Published : 18 Apr 2026, 09:44 PM
নগরীর সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্প ‘পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের’ খবরে ক্ষোভ ও নিন্দা এসেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহল থেকে।
শনিবার একাধিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সিআরবি এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও এসেছে।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় সিআরবির সাত রাস্তার মোড়ে ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’ ব্যানারে এ কর্মসূচি হওয়ার কথা।
পরদিন সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টায় সিআরবি চত্বরে সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। ‘সিআরবিতে আবার হাসপাতাল করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধে’ এই সমাবেশ ডেকেছে তারা।
সরকার অবিলম্বে সিআরবিতে বেসরকারি হাসপাতাল প্রকল্পের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা না করলে লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
২০২১ সালের জুলাই মাসে এ প্রকল্পের জমি হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়। টানা ১৫ মাস ধরে সেই আন্দোলন চলে।
সেই আন্দোলনে ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ এবং ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’সহ বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নিয়েছিল।
এক পর্যায়ে তখনকর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা সিআরবিতে হাসপাতাল না করার পক্ষে অবস্থান নেন।
টানা ৪৮০ দিন ধরে চলা সেই আন্দোলনের মুখে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ঘোষণা দেয়।
ওই আশ্বাসে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সেই আন্দোলন শেষ হয়। প্রায় সাড়ে তিন বছর পর সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়টি আবারও সামনে এল।
হাসপাতাল প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি
২০২১-২২ সালে সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন হয়েছিল বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিকদের মোর্চা ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ এর ব্যানারে।
শনিবার সন্ধ্যায় নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের কো-চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান, কো-চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী, যুগ্ম সদস্য সচিব কামরুল হাসান বাদল, যুগ্ম সদস্য সচিব মহসীন কাজী এবং সদস্য আমিনুল ইসলাম বিবৃতি দেন।
বিবৃতিতে আবারো হাসপাতাল প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়ার ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও নিন্দা’ জানিয়ে অবিলম্বে প্রকল্পটি স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে তারা বলেন, “এই হাসপাতাল হলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রকল্পের নির্দিষ্ট স্থানেই সীমিত থাকবে না। প্রকল্প এলাকা ঘিরে নতুন নতুন দালান, অবকাঠামো, দোকানপাট, পার্কিং, ফার্মেসি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের জন্য আবাসিক ভবনে ছেয়ে যাবে।
“যার ফলে পরিবেশ দূষণ ঘটবে এবং পুরো সিআরবি এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বলয় হুমকিতে পড়বে।”

২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) সিআরবি কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি যা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে না এবং এখানে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, “২০১৭ সালে যখন পিপিপিতে হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তাব রেলওয়ে করেছিল, সেখানে প্রকল্পের স্থান হিসেবে সিআরবি না থাকলেও পরে অপকৌশলের মাধ্যমে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়।
“আবারো সেখানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করছি।”
প্রায় সাড়ে তিন বছর পর আবার একই স্থানে হাসপাতাল নির্মাণে নব নির্বাচিত সরকারের উদ্যোগ অত্যন্ত ‘উদ্বেগজনক’ এবং সারাদেশের মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা ‘দুঃখজনক’ বলেও মন্তব্য করেন তারা।
বিবৃতিতে সংগঠনের নেতারা বলেন, “রেলের জমি সংরক্ষণ করার কথা রেল কর্তৃপক্ষের। উল্টো তারাই সে জমি দিয়ে দিতে চায়। আমাদের একটাই দাবি, এখানে কোনো হাসপাতাল হবে না।
“নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম বলতে চায়, হাসপাতালের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানানোর চেষ্টা যারা করছেন, তারা ভুল করছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তে রঞ্জিত সিআরবির মাটি নিয়ে ব্যবসা করার অপপ্রয়াস বাংলাদেশের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান।”
১৫ নাগরিকের বিবৃতি
শনিবার বিকালে চট্টগ্রামের ১৫ নাগরিক বিবৃতি দিয়ে বলেন, সিআরবির উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস করে বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণ চট্টগ্রামবাসী কখনও মেনে নিবে না।
প্রস্তাবিত হাসপাতালের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে’ বলেও দাবি বিবৃতিদাতাদের।
বিবৃতিতে একুশে পদক প্রাপ্ত কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন, চুয়েটের সাবেক উপাচার্য মোজাম্মেল হক, আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, স্থপতি জেরিনা হোসেন, স্থপতি সুভাষ বড়ুয়া, সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান, সুজন চট্টগ্রাম সাধারণ সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার, কবি রাশেদ রউফ, সাংবাদিক ওমর কায়সার, চট্টগ্রাম রিপোটার্স ফোরাম সভাপতি কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আলীউর রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা চট্টগ্রাম সমন্বয়ক মনিরা পারভিন রুবা, পরিবেশ সংগঠন গ্রিন ফিংগার্স সহ প্রতিষ্ঠাতা আবু সুফিয়ান ও রিতু পারভিনের সই রয়েছে।
বিবৃতিতে তারা বলেন, “সিআরবিতে নতুন করে প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টার প্রতিবাদে সর্বাত্বক আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ। রেলমন্ত্রীর পরিদর্শনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রস্তাবিত হাসপাতালের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। কদমতলী মোড়ের পে অ্যান্ড ক্যাশ এলাকার ভূমি তফশিল দিয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা বলে তা সিআরবিতে করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
“ড্যাপ ঘোষিত এলাকায় বহুতল বাণিজ্যিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, ওয়াসার ছাড়পত্র দেওয়ার সুযোগ নাই। এই স্থানে সিডিএ ভবন নকশার অনুমোদন দিতে পারবে না। তাই সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মান পুরোপুরি বন্ধ করা অত্যাবশ্যক।”
‘চক্রান্ত’ বন্ধের দাবি বাসদের
শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) সিআরবিতে হাসপাতালের নামে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের ‘চক্রান্ত’ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বাসদের (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক শফি উদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবিতে হাসপাতালের নামে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের চক্রান্ত বন্ধ না করলে কঠোর আন্দোলনে যাব।
“যখন প্রকল্পটির অধীনে বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রামবাসীর প্রবল আন্দোলনের ফলে সিআরবিতে প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণের তৎপরতা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প পুনরায় শুরু করে আওয়ামী লীগেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছে।”
শফি উদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে এ চক্রান্ত চট্টগ্রামবাসী রুখে দিয়েছিল। এবারও সিআরবি ধ্বংসের চক্রান্ত রুখে দাঁড়াতে আমরা চট্টগ্রামবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।”
‘প্রাকৃতিক পরিসর’ রক্ষার দাবি
অন্যদিকে সিআরবিতে ‘প্রাকৃতিক পরিসর’ ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস।
চট্টগ্রামের ‘একমাত্র উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিসর’ সিআরবিতে আবারও বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকল কলেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পিপলস ভয়েস সভাপতি শরীফ চৌহান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান।
এক বিবৃতিতে তারা বলেন, “অবিলম্বে গণবিরোধী ও প্রকৃতি ধ্বংসকারী এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা থেকে সরে আসতে হবে। অন্যথায় পরিবেশ বিরোধী এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ঠেকাতে আবারও চট্টগ্রামের মানুষ আন্দোলন করতে বাধ্য হবে।”
রোববার বিকাল ৪টায় সিআরবিতে প্রস্তাতিব হাসপাতাল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের কথা রয়েছে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের।
আরও পড়ুন:
সিআরবিতে 'সেই হাসপাতাল প্রকল্প' পরিদর্শনে আসছেন মন্ত্রী, আন্দোলনের ডাক
'সিআরবিতে হাসপাতাল হচ্ছে না' খবরে সন্তোষ, মহাসমাবেশের ডাক
সিআরবিতে হাসপাতাল নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী: রেলমন্ত্রী
সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প, বিরোধিতা নানা প্রশ্নে
সিআরবিতে হাসপাতাল হতে দেবেন না বঙ্গবন্ধুকন্যা, আশা অনুপম সেনের