Published : 16 Mar 2026, 12:10 AM
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার বামনসুন্দর খালটির বিভিন্ন অংশ প্রায় তিন দশক ধরে ভরাট হয়ে আছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে খাল পাড়ের প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ।
খালটি খনন হলে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার কৃষক সেচ সুবিধা পাবেন। এতে প্রায় ১০ হাজার টন ফসলের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
প্রাথমিক পর্যায়ে যে তিন কিলোমিটার খাল খনন করা হবে, তাতে ৫৮০ হেক্টর কৃষি জমিতে সুফল মিলবে। ফসল উৎপাদন বাড়বে প্রায় ১৫ কোটি টাকার।
সোমবার দেশব্যাপী শুরু হতে যাওয়া খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মীরসরাই উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের পশ্চিম মলিয়াইশ বানাতলী জলদাসপাড়া এলাকার বামনসুন্দর খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।
খালের বেহাল দশা
মীরসরাই উপজেলায় ৬৩টি ছোট-বড় খাল আছে। এসব খালের পানি তিনটি প্রধান খাল হয়ে বঙ্গোপসাগরে মেশে। এই তিন খালের একটি বামনসুন্দর খাল।
উপজেলার ছত্তর ভুঁইয়া বাজার এলাকা থেকে খালটি যাত্রা শুরু করে কাটাছরা, মিঠানালা, মঘাদিয়া, সাহেরখালী ও ইছাখালী ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।
এই খালের সঙ্গে ফেনী নদী, মহামায়া লেক এবং বেশ কয়েকটি ছোট খালের সংযোগ আছে। বামনসুন্দর খালের বেশিরভাগ অংশই কাটাছরা ও মিঠানালা ইউনিয়নে।
মিঠানালা ইউনিয়নের পশ্চিম মলিয়াইশ অংশে দেখা যায়, বামনসুন্দর খাল শুকিয়ে গেছে। সরু একটি পানির ধারা আছে খালে। তাতে শ্যাওলা জমেছে। খালে পড়ে আছে নানা রকম আবর্জনা।

মলিয়াইশের বাসিন্দা এবং সামাজিক সংগঠন ‘আদর্শ গ্রাম শেখটোলার’ প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার জামশেদ আলম চৌধুরী তপু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত প্রায় ৩০ বছর ধরে খালটির কোনো সংস্কার হয়নি। বিভিন্ন স্থানে খালের জমিতে কেউ বসতঘর করেছেন, কেউ দোকান তুলেছে খুঁটি গেড়ে। আবার কেউ খালে বাথরুম নির্মাণ করেছে। ময়লা আবর্জনা পড়ে খালের বিভিন্ন অংশ ভরে গেছে। কোথাও গভীরতা মাত্র ৫ ফুট।
“খালে পানি প্রবাহ না থাকায় ঠিকমত চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই এলাকায় ইরি ধান, কয়েক রকমের ডাল ও তরমুজ চাষ হয়। লিলির চরের পাশ দিয়ে খালটি প্রবাহিত হয়েছে। সেই চরে খুব ভালো তরমুজ হত। কিন্তু খালে পানি কম থাকায় সেচের অভাবে তরমুজের ফলন ভালো হচ্ছে না। সেচের খরচও অনেক বেড়ে গেছে।”
কাটাছরা ইউনিয়নের তেতৈয়া গ্রামের কৃষক কেফায়েত উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এলাকায় খালে পানি কম। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ এখন আর চাষ করে না। সরকারি কিছু ডিপ টিউবওয়েল আছে। কিন্তু সেগুলোর মোটর প্রায়ই চুরি হয়ে যায়। যারা এখনো চাষ করে তারা বেশিরভাগ ধান আর কিছু ডাল করে। অন্য ফসল করে না।”
কাঠাছরা ইউনিয়নের বামনসুন্দর দারোগাহাট বাজার অংশে দেখা যায়, বাজারের সব আবর্জনা খালে ফেলা হয়। সেখানে খালে পানি প্রবাহ নেই বললেই চলে। প্লাস্টিক-পলিথিনসহ বিভিন্ন রকম আবর্জনা জমে আছে খালে।

মীরসরাইয়ের সাংবাদিক মো. আবু সাঈদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দখল ও দূষণে বামনসুন্দর খাল বেশির ভাগ অংশে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া সাগরের মুখে খালের স্লুইস গেটও দীর্ঘদিন অকার্যকর ছিল। পরে মেরামত করা হয়।
“খালের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন ভাবে দখল হয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে খালের ভিতর বাঁধ দেওয়া হয়। এতে গভীরতা কমে যায়। পরে বর্ষায় সাগর থেকে পানি ঢুকলে তখন আশেপাশের জমির উপর দিয়ে সেই পানি প্রবাহিত হয়। পানির অভাবে খাল পাড়ের জমিতে এখন আর সারা বছর চাষাবাদ সম্ভব হয় না।”
কাঠাছড়া ইউনিয়নের বাড়িয়াখালি ওয়ার্ডের বাসিন্দা সফিউল আলম খন্দকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বামনসুন্দর খালের পানি দিয়ে দুই পাড়ের কৃষকরা চাষের কাজ করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এখন কৃষকরা আর সেচের কাজে এই খালের পানি ব্যবহার করতে পারে না। সেচ পাম্পের খরচ বেশি হওয়ায় অনেকেই চাষ বন্ধ রেখেছেন।
“গত প্রায় দুই দশক করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী হুমায়ন শুষ্ক মৌসুমে খাল বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করতেন। এতে করে খালের দারোগাহাট থেকে স্লুইস গেট পর্যন্ত অংশের গভীরতা একেবারে কমে গেছে।”
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম চৌধুরী হুমায়নের মোবাইলে ফোন করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
খননে নতুন আশা
প্রাথমিক পর্যায়ে বামনসুন্দর খালের অলির পুল থেকে পশ্চিম মলিয়াইশ বানাতলী জলদাসপাড়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার অংশ খনন করা হবে।

মীরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এতে মোট ৫৮০ হেক্টর জমির প্রায় এক হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। এরমধ্যে ৩৫০ হেক্টর জমি দুই ফসলি। খালে পর্যাপ্ত পানি থাকলে এসব জমি হবে তিন ফসলি। নতুন করে চাষের আওতায় আসবে ২৩০ হেক্টর জমি।
“এই এলাকায় ধান, ডাল ও তরমুজ চাষ হয়। কিন্তু পানি অপর্যাপ্ত হওয়ায় অন্য ফসল করা যায় না। যদি পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা থাকে তাহলে বোর ধান করতে পারবে। এছাড়া ডাল চাষেও বেশ পানির প্রয়োজন। সেচের আওতা বাড়লে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ফসল বেশি উৎপাদন হবে “
খাল খনন কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বামনসুন্দর খালটি ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। খালের বেশিরভাগ অংশে এখন যে পানি তাতে সেচ পাম্প চালানো সম্ভব হয় না। শুরুতে তিন কিলোমিটার খনন করা হবে।
“পর্যায়ক্রমে পুরো খালটি খনন করা হলে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির কৃষক সেচের সুবিধা পাবেন। এতে বিভিন্ন রকম ফসলের মোট উৎপাদন বাড়বে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন। আমাদের লক্ষ্য খালে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি।”
সোমবার খাল খনন উপলক্ষ্যে স্থানীয় মলিয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিন উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।