Published : 10 Mar 2026, 12:11 AM
দিনভর বিশেষ অভিযানে জঙ্গল ছলিমপুরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকারীদের ধরতে না পারলেও দীর্ঘদিন পর ওই এলাকার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিতে পারাকে ‘অর্জন’ হিসেবে দেখছে পুলিশ ও প্রশাসন।
সোমবার বিপুল সংখ্যক সদস্যদের নিয়ে যৌথবাহিনীর অভিযানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুর থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ ১২ জনকে আটকের তথ্য দিয়েছে জেলা পুলিশ।
তবে সেখানকার অপরাধ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন উদ্দিন ধরা পড়েনি এ অভিযানে।
তিন হাজারের বেশি সদস্যদের নিয়ে অভিযানের পর দুর্গম ওই এলাকার সরকারি জমিতে গড়ে তোলা আবাসিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যৌথ বাহিনী।
অভিযানের পরপরই সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করার তথ্য দেন চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ। বলেন, “সেখানে পুলিশ ও র্যাব মিলে ৩০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশাকরি পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।”

এখন ওই এলাকায় সরকারের আগের পরিকল্পনা অনুসারে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে চায় স্থানীয় প্রশাসন।
অভিযান যেভাবে
সেনা, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের সুসজ্জিত সদস্যরা দলে দলে এদিন যখন জঙ্গল ছলিমপুরে প্রবেশ করছিলেন তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যানগুলো রাখা হয় ছলিমপুরের প্রবেশপথের সামনে বায়েজিদ লিংক রোডে।
ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএনসহ মোট ৩১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাতজন ম্যাজিস্ট্রেট এই বিশেষ অভিযান শুরু করে।
দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় অভিযানে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি (আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার) র্যাব ও সিএমপি’র তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
অভিযানের বিষয়ে পরে রাতে জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্র মজুদ, পাহাড় কেটে প্লট বিক্রি, অপরাধীদের আশ্রয়স্থল তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগে এ অভিযান হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে ‘কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করে অভিযান পরিচালনা করে।
বড় এলাকা হওয়ায় কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে অভিযান শুরু করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
অভিযানে বাধা দিতে জঙ্গল ছলিমপুরের ছিন্নমূল অংশের পর আলী নগরের প্রবেশপথে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রাখা হয়েছিল।
সেখান থেকে একটু এগোলো অভিযানকারী দলের সদস্যরা দেখতে পান, স্থানীয় খালের ওপর একটি কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে। সেটি ইটবালি সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করে ভেতরে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করেন সদস্যরা।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম স্থানে একযোগে অবস্থান গ্রহণ করে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ, গোপন স্থাপনা এবং অপরাধীদের সম্ভাব্য অবস্থানসমূহে তল্লাশি চালানো হয়।

অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৮০০ জন, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন, এপিবিএন ৩৩০ জন সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ১২২ জন এবং র্যাবের ৩৭১ জন অংশ নেয়।
সিসি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ
জেলা পুলিশ বলছে, অভিযানে একটি পিস্তল, একটি এলজি, চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশি অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স এবং দুটি বাইনোকুলার পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উদ্ধার করা আলামতগুলো দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, এলাকায় নজরদারি স্থাপন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো।”
প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গল ছলিমপুরের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ নিয়ন্ত্রণ করা হয় স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে।
সেখানকার বাসিন্দারা ছাড়া অন্যরা প্রবেশ করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। অতীতে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে হামলার শিকারও হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সমিতির সদস্যপদ নিতে হয় টাকার বিনিময়ে। পরে সমিতিকে টাকা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একেক খণ্ড জমির দখল নিয়ে ঘর তোলা হয়। ঘর তুলতেও নিয়ন্ত্রকদের টাকা দিতে হয়।
২০১০ সালে গিয়েও ওই এলাকায় নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রহরা পেরিয়ে ঢুকতে হয়েছিল। এবার দেখা গেল, এলাকার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হচ্ছে সিসি ক্যামেরা।

অধরা ‘নিয়ন্ত্রকরা’
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সেখানে আবারও স্থানীয় অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার তথ্য দেয় পুলিশ। কয়েকবার সংঘর্ষ ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন।
ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
সবশেষ ১৯ জানুয়ারি সেখানে অভিযানে গিয়ে র্যাব সদস্যের মৃত্যুর পর আবার আলোচনায় আসে জঙ্গল ছলিমপুর ও সেখানকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি ওই এলাকায় গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর সদস্য নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
নিহতের জানাজায় এসে র্যাবপ্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর প্রায় দেড় মাস পর সোমবার হলো সেই অভিযান।
জঙ্গল ছলিমপুরের দুই অংশ- ছিন্নমূল ও আলী নগর। এরমধ্যে ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ রোকন উদ্দিন ও তার অনুসারীদের হাতে এবং আলী নগরের নিয়ন্ত্রণ মোহাম্মদ ইয়াছিন ও তার অনুসারীদের হাতে।
সোমবারের অভিযানেও অধরা এই দুই পক্ষের নেতৃত্বদানকারী ও তাদের অনুসারীরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের বড় অভিযান চালাতে প্রস্তুতি লাগে। কোনো না কোনোভাবে তারা হয়ত খবর পায়। এবারও হয়ত খবর পেয়েছে। জঙ্গল ছলিমপুর বিশাল এলাকা, চারিদিকে পালানোর পথ আছে। অভিযানে এজাহারনামীয় ১১ জনকে আটক করেছি।
“আমরা ভিতরে থাকলে তারা যদি ভিতরে লুকায়, তাহলে যেখানেই থাকুক না কেন আজ বা কাল ধরতে পারব। এখন আমরা আছি। আমরা থাকলে তারা পালাবে কোথায়?”
তবুও অভিযান সফল দাবি করে তিনি বলেন, “তাদের যদি এতই শক্তি থাকে তাহলে তারা আজ পালালো কেন? দীর্ঘসময় পর আমরা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি। আরেকবার যদি তারা আমাদের ওভারপ্লে করতে পারে তাহলে আবার আমাদের সেখানে ঢুকতে অনেক সময় লাগবে।
“কাজেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনারা নিয়মিত যাবেন। আমরাও আছি সেখানে। প্রশাসনের কোন ত্রুটি থাকলে বলবেন।”

‘কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সন্তুষ্ট’ প্রশাসন
অভিযান শেষে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে সরকারের কিছু পরিকল্পনা আছে। পরিকল্পনাটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা যে প্রতিবন্ধকতাটা বোধ করছিলাম এতদিন। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় সেই প্রতিবন্ধকতা থেকে আমরা মুক্ত হলাম।
“সরকার যেসমস্ত পরিকল্পনা পূর্বে গ্রহণ করেছিল এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নের যেসমস্ত পরিকল্পনা ভবিষ্যতেও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সেগুলোর জন্য পথ উন্মুক্ত হলো। যেসব পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা এখন নিয়মিতভাবে কাজ করে যাব।”
অভিযান চালাতে এত দেরি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “অবশ্য ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক, এটা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মাঝখানে নির্বাচন পরিচালনার কাজ ছিল। এর পরপরই সমবেতভাবে অভিযান পরিচালনা হল।
“এই এলাকার উপর সরকারের কর্তৃত্বের একটু সমস্যা ছিল। তা দূরীভূত হয়ে সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল।”
এর আগে ২০২২ সালে এই খাস জমি দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার।
তখন উচ্ছেদ অভিযানে বারেবারে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টানা উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট’ বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের ডিআইজি আহসান হাবীব বলেন, “কারাগার, চিড়িয়াখানাসহ যা যা পরিকল্পনা ছিল সেগুলো যেন তাড়াতাড়ি করা হয়। শহরের কেন্দ্রে এত বড় একটা সরকারি জমি দুয়েকজন মানুষের হাতে কীভাবে জিম্মি থাকতে পারে?
“এখান থেকে আয় রোজগারের একটি বিরাট অংশ কিছু লোকজন পেয়ে থাকে। তাই এই এলাকা জিম্মি থাকলে বিশেষ কিছু লোকের সুবিধা হয়। সেকারণে দ্রুত সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দরকার।”