Published : 10 Mar 2026, 09:21 PM
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ ও ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণসহ বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও সবই থেকে গেছে কাগজে কলমে।
বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কথা বলে ২০২২ সালে সেখানে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। স্থানীয়দের ‘প্রতিরোধের মুখে’ তা বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া যায়নি। বার বার সেখানে অভিযানে গিয়ে পিছু হঠতে হয়েছে প্রশাসনকে।
সোমবার সেই জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর অভিযানের পর এলাকাটি এখন পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসার কথা বলা হচ্ছে।
সে কারণে প্রশ্ন উঠছে, চার বছর আগে জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছিল, এবার সেগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে?
এর উত্তরে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়া উদ্দিন বলছেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারের নির্দেশনা।

সোমবার হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাজোয়া যান নিয়ে হাজারের বেশি সেনা, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্যের যৌথ বাহিনী জঙ্গল সলিমপুরে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অভিযান চালায়। সে অভিযানে উল্লেখযোগ্য কাউকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
অভিযানের বিষয়ে ব্রিফ করতে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে আসেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তার কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ছাড়াও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক ও বিজিবি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “২০০৩ সাল থেকে সরকারের প্রায় ৩১ শ একর খাস জমিতে আনুমানিক ৩৪টি পাহাড় কেটে লক্ষাধিক মানুষের মাঝে জমিজমা বিক্রি, নিজস্ব রাস্তা নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হয় এখানে। প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে কীভাবে এ সমস্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জঙ্গল ছলিমপুর।”
তিনি বলেন, “কোথাকার কোন ইয়াছিন ও জসীম মেম্বার বছরের বছর বছর কার মদদে এখানে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তা আমাদের কাছে রীতিমত উৎকন্ঠার বিষয়। আমাদের সকলকে সমন্বিত উদ্যোগের মধ্যে বের করতে হবে কারা এ উদ্যোগ ও কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।”

ডিআইজি বলেন, কিছু ‘ভূমিদস্যু’ দর্ঘীদিন ধরে সরকারি এ খাস জমি দখল ও ব্যবহার করে আসছে। তাদের প্রশ্রয়ে কিছু মানুষ সরকারি প্রচেষ্টাকে বারবার ‘ব্যহত’ করছে।
“এ সমস্ত দলিল কারা কীভাবে পেল এবং মালিকানা পাওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন এবং বিভাগীয় কমিশনারসহ সবার সাথে কথা বলছি।”
২০২২ সালে এ জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে উচ্ছেদে গিয়েছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। তখনও তারা স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়।
ওই বছরের ১ জুলাই সলিমপুরে থাকা খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান।
সেদিন জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে সাবেক তথ্য মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ সেখানে কারাগার স্থানান্তর, চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র, আর্মি স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, পার্কসহ অনেক কিছুই করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে জিআইজি বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিনকে এর উত্তর দিতে বলেন।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, “একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরও তাদের কার্যক্রম রেখেছে। যেহেতু ওখানে আমাদের কোনো কিছু বাস্তবায়ন করার মত অবস্থা ছিল না, সেহেতু প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারিনি।”
এবার জঙ্গল সলিমপুর ‘নিয়ন্ত্রণে’ আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা এখন মনে করছি প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হবে না। সেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে তাদের মাধ্যমে জিনিসগুলো বাস্তবায়িত হবে।”

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, সেখানে অনেক ছিন্নমূল ও ভাড়াটিয়া রয়েছে। তাদের বিষয়ে কী করা হবে, তা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত।
“জনগণের ওয়েলফেয়ারের একটা বিষয় রয়েছে। আমরা এ বিষয়টাও মন্ত্রাণালয়ে তুলে ধরেছি। আমরা হয়ত একটা নির্দেশনা পাব। তাদের কোনোভাবে কোথাও প্রতিস্থাপন করে… মন্ত্রণালয় যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেটাই বাস্তবায়ন করব।”
দুই দশকের বেশি সময় ধরে জঙ্গল ছলিমপুরের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ নিয়ন্ত্রিত হত স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে।
সেখানকার বাসিন্দারা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তেন। অতীতে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সমিতির সদস্যপদ নিতে হয় টাকার বিনিময়ে। পরে সমিতিকে টাকা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একেক খণ্ড জমির দখল নিয়ে ঘর তোলা হয়। ঘর তুলতেও নিয়ন্ত্রকদের টাকা দিতে হয়।
সরকারি খাস জমিতে অবৈধভাবে বসতি নির্মাণ করা হলেও সেখানে ছিল গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বৈধ সংযোগ। বিভিন্ন সময়ে সেগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে প্রশাসনকে।
এবার বিদ্যুৎ পানির বিষয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিন।
পুরনো খবর
জঙ্গল সলিমপুরে হবে কারাগার স্টেডিয়াম, সঙ্গে ‘ছিন্নমূলদের’ পুনর্বাসনও: তথ্যমন্ত্রী
জঙ্গল সলিমপুর: বিকল্প রাস্তাগুলো বন্ধ করল প্রশাসন
জঙ্গল সলিমপুরে আবাসিক প্রকল্প পরিদর্শনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা