Published : 11 Jul 2025, 01:55 AM
চট্টগ্রামে নালায় পড়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় শিশুটির মায়ের ও তার কর্মস্থলের ‘গাফিলতি’ দেখছে সিটি করপোরেশনের গঠিত তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটি এ দুর্ঘটনার চারটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরে প্রতিকারের জন্য ছয়টি সুপারিশ করেছে।
তবে ওই নালার ওপর স্ল্যাব না থাকা কিংবা বেষ্টনী না থাকার জন্য কারও দায় রয়েছে কি না সেই বিষয়ে কিছু বলা হয়নি প্রতিবেদনে।
নগরীর হালিশহরের আনন্দপুরে নালায় পড়ে হুমাইরা (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত এ কমিটি একদিনের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী রাত পৌনে ১২টায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আমাদের কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। একদিনের মধ্যে আমাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সময় কম পেলেও আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করেছি।”
প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার যেসব সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছে তার মধ্যে আছে- শিশুটির মায়ের কর্মস্থলে কর্মীদের শিশু সন্তানদের রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকা, পরিবারের দায়িত্বহীনতা, ভবনের মূল ফটক খোলা থাকা এবং সড়কের অবস্থান ও উচ্চতার তারতম্য।
কমিটির আহ্বায়ক বলেন, “আবাসিক এলাকায় এরকম কারখানা থাকা উচিত না। তাছাড়া কর্মীদের শিশু সন্তানদের রাখার মত কোন ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। শিশুদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল।
“দুর্ঘটনার সময় বাচ্চাটি একা ছিল। বাইরে যখন ভারি বর্ষণ এবং রাস্তায় পানি জমে গেছে তখন শিশুটিকে এভাবে একা বাইরে রাখা ঠিক হয়নি। এতে মায়ের গাফিলতি ছিল।”
বুধবার দুপুরে নগরীর হালিশহর আনন্দপুরের একটি নালায় পড়ে তলিয়ে যায় শিশু হুমাইরা। ঘণ্টাখানেক পরে স্থানীয়রা ওই নালার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বড় নালার নিচ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি।
আনন্দপুরি এলাকার জামে মসজিদ সংলগ্ন গলির মুখে যেখানে এ ঘটনা ঘটে সেখানে স্থানীয় নিয়াজ খানের মালিকানাধীন পাঁচতলা একটি ভবনের নিচতলায় সাবরিনা অ্যাপারেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হুমাইরার মা আসমা বেগম।
শিশু হুমাইরাকে সঙ্গে নিয়ে মা আসমা বেগম ওই কারখানায় বুধবার কাজ করতে আসেন। পরে শিশুটি ওই ভবনের সামনে একটি ফুটবল নিয়ে খেলছিল।
ওই ভবনের ভিতরে থাকা একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ফুটবল নিয়ে খেলার সময় বলটি পানিতে পড়ে গেলে সেটি তুলতে গিয়ে ভবন লাগোয়া মসজিদ গলির মুখের ছোট নালায় পড়ে যায় হুমাইরা।
ওই ছোট নালাটি ভবনের সামনের মূল সড়কের বড় নালার সঙ্গে যুক্ত। নালায় পড়ার পরপরই কয়েকজন ছুটে এলেও পানির টানে শিশুটি বড় নালায় চলে যাওয়ায় তাকে উদ্ধার করতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, “তিন বছরের একটি ছোট শিশু একা একা এই ধরণের প্রবল বর্ষণের সময় বাইরে অবস্থান করা এবং খেলাধুলা করার ক্ষেত্রে পরিবারের উচিত ছিল তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা। শিশুটি নালায় পতিত হয়ে মৃত্যুর পিছনে এটি একটি অন্যতম কারণ।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বলেন, “ওই ভবনে কোনো নিরাপত্তা রক্ষীও নেই। একজন কেয়ারটেকার আছে, সে মূল ফটক খোলা রেখেছিল। যদি মূল ফটক বন্ধ থাকত তাহলে শিশুটি বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেত না এবং এরকম দুর্ঘটনাও ঘটত না।”

শিশু হুমাইরার মৃত্যুর চতুর্থ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘সড়কের অবস্থান ও উচ্চতার তারতম্য’র কথা বলেছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়- “ঘটনাস্থলের গলির সড়কের (বাই লেইন) চেয়ে মূল সড়কের উচ্চতা বেশি হওয়ায় এবং বাই লেইনটির পেছনে অত্যধিক বড় খালি জায়গার পানি প্রবাহিত হওয়ায় ওই সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সড়ক দুটির মাঝের উচ্চতার তারতম্যের জন্য দুটি নালার সংযোগ স্থলে ছোট নালার গভীরতা বৃদ্ধি পায় (২ ফুট ১০ ইঞ্চি) এবং পানি নিষ্কাশনের সময় প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়, যা শিশুটির ছোট নালায় পড়ে বড় নালায় ঢুকে যাওয়ার কারণ।”
ভবিষ্যতে এই ধরণের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যে ছয়টি সুপারিশ করেছে তার মধ্যে শুরুতেই আছে- কর্মস্থলে কর্মীদের শিশুদের নিরাপত্তা ও নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করা।

দ্বিতীয় সুপারিশে বলা হয়, “ভৌগলিকভাবে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানের উচ্চতা বিভিন্ন রকম হওয়ায় ও নগরায়ন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে কিছু সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা হতে পারে।
“তাই নগরবাসী তাদের চলাচলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অধিক মনোযোগী ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন।”
অন্য সুপারিশগুলো হলো- জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার আয়তনের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ সিস্টেমের ব্যবস্থা করা, ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের অনুমোদিত নীতিমালা মেনে চলা, ড্রেনেজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ নালার উপর স্ল্যাব স্থাপন করা, ব্যক্তি মালিকানাধীন সড়ক ও ড্রেনেজের জন্য মালিকপক্ষকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় কারখানা পরিচালনায় আইনগত বিধান নিশ্চিত করা এবং নগরবাসীর সচেতনতার জন্য প্রচারণার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য মাইকিং করা বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হয়েছে।
গত নয় বছরে চট্টগ্রাম নগরীতে বর্ষা মৌসুমে খাল-নালায় পড়ে কমপক্ষে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। শুরুতে খাল-নালায় পড়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় সিটি করপোরেশন ও সিডিএ একে অন্যকে দুষেছিল।

এরপর খাল-নালায় নিরাপত্তা বেস্টনি না থাকাকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। এরপর তালিকা করে খাল-নালায় বেস্টনি দেয়ারও উদ্যোগ নেয়া হয়।
এরমধ্যেও গত ১৮ এপ্রিল নগরীর কাপাসগোলা এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে রিকশা খালে পড়ে গিয়ে সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর তিন মাসের মধ্যে আরেক শিশুর মৃত্যু হল।
এদিকে কানাডায় অবস্থানকারী সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শিশু হুমাইরার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, “একটি আবাসিক এলাকা হওয়ার পরও সেখানে কীভাবে একটি পোশাক কারখানা স্থাপিত হয়েছে তা জানতে চেয়ে সিডিএকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হবে।”
চট্টগ্রামে খাল-নালায় মৃত্যু থামছেই না
চট্টগ্রামে নালায় তলিয়ে যাওয়া শিশু উদ্ধার
ব্যস্ত নগরীতে উদাম নালা, নিরাপদ হবে কবে?
চট্টগ্রামে রিকশা পড়ল নালায়, তলিয়ে গেল ৭ মাসের শিশু
চট্টগ্রামে নালায় পড়ে মৃত্যু: দায় কার?
কর্তৃপক্ষ এখন বলছে, চট্টগ্রামে খালের পাড়ে বেড়া হবে, নালার ওপর স্ল্যাব
নালায় শিশু মৃত্যুর দায় এড়াতে পারি না: মেয়র শাহাদাত
নালায় রিকশা উল্টে শিশুর মৃত্যু: সিডিএ-চসিকের 'গাফিলতির' খোঁজে দুদক
চট্টগ্রামে সেই খালের পাড়ে দেয়াল, তবুও সিসিসি-সিডিএ ঠেলাঠেলি