Published : 15 Jun 2026, 05:47 PM
বছর দুয়েক আগে চট্টগ্রাম নগরী থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনা তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বলছে, জমি বিক্রি ঠেকাতে ওই ব্যক্তিকে খুন করেছিলেন তারই ছেলে।
এ ঘটনায় অভিযোগ ওঠা ৩৫ বছর বয়সি বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হত্যা রহস্য উদঘাটনের তথ্য জানাতে সোমবার দুপুরে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সংস্থার মহানগর ইউনিটের পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম।
খুন হওয়া মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) চট্টগ্রামের বাঁশখালী জেলার পূর্ব চাম্বল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পেশায় বাবুর্চি মজিবুর রহমান তিনটি বিয়ে করেন।
তার প্রথম স্ত্রীর ঘরে আছে দুই ছেলে বেলাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে সালমা খানম নামের একটি মেয়ে আছে। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর মজিবুর রহমান তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নানা বাড়ি ফটিকছড়িতে থাকতেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২২ সালে মজিবুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলে তিনি বাঁশখালীতে থাকা নিজের কিছু জমি বিক্রি করে দ্বিতীয় ঘরের মেয়ে সালমাকে সেই টাকা দেন। এতে প্রথম ঘরের সন্তান বেলাল ক্ষিপ্ত হয়। এতে বেলালের ধারণা হয়, বাবা তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করছে।

পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “মজিবুর রহমান নিজের আরো সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নিলে বেলাল হোসেন বাবাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।”
খুনের ঘটনার আগে থেকেই বেলাল চট্টগ্রাম নগরীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন, থাকতেন খুলশী থানা এলাকায় এক ভাড়া বাসায়। বাঁশখালীতে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন তার ভাই আনোয়ার হোসেন।
পিবিআই কর্মকর্তা এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “বেলাল হোসেন পরিকল্পনা অনুযায়ী তার পূর্ব পরিচিত এক নারীকে তার বাবার সাথে টেলিফোনে প্রেমের অভিনয় করার পরামর্শ দেয়।
“বেলাল হোসেনের পরামর্শে ওই নারী মজিবুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে।”
এর মধ্যে মজিবুর রহমান ২০২৪ সালের ৬ জুন ফটিকছড়ির বাড়ি থেকে নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় তার মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে আসেন।
মেয়ের বাসায় থাকাকালে ৭ জুন মজিবুর রহমান মোবাইলে যোগাযোগ হওয়া নারীর অনুরোধে নগরীর বাকলিয়া থানার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরি এলাকায় তার বাসায় যায়। ওই বাসায় আগে থেকেই বেলাল হোসেনের স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী আব্দুল জলিল উপস্থিত ছিলেন বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মজিবুর রহমান ওই বাসায় গেলে সেই নারী ও আব্দুল জলিল শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়ে মজিবুরকে খাওয়ান। এতে তিনি অর্ধচেতন হয়ে পড়েন। পরে সেদিন বিকালে আব্দুল জলিল ও বেলাল হোসেন মিলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মজিবুরকে নগরীর সিআরবি এলাকাতে নিয়ে যান।
পিবিআই কর্মকর্তা এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, সিআরবিতে মজিবুরকে অটোরিকশায় জলিলের পাহারায় রেখে বেলাল নগরীর লালদীঘি পাড় থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়ায় নিয়ে আসেন।
“তারপর মাইক্রোবাসটি নিজে চালিয়ে সন্ধ্যার দিকে আব্দুল জলিলসহ মজিবুরকে হালিশহর থানার আউটার রিং রোডে নিয়ে যায়। সেখানে গাড়ি থামিয়ে বেলাল হোসেন ও আব্দুল জলিল ভিকটিম মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং লাশটি রাস্তার পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।”

হত্যার সময় মজিবুরের পরনে ছিল সাদা লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি। গলায় গামছাটি পেঁচানো অবস্থায় পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করেছিল।
বাবার কোনো খোঁজ না পেয়ে মজিবুরের মেয়ে সালমা খানম ওই বছরের ৭ জুলাই কোতোয়ালী থানায় একটি জিডি করেন। পরে ওই বছরের ৬ নভেম্বর আদালতে অপহরণের মামলা করেন।
এর মধ্যে ৯ জুন নগরীর হালিশহর থানার আউটার রিং রোড এলাকার জঙ্গল থেকে লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
হালিশহর থানা পুলিশ লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি দাফন করেছিল। নিহতের পরিচয় উদঘাটন ও হত্যার কারণ নির্ণয় করতে না পেরে থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দিয়ে দেয়।
পরে পিবিআই এই ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক এলাকা থেকে বেলাল হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার ঘোড়ামারা এলাকা থেকে আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের এসপি এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “বেলাল হোসেনের পরিকল্পনা অনুসারে তার বাবা মজিবুর রহমানকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর জঙ্গলে নিয়ে লাশ ফেলে দেয় বলে গ্রেপ্তার দুজন জানিয়েছে।”
বেলাল হোসেনকে রোববার আদালতে উপস্থাপন করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান পিবিআই কর্মকতারা। এ ঘটনায় বেলালের সহযোগী ওই নারীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।