Published : 22 Mar 2026, 02:26 PM
হালকা বেগুনি রঙের পাঁচটি ছড়ানো পাপড়ি, তার মধ্যে একটি পাপড়ির গায়ে গাঢ় রঙের ছটা; আর তিনটি বাঁকানো পুংকেশর। সব মিলিয়ে দারুণ এক দীপ্তি ছড়ানো ফুল দেবকাঞ্চন।
হেমন্তের ফুল দেবকাঞ্চনের দেখা মেলে শীতকালেও। চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় জুলাই স্মৃতি উদ্যানে পৌষের শুরুতে এক বিকেলে দেখা মেলে এই ফুলের।
বছর খানেক আগে এই পার্কটি নতুনভাবে সাজানো হয়। তখন কয়েক প্রজাতির ফুলের গাছ লাগানো হয়েছিল। তারই একটি এই দেবকাঞ্চন গাছ। গাছটিতে এবারই প্রথম ফুলের দেখা মিলল।
মূল প্রবেশপথের ডান পাশে বসার স্থানের কাছে দেয়াল ঘেষে মাঝারি আকারের একটি গাছে ফুটে থাকা বেগুনি রঙের ফুল দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। কেউ কেউ কাছে গিয়ে ফুলের সঙ্গে ছবিও তুলছিল।
দেশে ঋতুভেদে শ্বেতকাঞ্চন, দেবকাঞ্চন ও রক্তকাঞ্চনের দেখা মেলে। এরমধ্যে শ্বেতকাঞ্চন প্রায় সারা বছরই ফোটে। হেমন্ত থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত ফোটে দেবকাঞ্চন, আর শীত ও বসন্তের ফুল রক্তকাঞ্চন।
বিভ্রান্তি মেটাতে ফুলের ছবি পাঠালে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন জানান, হেমন্তে ফোটা এ বেগুনি রঙের কাঞ্চন হলো দেবকাঞ্চন।
দেবকাঞ্চন মাঝারি আকারের অর্ধচিরসবুজ গাছ। ফুলের পাপড়ি অসমান ও লম্বাটে। পাপড়ির সংখ্যা পাঁচটি। ফুল শুরুতে বেগুনি ও পরে রঙ বদলে সাদা হয়ে ওঠে।
দেবকাঞ্চনের বৈজ্ঞানিক নাম Bauhinia purpurea, এটি Fabaceae পরিবারের উদ্ভিদ।

এর নামকরণের চমকপ্রদ ইতিহাস আছে জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৭৫৩ সালে উদ্ভিদের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস বিদ্যার জনক কার্ল লিনিয়াস তার Species Plantarum গ্রন্থে, উদ্ভিদজগতে দুই সুইস উদ্ভিদবিদ ভাইয়ের অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই দেবকাঞ্চন গাছটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেন।
“দুই ভাইয়ের নাম Gaspard Bauhin ও Johann Bauhin এর সাথে মিল রেখে গণটির নামকরণ করেন Bauhinia এবং purpurea শব্দটি এসেছে এর দৃষ্টিনন্দন বেগুনি ফুলের রঙ থেকে।”
মাঝারি আকারের দেবকাঞ্চন গাছ সাধারণত ৬ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। গাছটি শাখা-প্রশাখা সমৃদ্ধ এবং ঝোপালো প্রকৃতির।

এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো পাতার গঠন। পাতা অগ্রভাগে দ্বিখণ্ডিত, যা Bauhinia গণের একটি চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। সবুজ পাতাগুলো সরল, বিকল্পভাবে অবস্থান করে এবং পাতার ডাঁটা সরু ও লম্বা হয়।
অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, দেবকাঞ্চনের ফুল সাধারণত বেগুনি, গোলাপি বা হালকা লালচে রঙের হয় এবং একটি শাখার অগ্রভাগে গুচ্ছাকারে ফোটে। প্রতিটি ফুলে পাঁচটি পাঁপড়ি থাকে এবং ফুল ফোটার মৌসুম প্রধানত শরৎ ও শীতকাল, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
“ফুলের পর গাছে লম্বা ও সমতল আকৃতির শুঁটি জাতীয় ফল ধরে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। ফল পাকলে তা ফেটে গিয়ে ভেতরে থাকা বীজগুলো ছড়িয়ে যায়। প্রতিটি ফলে সাধারণত ১০–১৫টি ছোট, বাদামি রঙের গোলাকার বা চ্যাপ্টা বীজ থাকে।”

দেবকাঞ্চন গাছের ছাল ও পাতার নির্যাস ডায়রিয়া, আলসার ও হজমজনিত সমস্যায় উপকারি। ফুল হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে এবং লিভারের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়। এর মূল ও বাকল রক্ত পরিশোধক ও প্রদাহনাশক হিসেবে কার্যকর বলে আয়ুর্বেদে বিবেচিত।
বীজ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে বলে বিশ্বাস করা হয়। কিছু অঞ্চলে এর কচি ফুল ও পাতাকে রান্না করে সবজি হিসেবে খাওয়ার চল রয়েছে।

অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “দেবকাঞ্চনের ফুল, পাতা ও ছালের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান, যা কসমেটিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
“এসব দিক বিবেচনায় গাছটি একটি উপকারী, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ।”
শেষ বিকেলের আলোয় শহুরে পার্কে সবুজের মাঝে দেবকাঞ্চনের বেগুনি আভা মনের ক্যানভাসে এক চিরস্থায়ী ছবি এঁকে দেয়।