Published : 09 Jun 2026, 06:16 PM
ইরানসহ পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে সংসদকে ধারণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক ও সম্ভাব্য দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
“এখন পর্যন্ত প্রভাব প্রধানত জ্বালানি, সার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি দৃশ্যমান।”
তবে খাতভিত্তিক প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার তথ্য সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী।
তার দেওয়া প্রাথমিক হিসাবে, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, জ্বালানি তেলে ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।
আমির খসরু বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতের ব্যয়ও বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাজারদর ও মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।”
পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো বাংলাদেশের কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধানের মত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
তবে মন্ত্রীর উত্তরে খাতভিত্তিক প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়নি। তিনি নিজেই বলেছেন, নির্ভরযোগ্য হিসাবের জন্য আরও তথ্য সমন্বয় প্রয়োজন।
এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অংশে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৪ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সাময়িক আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আদায় হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত সাময়িক শূন্যতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দাভাবকে দায়ী করেন তিনি।

রাজস্ব কমার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা, উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়া, মূসক ও সম্পূরক শুল্ক দেওয়া বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, আমদানি কমে যাওয়া, পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্ক-কর কমানো, এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার, মূলধনী যন্ত্রপাতির নতুন এইচএস কোড সংযোজন এবং বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন।
প্রায় দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বলেও স্বীকার করেন আমির খসরু।
ব্যবসা পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তৈরি পোশাকসহ উৎপাদনমুখী শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারেনি। আবার উচ্চ সুদহার ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা কমেছে, যা আয়কর আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে বছরের শেষভাগে অটোমেশন ও কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের কঠোর অবস্থান ঘাটতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।
সংরক্ষিত নারী আসনের আরেক সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের গৃহীত ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৭০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। মে পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে সঞ্চয়পত্রের ঋণ স্থিতি ২২১ কোটি ১ লাখ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের মে মাসের তুলনায় চলতি মে পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও সরকার বিনিয়োগ সুকুকের ঋণ স্থিতি বেড়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৩৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বলেও তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী।
এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি এবং অ্যাডাপটেশন ফান্ড থেকে জলবায়ু অর্থায়ন পেয়ে থাকে। এই তিন তহবিলের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৪৮৪ দশমিক ৪১১ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে।