Published : 14 Jun 2026, 10:49 PM
জাতীয় সংসদে চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অধিকাংশ সদস্যের বক্তব্য ঘুরপাক খেয়েছে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে। ছিল ইসলামী ব্যাংক ঘিরে অস্থিরতার প্রসঙ্গও।
আলোচনায় অংশ নেওয়া ২২ জন সদস্যের মধ্যে কয়েকজন সম্পূরক বাজেটের প্রয়োজনীয়তা, অতিরিক্ত ব্যয় বা ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন।
অন্যদিকে অধিকাংশ সদস্য নতুন বাজেটের প্রশংসা বা সমালোচনার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, ব্যাংকিং খাত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানেন।
রোববার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট নিয়ে সাধারণ আলোচনা হয়।
শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক নতুন করে যে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়, তার সূত্রপাত ঘটে মূলত খুরশিদ আলমকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়েই।
কোরবানি ঈদের আগে ২৪ মে ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। সেদিনই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঈদের পর এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ব্যাংকটির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল ব্যক্তি।
‘গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে তখন থেকে তারা বিক্ষোভ করছেন। আন্দোলনকারীদের হটিয়ে দিতে একদিন পুলিশ বলপ্রয়োগও করে।
এরপর গত কয়েকদিনে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকরা তিন হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বলে খবর আসে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা গড়ায় জাতীয় সংসদেও।
ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান বসানোর পর আলোচনার মধ্যে ফের ব্যাংকটি ‘দখলের চেষ্টা’ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকটিকে “অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ‘তাকবীর দিয়ে ব্যাংকটি দখলের’ অভিযোগ তোলেন।
এদিকে নগদ টাকার সংকটে ইসলামী ব্যাংক গত ১০ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চায়। এমন প্রেক্ষাপটে সেদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আশ্রাফুল আলমকে পর্যবেক্ষক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে বসান গভর্নর।
রোরবার ব্যাংকটিকে ২৫০০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংসদে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের ইসলামীর সদস্য মুজিবুর রহমান ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, ব্যাংকটির বিপুল অর্থ ‘চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’।
খুলনা-৪ আসনের সদস্য এস কে আজিজুল বারী হেলাল বলেন, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা হলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে অর্থবছর চলাকালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন নেয় সরকার। সাধারণত এসব আলোচনায় বাড়তি বরাদ্দের কারণ, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও এদিন সে বিষয়টি ছিল সীমিত।
বিরোধীদলীয় সদস্য জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান সম্পূরক বাজেটের প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “খরচ আগে করে ফেলে তারপরে অনুমোদন চাওয়া—এটা বোধহয় ‘সায়েন্টিফিক’ কথা নয়। ‘সায়েন্টিফিক’ হত অনুমোদন নিয়ে খরচ করা।”
এ সদস্যের মতে, ব্যয় সম্পন্ন হওয়ার পর সংসদে অনুমোদনের বিষয়টি কার্যত ‘আনুষ্ঠানিকতায়’ পরিণত হয়।
দুর্নীতি ও অপচয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনায় এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
একই দলের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে দুর্বল পরিকল্পনা, অপচয় ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে ধরেন। ঋণ ও সুদ পরিশোধে সরকারের বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিয়েও কথা বলেন তিনি।
অন্যদিকে সরকারদলীয় সদস্যদের বড় অংশই নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বক্তব্য দেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষা খাতে জিডিপির ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মতো বরাদ্দ ছিল, যা এবার ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
“আমরা এটাকে ৫ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই,” বলেন তিনি।
শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে পাঠক্রমের অংশ করার পরিকল্পনার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।
সরকারি দলের সদস্যরা বাজেটকে ‘জনবান্ধব’, ‘সময়নিষ্ঠ’, ‘বাস্তবমুখী’ ও ‘কল্যাণমুখী’ বলে বর্ণনা করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সদস্য এম এ হান্নান বাজেটকে ‘বাস্তবসম্মত ও জনবান্ধব’ আখ্যা দেন।
গাইবান্ধা-৪ আসনের সদস্য শামিম কায়সার বলেন, বাজেটের বিভিন্ন উদ্যোগ সংসদের উভয় পাশ থেকেই সমর্থন পেয়েছে।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য রাশিদা বেগম হীরা বলেন, নারীর প্রয়োজন ও অংশগ্রহণ বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্না মিনস সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে তুলে ধরেন।
বিরোধী বেঞ্চ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
জামায়াতের মাওলানা নুরুল আমিন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর রূপরেখা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও আলোচনা হয় বেশ কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য মাহমুদা হাবিবা খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে।
আলোচনার বড় অংশজুড়েই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
জামায়াতের সদস্যরা ইসলামি অর্থনীতি, সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা ও জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে মত দেন।
নীলফামারী-৪ আসনের সদস্য আব্দুল মুন্তাকিম বলেন, বাজেটে জেলা বা অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দের স্পষ্ট চিত্র থাকলে উন্নয়নের বৈষম্য বোঝা সহজ হতো।