় সত্য করে ফেলি।”
এছাড়া ব্যাংক খাতে তারল্য ‘সমস্যা’ না থাকার কথা তুলে তিনি বলেন, “লিকুইডিটির ব্যাপারে আমার মনে হয় না ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা আছে। ব্যাংকের লোকজন ব্যাংকে বলতে পারে।”
ব্যাংক খাতের অর্থের বড় একটা অংশ চুরি ও পাচার হওয়ার কারণেই বর্তমান সংকট বলে তুলে ধরেন তিনি।

কালো টাকা সাদার প্রশ্নে অস্বীকার
বাজেটে এবারও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার সমালোচনা হলেও এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান একে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ বলে মানতে রাজি নন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয় নাই। আমার মনে হয়, আপনাদের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।”
অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ নিয়ে প্রতিবারই বাজেটের সময় আলোচনা সমালোচনা হয়। এবার যেন সেই সুযোগ না থাকে, সেই দাবি বিভিন্ন মহল থেকে জানানো হয়েছিল।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে কিছু ছিল না। তবে অর্থবিলে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে সে সুযোগ ঠিকই রাখা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে সিপিডির বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করা হয়।
বিকালে এ বিষয়ক প্রশ্নে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, একটি বিষয় বুঝতে ‘ভুল’ হচ্ছে।
“আমরা ছোট্ট একটা প্রভিশন গতবছরই করেছিলাম, যারা জমি বিক্রি করেন, যে টাকা পান, কিন্তু নিবন্ধন হয় কম দামে। অথচ ওনার টাকাটা কিন্তু সাদা, উনি জমি বিক্রি করেছেন ৫ কোটি টাকায়, নিবন্ধন হয়েছে ১ কোটি টাকায়। বাকি ৪ কোটি টাকা নিয়ে উনি খুব বিপদগ্রস্ত থাকেন।
“সে কারণে গতবছরেই একটা সুযোগ করেছিলাম যে, উনি যদি বাকি ৪ কোটি টাকা প্রমাণ করতে পারেন যে ওনার ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হয়েছে এবং ওনার যদি বায়নানামা থাকে, যদি প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে উনি ওটার উপরে রেগুলার কর এবং ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স, সেই হারে কর দিয়ে এটা দেখাতে পারবেন।”

আব্দুর রহমান বলেন, “এটা আমরা গতবারই করেছি, এটা ছিল বিক্রেতার দিক থেকে। এবার ক্রেতার জন্যও একইরকম একটা সুবিধা চিন্তা করা হয়েছিল যে, ক্রেতাও ঝামেলায় পড়েন যে একটা ফ্ল্যাট উনি কিনলেন ২০ কোটি টাকা দিয়ে, কিন্তু নিবন্ধন হল ৩ কোটি টাকায়।
“আমাদের করের লোকজন ওনাকে গিয়ে আবার চেইজ করে যে, আপনার আমাদের কাছে প্রমাণ আছে আপনি ২০ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন, আপনার এখন এটার উপরে এক্সট্রা কর দিতে হবে, জরিমানাসহ। তারাও বিরাট বড় একটা ঝামেলায় পড়ে যায়।”
তাদের ‘একটু রিলিফ দেওয়ার জন্য’ এবার বাজেটে নতুন বিষয়টি যুক্ত করার কথা তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “যদি ওনারা নিজেদের থেকে ঘোষণা করেন, যাতে করে উনি ২০ শতাংশ অতিরিক্ত (কর) দিয়ে, নিয়মিত করের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি দিয়ে, যাতে এটা দেখাতে পারেন।
“আর যাদের নিজের টাকা আছে অলরেডি, যার কর দেওয়ার টাকা আছে, প্রদর্শিত অর্থ আছে, তাকে কোনো কর দিতে হবে না। এরকম একটা প্রভিশন আছে, তবে এটা নিয়ে যদি আপত্তি থাকে, আমার মনে হয় স্যাররা এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন।"
এনবিআর চেয়ারম্যান অস্বীকার করলেও অর্থমন্ত্রী অস্বীকার করেননি। বরং এটিকে 'কালো' বলে বর্ণনা করেন। বলেন, "এই যে মৌজা রেটের বিষয়টা, যে সত্যিকার ভ্যালু থেকে অনেক কম থাকে সেটা আপনারা সবাই জানেন। এটার ওপর আমরা কাজ করছি যেহেতু আমরা সময় পাই নাই, দেড় মাসের মধ্যে বাজেট করতে হয়েছে, অনেক কিছু ইচ্ছা থাকলেও আমরা শেষ করতে পারিনি।
“মৌজা রেটের যে বিষয়টা আছে, সেটার উপর একটা কমিটি হয়েছে এবং মৌজা রেটগুলো আমরা রিভিউ করতে যাচ্ছি। আমরা মৌজা রেটগুলো একটা রিয়েল ভ্যালুতে আনার চেষ্টা করছি যাতে করে ওই কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে আর কোনো সুযোগ থাকবে না।”

‘ক্যাপাসিটি চার্জের দায় পুরনো’
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকির বড় অংশ যাওয়া ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ কমানো হল না কেন- সেই প্রশ্নও আসে সংবাদ সম্মেলনে। বাজেটে তা না থাকার কারণও জানতে চাওয়া হল।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী টুকু এ নিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার চুক্তিগুলোতে সরকারের চেয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এসব চুক্তির কারণে বড় ধরনের ‘আর্থিক ও আইনি জটিলতা’ তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকেই ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে কাজ শুরু করার কথা বলেন তিনি।
এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
আরও পড়ুন
ব্যবসাবান্ধব বাজেট কতটা মানবিক হল?
ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবছে সরকার: টুকু
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে? অর্থমন্ত্রী বললেন ‘কমার কথা’
মূল্যস্ফীতি কমাতে নীতি বাস্তবায়নের ওপর 'ভরসা' রাখতে চান অর্থমন্ত্রী
ওটা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়: এনবিআর চেয়ারম্যান
'সবার জন্য' এই বাজেট: অর্থমন্ত্রী
চেয়ারম্যান বসানোর পরেই ইসলামী ব্যাংককে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলে: গভর্নর
বাজেট সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব: বিসিআই
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ সিপিডির